কলমের খোঁচা

খোলাখুলি —————— সঞ্জীব বর্মণ


চিন্তন নিউজ:২৯শে মে:- “অনাহার অদ্ভুত ব্যাপার। দ্রুত মেরে ফেলে না। কিন্তু পরিশেষে তা নিশ্চিতভাবেই মেরে ফেলে। ”(ইতিহাসবীদ হরিশঙ্কর বাসুদেবন)।
দেশে কমবেশি প্রায় ৭ কোটি পরিযায়ী শ্রমিক কখনো ট্রেনের বা ট্রাকের চাকার নিচে,কখনো পিচ রাস্তার ওপরে হেঁটে বা সাইকেলে, অনাহারে, অর্ধাহারে ‘ঘর ছেড়ে ঘরের সন্ধানে’ তবু বাঁচার আকুল ইচ্ছায় এখন অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, তারাও এদেশেরই অধিবাসী নিজের ঘরে ফিরতে চাওয়াটা তাদের অন্যায় নয় বরং অধিকার। দেশব্যাপী জনমতকে এটা খানিকটা বোঝাতে সক্ষম হয়ে এবং আমাদের সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র নামক জগদ্দল পাথরটাকে একটু নড়িয়ে পরিযায়ী শ্রমিকরা এবার ঘরমুখো। করোনা প্রকোপে এই সময় মোটামুটি তারা রাস্তাতেই ছিলেন, আছেন। তাদের এখন কোন কাজ নেই তাই মজুরীও নেই, তারমধ্যে আবার বেশিরভাগ শ্রমিক তাদের প্রায় দেড় দুমাসের মজুরী হারিয়েই মানে লুটে খাওয়া মালিকের কাছে ফেলে রেখেই চলে আসতে বাধ্য হয়েছেন। অতএব তাদের এখন পকেটে কানাকড়িও নেই। সামান্য দানাও এখন অমিল। খাদ্যের পরিস্তিতি সমস্যা থেকে সংকট, সংকট থেকে গভীর,গভীরতম সংকটে নিমজ্জিত, গোটা দেশময়।
অথচ কি মজার ব্যাপার “খাদ্য সংকট মোকাবিলার মূল সংস্থা ফুড কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়ার (FCI) খাদ্যের বিপুল মজুত ভান্ডার রয়েছে। বিভিন্ন সূত্র অনুসারে তা বর্তমানে দেশের প্রয়োজনের তিনগুণ রয়েছে। কিন্তু তারা কার্যকরীভাবে পরিযায়ীদের ক্ষুধার সমস্যার সমাধান করতে অক্ষম। …সাম্প্রতিক বছর গুলিতে মজুত খাদ্য নষ্টও করে ফেলা হয়েছে।” (হরিশঙ্কর বাসুদেবন)। অথচ দেশব্যাপী খাদ্য সংকট চরম থেকে চরমতম সীমাও অতিক্রম করে গেছে প্রায়। একে যদি রাষ্ট্রীয় অসভ্যতা বর্বরতা অথবা রাষ্ট্রীয় ষড়যন্ত্রে গণহত্যার ছক বলা হবে নাতো কী বলা হবে ? এর চাইতে বড় দেশদ্রোহীতা আর কী হতে পারে !

আবার এদিকে দেখুন, স্বর্গরাজ্য আমাদের বাংলায় ? রাজ্যের ২৬ হাজার ক্লাবকে ১ লক্ষ টাকা করে মোট ২৬০ কোটি টাকা দেওয়ার কথা ১৩ ই মার্চ নেতাজী ইন্ডোর স্টেডিয়ামে স্বগৌরবে ঘোষণা করেছেন খোদ মুখ্যমন্ত্রী। বিন্দুমাত্র চক্ষুলজ্জার বালাই রাখেন নি। আর ৬ ই মে একান্ত বিশ্বাস ভাজন স্বরাষ্ট্র সচিবকে দিয়ে বলা করালেন রাজ্যের আড়াই লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক মাননীয়ার সুখের সুশাসন পম্চিমবঙ্গে অন্ন সংস্থানে ব্যর্থ হয়ে ভিনরাজ্যে পাড়ি দিয়ে ছিলেন এবং ফিরছেন কার্যত সর্বহারা হয়ে তাদের জন্যে বরাদ্দ মাত্র এক হাজার টাকা করে মোট ২৫ কোটি টাকা। একে জঙ্গলের রাজত্বের নিষ্ঠুর পরিহাস ছাড়া আর কী বলবেন? বিশ্বাসঘাতকতার এরচাইতে বড় উদাহরণ আর কি কিছু হতে পারে ?

করোনার হামলায় ইতিমধ্যেই এদেশে কাজ হারিয়ে, সর্বস্ব খুইয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন প্রায় ১২ কোটি মানুষ। এদের প্রায় বেশিরভাগই অসংগঠিত ক্ষেত্রের শ্রমজীবি এবং পরিযায়ী। এক দুঃসহ অকল্পনীয় আকালের দিকে, হাহাকারের দিকে ক্রমশ এগিয়ে চলেছে আমাদের দেশ। আগত অন্ধকারময় ভবিষ্যতের চিত্র কল্পনা করে চরম হতাশায় শ্রমজীবিদের মধ্যে ঘটতে আরম্ভ করেছে আত্মহত্যার ঘটনাও। এই রকম এক অভূতপূর্ব জাতীয় বিপর্যয়ের সময়ে দেশের সবচাইতে আক্রান্ত অথচ সবচাইতে মূল্যবান শ্রমশক্তির সহায়তায় সবচাইতে অগ্রাধিকার দিয়ে দাঁড়াবেনা রাষ্ট্র ? আধুনিক সভ্যতার যুগে জনকল্যাণকামী রাষ্ট্রের ভূমিকা সামান্যতম প্রদর্শন করবেনা সরকার ? দেশের ৩৫ কোটি একর চাষযোগ্য জমি, আট হাজার কিমি জুড়ে জল সম্পদ, মাটির নীচে এত মহা মূল্যবান খনিজ সম্পদ, এত বিপুল মানব সম্পদ, খাদ্যের এত মজুত ভান্ডার, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের রাষ্ট্রের জরুরী প্রয়োজনে গচ্ছিত অর্থ এসব তাহলে কিসের জন্যে ? শুধু তেলভর্তি মাথায় আরো তেল ঢালার জন্যে ? দেশের যে বেশির ভাগ মানুষের ভোটে জিতে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন “মন কী বাত” খ্যাত নরেন্দ্র মোদী আজ তাদেরই সামনে যখন স্রেফ বাঁচা মরা সমার্থক হয়ে যেতে বসেছে তখনও তিনি রক্তপিপাসু লুঠেরা ধনকুবেরদের গায়ে সামান্য আঁচ লাগতে না দেওয়ার ভীস্মের প্রতিজ্ঞা করে বসে থাকবেন ? ফি বছর অযথা দেশের রাষ্ট্রীয় ব্যাঙ্কগুলোকে দেউলিয়া করে যে হাজার হাজার কোটি টাকা তাদের ট্যাক্স ছাড় দেওয়া হয়েছে তার অন্তত একটা অংশ কেন এই সময়ে রাষ্ট্র ফেরৎ নেবে না ? দেশের বিশাল শ্রমশক্তিকে আত্মসাৎ করে, ঠকিয়ে, মর্যাদাহীন মজুরিতে খাটিয়ে সরকারী ব্যাঙ্ক, মাটির ওপরের, নীচের সব রাষ্ট্রীয় সম্পদকে আপন পিতৃদেবের সম্পত্তি বিবেচনা করে লুঠে নিয়ে আজ একদল তস্কর জাতীর অধিশ্বরের মুকুট মাথায় নিয়ে নিজেদের ভারত ভাগ্য বিধাতা ঠাউরে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে বিরাজ করবে আর সম্পদ স্রষ্টা গণদেবতা লালকেল্লার দিকে তাকিয়ে বুড়ো আঙুল চুষবে ? বদমাশীর একটা শেষ থাকবে তো ! মহামারীর আওয়াজ তুলে শ্রমজীবি গরিব মেহনতী মানুষের পাশে থাকার অশ্লীল কুনাট্য প্রদর্শনের নামে দেশে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় তঞ্চকতা।কাঁধে হাত রাখা তো অনেক দূরের ব্যাপার শ্রমিকদের যাবতীয় অধিকার কাড়ার উদ্যোগ চলছে পুরোদমে।

কেন্দ্রীয় সরকারের খোলাখুলি মদতে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি একের পর শ্রম আইন তুলে দেওয়, স্থগিত রাখার ঘোষণা করছে। অধ্যাদেশ জারি করেছে। “দেশের শিল্প বানিজ্য মহলের তরফে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রীকে পেশ করা হয়েছে দাবি। কী আছে সেই দাবিতে ?দেশে সমস্ত শ্রম আইন আগামী তিন বছরের জন্য তুলে দিতে হবে। শিল্পের আর্থিক সমস্যার কথা ভেবে শ্রমিকদের মজুরি আলাদা করে না দিয়ে তা কর্পোরেট সামাজিক সাহায্য তহবিল (CSR) থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, CSR’র বরাদ্দ অর্থের নামে মুনাফার মাত্র ২ শতাংশ মজুরির সীমা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের এই সময়ে ছাঁটাই অবাধ করার কথা বলা হয়েছে। শিল্পে শ্রমিক কমিয়ে তা নিযুক্ত শ্রমিকের ৩৩ শতাংশ থেকে ৫০ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। কাজের সময় দিনে আট ঘন্টার বদলে ১২ ঘন্টা করতে হবে। সপ্তাহে তা হবে ৪৮ ঘন্টার বদলে ৭২ ঘন্টা। প্রধানমন্ত্রী কল্যাণ যোজনা প্রকল্পে ১৫ হাজার টাকার নিচে আয়ের শ্রমিককে আনা হয়েছিল। এবারে সেই সীমা তুলে দিয়ে সব শ্রমিককেই এই প্রকল্পের আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এভাবে শ্রমিকের সামাজিক সুরক্ষায় কর্পোরেট যে খরচ করত তা কর্পোরেটের বদলে এবার সরকারকে খরচ করতে হবে। শিল্প মালিকদের ভর্তুকিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। শিল্পে নিযুক্ত পরিযায়ী শ্রমিকদের যাতায়াতের খরচ, খাওয়ার খরচ সব সরকারকে বহন করতে হবে। শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা খাতে খরচ কমাতে হবে।”(গণশক্তি১১মে)। এত সাহস নিষ্ঠুর, অমানবিক, স্বার্থপর, রক্তচোষা ‘শিল্পবানিজ্য মহলের’ হয় কি করে ? “সব কা সাথ, সবকা বিকাশ”র সরকার যদি দেশের আম আদমির সঙ্গে গদ্দারি করে তাদের বিকাশে নির্লজ্জ পৃষ্ঠপোষকতা না করে ? আর ‘বাঘিনী’র রাজ্য বাংলায় ? ১৬ ই মার্চ রাজ্যে করোনা মোকাবিলায় ২০০ কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষনা করেছিলেন আমাদের মুখ্যমন্ত্রী, আর তুলনায় অনেক ছোটো রাজ্য কেরালা ঘোষণা করেছিল ২০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ।২০০ কোটির মধ্যে সিংহভাগ খরচ হয়ে গেল গানে-গল্পে, টিভি-বেতার বিজ্ঞাপনে। পরিযায়ী শ্রমিকরা পেলেন মাত্র ২৫ কোটি, তাও চুরি- জোচ্চুরির পর এই পঁচিশ কোটির কি হাল হবে, হচ্ছে তা এই রাজ্যের একটা শিশুও জানে। করোনা ঠেকাতে মনপসন্দ খ্যাতিমানদের নিয়ে তড়িঘড়ি গঠিত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ, কথার ফুলঝুড়ি, লম্ফঝম্প, আমি সবটা দেখে নেব গোছের—মাননীয়ার অসাধারণ নেতৃত্বের আস্বাদ উপভোগে যখন রাণী দরবারে একটু যত্ন করে উঁকি মারা গেল জানা গেল এ আওয়াজটা আসলে ফাঁকা কলসির।

আসলে করোনা মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের কোনো প্রস্তুতিই নেই। বরং এতবড় বিপদকে প্রথম থেকেই দেখা হয়েছে খুবই লঘু ভাবে। ঠিক সময়ে হাসপাতাল চিহ্নিত করা, বেড নির্দিষ্ট করা, স্বাস্থ্য কর্মীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ, মাস্ক, পিপিই কিছুই নেই। আছে শুধু “তাঁর হাতে চক আর গ্লোবাল ঢপের চপ”। প্রথমে মুখ্যমন্ত্রী মনে করেছিলেন ব্যাপারটা খুব সোজা, মজার ব্যাপার অর্থাৎ তার ভাইদের ভোট লুঠের মতো। এ হাসপাতাল ও হাসপাতাল একবার দুবার যাবেন।গোটা দুয়েক বাজারে চক দিয়ে গোটা দশেক বৃত্ত আঁকবেন, আর কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন দিয়ে আর চাটুকার দের ঢোল-করতাল দিয়ে বাজারে নামিয়ে ভাবমূর্তি খরিদ করবেন। তথ্য খুন করে, সত্য গুম করে প্রথম প্রথম কিছুদিন তার চেষ্টা করেও ছিলেন। কিন্তু ক্রমেই দেখা গেল কেরালা যখন করোনা মোকাবিলায় দেশের মডেল হয়ে উঠেছে, গোটাবিশ্ব জানতে চাইছে কিভাবে অসাধ্য সাধন করছে কেরালা! তখন আমাদের রাজ্যে ততদিনে আস্ত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাটাই ধ্বংস। পরিষেবা সম্পূর্ণ তছনছ। মানুষও আতঙ্কিত, বিভ্রান্ত দিশাহীন। তৃণমূল পরিচালিত সরকার টা আর নেই। তবে হ্যাঁ তৃণমূল দল দস্তুর মতো আছে দেদার রেশনের চাল চুরিতে। বরং অন্ধকারের মধ্যে আলোর দিশার মতো এই সময়টাতে মানুষ আবার নতুন করে দেখবার সুযোগ পেলেন কি করোনায় কি আমফানে বামপন্থা আছে বামপন্থাতেই।

নির্বাচন, নির্বাচনে জয় পরাজয় রাজনীতিতে বিশেষ করে সংসদীয় রাজনীতিতে নিশ্চিত খুবই গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ নয়। মানুষের জীবন, জীবিকা আর তারজন্যে লড়ে যাওয়ার থেকে বেশি মূল্যবান আর কিছু হ’তে পারে না। আর এখানেই বামপন্থা আর বামপন্থী কর্মীদের শ্লাঘা বোধের সুযোগ। এই সময়ে এই রাজ্যের মাঠ পাথার বন্দরের অসহায় লাখো মানুষ হাতে হাত রেখে, বুকে বুক রেখে দেখেছেন, অনুভব করেছেন শ্রেষ্ঠ মানবিক মূল্যবোধ আর মতাদর্শগত দায়বদ্ধতার উজ্জল উদাহরণ বামপন্থার উষ্ণ উপস্থিতি। আর আমরা ভুলে যাই কি করে দেশের শ্রেষ্ঠ জননেতার অমোঘ উক্তি “মানুষই ইতিহাস রচনা করেন।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।