কলমের খোঁচা

অশান্ত ভারতে শতবর্ষে দেবীপ্রসাদের প্রাসঙ্গিকতা—-গৌতম রায়


চিন্তন নিউজ:৮ই মে:- যুগ যুগ ধরে প্রবাহমান ভারতবর্ষের বহুত্ববাদী সংস্কৃতি সভ্যতা এবং সমন্বয়বাদী চেতনাকে ধ্বংস করবার লক্ষ্যে , ভারতীয় সভ্যতার সংস্কৃতিকে একটি কৌণিক বিন্দু উপস্থাপিত করে, রাজনৈতিক হিন্দুত্বকে ভারতবর্ষের জীবন দর্শনের মুখ্য উপজীব্য বিষয় হিসেবে যখন তুলে ধরা হচ্ছে ,সেই সময়কালেই  প্রখ্যাত দার্শনিক দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম শতবর্ষ পালনের  তাৎপর্য একটি বিশেষ মাত্রা আমাদের সামনে এনে দিয়েছে ।দেবীপ্রসাদ তাঁর বহুমুখী মননশীলতায় সাতত বহমান সারস্বত  জগতের বহু বিষয় নিয়ে চর্চা করলেও ,প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান চর্চা এবং প্রযুক্তি বিদ্যার চর্চা নিয়ে যে ধরনের মননশীল গবেষণা করেছেন ,আজ প্রাচীন ভারতের  যাবতীয় বিষয়াবলীর উপর, রাজনৈতিক হিন্দুত্বের লেবেল লোটকে দিয়ে ,সমস্ত বিষয় গুলির উপর এক ধরনের কৌণিক ,সাম্প্রদায়িক, ধর্মান্ধ  দৃষ্টিভঙ্গি স্থাপনের ষড়যন্ত্র যখন চলছে, সেইরকম মুহূর্তে দেবীপ্রসাদের প্রাচীন ভারতীয় বিজ্ঞান চর্চার দিকগুলি আমাদের নতুন করে আলাপ-আলোচনা করা দরকার ।

                     প্রাচীন ভারতের বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি নিয়ে দেবীপ্রসাদ তিন খন্ডে এক  অসামান্য গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এমন গ্রন্থ কেবলমাত্র ভারতবর্ষের প্রেক্ষিতেই  নয়, গোটা বিশ্বের সভ্যতা- সংস্কৃতির প্রেক্ষিতে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ।বিশ্ববিশ্রুত বিজ্ঞানবিষয়ক ইতিহাস বিজ্ঞানী জোসেফ নিডহ্যামের যে গবেষণা, যেখানে চীন দেশের প্রাচীনকালের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যা নিয়ে অনবদ্য চর্চা রয়েছে, সেই প্রেক্ষিতের সঙ্গে দেবীপ্রসাদের কাজকে আমরা বিচার বিশ্লেষণ করতে পারি।

                        নিডহ্যাম নিজে দেবীপ্রসাদের  পরিচয় দিতে গিয়ে লিখেছিলেন; 

                  দেবীপ্রসাদ যখন লোকায়ত লিখেছেন তখন ই তাঁর নাম বিশ্বের দরবারে পরিচিত হয়। প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা তে  তাত্ত্বিকভাবে এবং প্রয়োগ জনিত দৃষ্টিভঙ্গির ভেতর দিয়ে বস্তুবাদ কতখানি বিকাশলাভ ঘটিয়েছিল ,তা দেখাবার ভেতর দিয়ে দেবীপ্রসাদ প্রাচীন ভারতে প্রকৃত গৌরবকে কিভাবে তুলে ধরেছিলেন তা নিডহ্যাম অত্যন্ত খোলামেলা মনে তার ভূয়শী প্রশংসা করেছেন।

                   বিজ্ঞান এবং সমাজ নিয়ে লেখা দেবীপ্রসাদের গ্রন্থ সম্পর্কে এই বিশ্ববিশ্রুত ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী স্পষ্টভাষায় বলে ছিলেন;

                   প্রাচীন ভারতে চিকিৎসাশাস্ত্র বিষয়টা কেমন করে অন্ধ ধর্মীয় তত্ত্বের বিরুদ্ধে লড়াই করে, প্রকৃত বিজ্ঞান চেতনাকে উপস্থাপিত করেছে– তা দেখাবার ক্ষেত্রে দেবীপ্রসাদ একজন পথিকৃৎ ।সামাজিক পরিস্থিতি এবং সামাজিক পরিস্থিতির  ক্রমবিবর্তনের সাথে  বিজ্ঞান- প্রযুক্তি ও চিকিৎসা বিদ্যার যে সম্পর্কের দিক দেবীপ্রসাদ তাঁর অনবদ্য গবেষণা ও নিয়মিত চর্চার ভেতর দিয়ে সরস্বতী সমাজের কাছে উপস্থাপিত করেছিলেন ,সেই বিষয়টি সাথে চীনে বিজ্ঞান ও সভ্যতা ঘিরে নিজের গবেষণার একটি পারস্পরিক সম্পর্কের কথা নিডহ্যাম অত্যন্ত মুক্ত কণ্ঠে বলেছিলেন।

                     ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে চীনে একাধিক উল্লেখযোগ্য আবিষ্কার ও উদ্ভাবন সম্ভাবনা অত্যন্ত উজ্জ্বল হওয়া সত্বেও ,আধুনিক বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিপ্লবের সূচনা কিভাবে ইউরোপে সম্ভব হয়েছিল, তার উত্তর দিতে গিয়ে নিডহ্যাম  চীনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক দিকে সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। আমলাতান্ত্রিক সামন্তবাদ , ইউরোপের সামরিক অভিজাত বাদী সামন্তবাদের আচ্ছন্ন তার সঙ্গে পারস্পরিক লড়াইয়ে কিভাবে ইউরোপের সঙ্গে তুলনায় দুর্বল ছিল চীন,আর সেই  কারনেই ইউরোপের মতো বুর্জোয়াদের জায়গা করে দিতে না পেরে, বিজ্ঞান ধণতন্ত্র এবং সমাজ সংস্কারে প্রশ্ন ইউরোপের থেকে ক্রমশ পিছিয়ে পড়েছে চীন , তার প্রেক্ষিতে টেনে, চীনের সঙ্গে ভারতবর্ষের  কথা নির্মাণ উল্লেখ করতে গিয়ে দেবীপ্রসাদের গবেষণাকে বারবার অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হিসেবে মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন নীডহ্যাম।

                 প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার ঊষালগ্ন, অর্থাৎ; হরপ্পা সভ্যতার সময়কালে  জ্যোতির্বিদ্যায় যে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি ,তার দিকে দেবীপ্রসাদ যেভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন ,তা কেবল  বিজ্ঞানের ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নয়, আধুনিক ইতিহাসের ভিত্তি নির্মাণের ক্ষেত্রে ও এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বিজ্ঞানকে কিভাবে ধর্মতত্ত্বের বেড়াজাল থেকে বের করে আনতে দেবীপ্রসাদ উদ্যোগ নিয়েছেন, আজকের গোটা ভারতবর্ষের জুড়ে ধর্মান্ধতার এই ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে, তার সম্যক  চর্চা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ।

                     দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজ্ঞান নিয়ে সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে অনেক অদল-বদল ঘটিয়েছে ।পরমাণু শক্তি, রাসায়নিক শক্তির আধিপত্য, নিউক্লিয়ার শক্তি, পরিবেশ দূষণ , জিনপ্রযুক্তি ,ব্যক্তি তথ্যের গোপনীয়তা ইত্যাদি  বিজ্ঞানকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের প্রশ্নচিহ্নের বাতাবরণ যে তৈরি করেনি সে কথা বলতে পারা যায় না। এই পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং বিজ্ঞানের অপব্যবহারের  বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রশ্ন দেবীপ্রসাদের  সার্বিক গবেষণা সবথেকে উল্লেখের দাবি রাখে ।

                জাতি ঘৃণা এবং সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রতিরোধে ,বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের বীজ উৎপাদনের প্রশ্নে,  বৈজ্ঞানিক মনের গভীরতা, সামগ্রিক চর্চা –কতখানি গুরুত্বপূর্ণ, বিজ্ঞানের ইতিহাস আলোচনা ,প্রযুক্তির ইতিহাস আলোচনা প্রসঙ্গে দেবীপ্রসাদ তথ্য ও বিশ্লেষণের সাহায্যে তা বারবার আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন ।মুক্তকণ্ঠ দেবীপ্রসাদ ঘোষণা করেছিলেন ; দেশের ইতিহাস নির্মাণের ক্ষেত্রে যাঁরা কুশীলব, সেই সমস্ত প্রযুক্তিবিদ বিজ্ঞানীরা, বৈজ্ঞানিক মন রক্ষার লড়াই চালিয়েছেন, মানুষের কাছে তাদের কথা আমাদের তুলে ধরা একান্ত ভাবে প্রয়োজনীয়।

                   কিভাবে বিজ্ঞান সাধকেরা আধুনিক বিজ্ঞানের সৌধ গড়ে তুলেছেন সে কথা মানুষের কাছে তুলে ধরা গভীরভাবে প্রয়োজন– এই প্রসঙ্গে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের গবেষণাকে উল্লেখ করতে গিয়ে তাঁর পূর্বসূরি অক্ষয় কুমার দত্তের গবেষণার কথা ও মুক্তকণ্ঠে দেবীপ্রসাদ স্বীকার করেছেন ।

                  শঙ্করাচার্যের ‘মায়াবাদ’  কিভাবে মানুষের জানার আগ্রহের সংস্কৃতিকে একদম ভেঙে চুরে তছনছ করে দিয়ে ,বিশ্বাসের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে, তার ভিত্তিতেই কিভাবে বিজ্ঞান চেতনার জায়গায় ,বিশ্বাসকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়েছে,যে বিশ্বাস একদিন পরিণত হয়েছে ,’ অন্ধ বিশ্বাসে’ ,  সেই ‘ বিশ্বাসে’ র উপর ভিত্তি করে , সমস্ত রকমের আইন ,যুক্তি, ইতিহাস গত প্রমাণ কে বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে ,ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের জমি ‘রামলালা’  জমি হিসেবে দেশের সর্বোচ্চ আদালত ঘোষণা করেছেন, এই অন্ধ  বিশ্বাসের গোটা প্রেক্ষাপটিকে  বোঝবার জন্য , অন্ধ বিশ্বাস কিভাবে আমাদের যুক্তিবোধ, নীতিবোধ, তথ্য-প্রমাণ –সমস্ত কিছুকে আচ্ছন্ন করেছে, সিই  আঙ্গিককে উপলব্ধি করতে আমাদের বিশেষভাবে প্রয়োজন দেবীপ্রসাদের  সার্বিক গবেষণার দিকে বিশেষ রকমের দৃষ্টি আকর্ষণ করা ।

                 প্রাচীন ভারতবর্ষের সংস্কৃতি মানেই তারমধ্যে আধ্যাত্মিকতা আর ধর্ম, এই ভাবনা থেকে আধুনিক মননকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে সবথেকে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা যাঁরা ভারতবর্ষে পালন করেছেন, তাঁদের মধ্যে অগ্রগণ্য হলেন দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায় ।ঐতিহাসিকদের প্রশ্ন খোঁজবার যে আঙ্গিকের বিষয়টি দেবীপ্রসাদ তুলে ধরেছিলেন ,সেই আঙ্গিকে ই কিন্তু আজকের ভারতবর্ষের সার্বিক সংকটের প্রেক্ষিত টিকে বোঝবার  বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।

                    প্রাচীন ভারত ,মধ্যকালীন ভারত বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক ভাবনায় কি কোন সম্পদ তৈরি করতে পেরেছিল?  বিজ্ঞানের কোন কোন শাখায় ভারতবর্ষের প্রাচীন যুগের  মানুষরা বা মধ্যকালীন সময়ের মানুষেরা যথার্থ ভূমিকা পালন করেছেন, সে সম্পর্কে তথ্যবহুল ,যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ যেভাবে দেবীপ্রসাদ করেছেন, প্রাচীন ভারতের বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের  পদ্ধতি নির্মাণের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক ধারণা গড়ে ওঠার সীমাবদ্ধতার গোটা প্রেক্ষিত নিয়ে উনিশ শতকের  শেষ লগ্নে ,বা বিশ শতকের গোড়ার দিকে আচার্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীল দুঃখ ক্ষোভ, হতাশা প্রকাশ করেছিলেন,  সেই  যন্ত্রণা উপশমের জন্য দেবীপ্রসাদ তাঁর গোটা জীবনের কর্মকাণ্ডকে পরিচালিত করেছেন ।

                 আজকের অশান্ত ভারত, ধর্মান্ধ ভারত, বহুত্ববাদী চেতনাকে ধ্বংস করার লক্ষ্যে ,রাজনৈতিক হিন্দু সাম্প্রদায়িক, মৌলবাদী, সন্ত্রাসী শিবিরের যে গভীর ষড়যন্ত্র , ভারতের  প্রকৃত মানবিক  মূল্যবোধকে প্রতিস্থাপিত করবার লক্ষ্যে দেবীপ্রসাদের জীবন দৃষ্টিভঙ্গি এবং সামগ্রিক সৃষ্টির চর্চা একটি বড় লড়াইয়ের হাতিয়ার।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।