কলমের খোঁচা

শ্রদ্ধায় স্মরণে বিপ্লবী কল্পনা দত্ত


উত্তম দে, বিশেষ প্রতিবেদন:–আজ বিপ্লবী,কমিউনিস্ট নেত্রী কল্পনা দত্তের প্রয়াণ দিবস। যখন,ব্রিটিশের কাছে মুচলেকা দেওয়া সাভারকারদের বীরের আখ‍্যা দিয়ে,দেশের প্রকৃত ইতিহাসকে গুলিয়ে ফেলে,বিকৃত ইতিহাস জনগণের সামনে আনার প্রচেষ্টা চলছে,তখন কল্পনা দত্তদের মতো বীরাঙ্গনাদের জীবন দর্শন,মূল‍্যবোধ,ত‍্যাগের কাছে বার বার ছুটে গিয়ে, শিকড়ের সন্ধান করা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।

১৯১০ সালের ২৭শে জুলাই,চট্টগ্রাম জেলার শ্রীপুর গ্রামে বিপ্লবী কল্পনা দত্ত জন্মগ্রহণ করেন।শৈশবকাল থেকেই ছোটকাকা সেবিকা হওয়ার জন‍্য উৎসাহিত করতেন। কিন্তু মাত্র বারো বছর বয়স থেকে স্বদেশী পুস্তক পড়ায়,তার মনে তখন প্রবল ব্রিটিশ বিরোধী আগুন জ্বলছে। মেধাবী ছাত্রী কল্পনা ১৯২৯ সালে মেয়েদের মধ‍্যে চতুর্থ স্থান অর্জন করে ম‍্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উর্ত্তীণ হন। পরবর্তী শিক্ষা অর্জনের জন‍্য তিনি কলকাতায় আসেন ও বেথুন কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ঠিক এই সভয়ই তিনি বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়ে পড়েন। কলেজে ছাত্রী সংঘে যোগ দিয়ে একদিকে যেমন আন্দোলন,হরতালে সক্রিয় অংশ নিতে থাকেন,অন‍্যদিকে নিজের পড়ার ঘরে বোমা বাঁধার জন‍্য গান কটন তৈরী করেন।

১৯৩০ সালে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদারের হাত ধরে বিপ্লবী মাস্টারদা সূর্য সেনের ” Indian Republican Army” তে যোগ দেন। এই সময়ও তিনি মাস্টারদার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন না। বিপ্লবী দলে মেয়েরা যোগ দিতে পারে কিনা,তা নিয়ে এসময়ে বিতর্ক ছিলো। তিনি,প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এর বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। কল্পনা দত্ত লিখলেন,” It was an iron rule for the revolotionaries that they should keep aloof from the woman”
বিপ্লবী দলে যোগদানের পর তিনি মাস্টারদার সাথে সাক্ষাৎ এর জন‍্য উদগ্রীব হয়ে পড়েন। কিন্তু ১৯৩০ এর ১৮ই এপ্রিল অস্ত্রাগার লুন্ঠনের ফলে তা বিলম্বিত হয়। যদিও বিপ্লবী মনোরঞ্জন রায়ের সহযোগিতায় তা ১৯৩১ সালে সম্ভব হয়।এদিকে অস্ত্রাগার লুন্ঠনে গনেশ ঘোষ,অনন্ত সিংহ প্রমুখ গ্রেফতারের ফলে এক কঠিন পরিস্থিতির মুখে বিপ্লবীদের পড়তে হয়।এই সময় তিনি কলকাতায় ফিরে আসেন ও বিষ্ফোরক তৈরী করতে থাকেন বিপ্লবীদের জন‍্য।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য,বিষ্ফোরক তৈরী ও অস্ত্র চালনায় তিনি বিশেষ পটু ছিলেন। ইতিমধ‍্যেই মাস্টারদা ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। কল্পনা দত্তের ওপর আক্রমণের পুর্বে স্থান রেইকির দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। পুরুষ বেশে রেইকির সময় তিনি ধরা পড়েন। জেলে বসেই শুনলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নেতৃত্বে ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ ও আত্মবলিদানের খবর।১৯৩৩ সালে গৈরলা গ্রামে আত্মগোপনকালে অতর্কিত পুলিশী আক্রমণে মাস্টারদা গ্রেফতার হন। কল্পনা দত্ত পুলিশের চোখে ধূলো দিয়ে পালাতে সক্ষম হন।এরপর তিনি ও কিছু বিপ্লবী গাহিরা গ্রামে প্রসন্ন তালুকদারের বাড়িতে আত্মগোপন করেন। সেখানে তারা গোপনে কার্তুজ,বোমার মশলা তৈরী করতে থাকেন। কিন্তু, ১৮ই মে ভোরে হঠাৎ সশস্ত্র পুলিশী আক্রমণ হয়। কল্পনা সহ বিপ্লবীরা আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাল্টা জবাব দিতে থাকেন। কিন্তু মনোরঞ্জন দাশগুপ্ত,পূর্ণ তালুকদার গুলিবিদ্ধ হন। বাড়ির শিশু ও মহিলাদের কথা ভেবে তারা আত্মসমর্পণ করেন। বিপ্লবী কল্পনা দত্তকে হাত বেধে চট্টগ্রাম জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মাস্টারদা,তারকেশ্বর দস্তিদার ওরফে ফুটু দা সহ অন‍্য বিপ্লবীদের সাথে তিনিও কাঠগড়ায় দাঁড় হন।

শোনা যায় এই সময়ই ফুটু দা তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে,তার জন‍্য অপেক্ষা করতে বলেন। তিনিও নাকি নিরব থেকে সায় দিয়েছিলেন। কিন্তু এই “চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন সেকেন্ড সাপ্লিমেন্টারি কেস” এ মাস্টারদার সাথে ফুটুদার ও ফাঁসি হয়। এবং কল্পনা দত্তের যাবজ্জীবন হয়। স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল জজ বলেন,মেয়ে ও বয়সে কম থাকায় কল্পনা দত্তকে ফাঁসি দেওয়া হলো না।জেলে থাকাকালীন বেশকিছু পুস্তক পাঠের সুযোগ হয়, যা তার পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মকান্ডকে প্রভাবিত করে। এইসময় তিনি বার্ণাড’শ এর Socialism এর পাশাপাশি Communism পড়েন। কিন্তু রঁম‍্যা রঁল‍্যার “I will not rest” পড়ার পর তার মননে কমিউনিস্টের প্রতি বিশেষ আকর্ষণ জন্মায়। তিনি বুঝতে পারেন,যারা বলেন কমিউনিস্টরা বিপ্লবীদের ভালো চোখে দেখেন না,তারা ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করেন। বিপ্লবী ও কমিউনিস্টদের মধ‍্যে কোন ফারাক নেই।র‍্যঁমা র‍্যঁলার লেখা পড়ে রাশিয়ার বিপ্লবের প্রতি শ্রদ্ধা জন্মায়। তার কথায়,এই সময় থেকে আমি লেনিনকে পুজো করতে শুরু করি।

ইতিমধ‍্যেই ১৯৩৭ সালে প্রদেশে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এরং রাজনৈতিক বন্দীমুক্তির দাবীতে প্রবল আন্দোলন শুরু হয়েছে। কল্পনা দত্তের মুক্তির দাবী জানিয়ে খোদ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গর্ভনরের সাথে দেখা করেছেন এবং তা জানিয়ে কল্পনা দত্তের বাবাকে চিঠিও লিখেছেন। গান্ধীজী ও বিপ্লবী কন‍্যার পিতাকে মুক্তির ব‍্যাপারে তাঁর প্রচেষ্টার কথা জানিয়েছেন। অবশেষে,১৯৩৯ এর ১লা মে প্রবল ছাত্র আন্দোলনের জেরে বিপ্লবীর মুক্তি হয়।মুক্তিলাভের পর তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন এবং কমিউনিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত হয়ে দেশের মুক্তি সংগ্রামে লিপ্ত হন। এই সময় তিনি জানতে পারলেন,কমিউনিস্ট দলের সদস‍্য হতে হলে,গণসংগঠনের সাথে যুক্ত হয়ে কাজ করতে হয় এবং পরীক্ষিত হবার পরেই দলীয় সদস‍্যপদ অর্জন করা সম্ভব। এই শৃঙ্খলাবোধ কমিউনিস্ট দলের প্রতি তাকে আরো আকৃষ্ট করে। তিনি চট্টগ্রামের সাঁওতাল পাড়ায় কুলিদের পড়ানো শুরু করেন এবং মালিপাড়া,ধোপা পাড়ায় গোপন বৈঠক করতে শুরু করেন।১৯৪০ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক স্তরের জন‍্য ভর্তি হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে তাঁকে কলকাতা থেকে বিতারিত হয়ে আবার চট্টগ্রামে ফিরে আসতে হয়।

প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য এই সময় কমিউনিস্ট দলকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।ফিরে এসে তিনি কমিউনিস্ট দলের সাথে যুক্ত হয়ে জাপ বিরোধী প্রচারে অংশ নেন। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষ‍্যের( পঞ্চাশের মন্বন্তর) সময় তিনি,মনিকুন্তলা সেন,আরতি দত্ত প্রমুখ বিপর্যস্ত এলাকার মানুষদের মহিলা সমিতির নেতৃত্বে সংগঠিত করেন।এই বছরই তিনি কমিউনিস্ট দলের পুর্ণ সদস্য হন এবং দলের চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসেবে বোম্বাই সন্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করেন। সেখানেই ভারতের কমিউনিস্ট দলের সাধারণ সম্পাদক পূর্ণচাঁদ যোশী( পি সি যোশী) র সাথে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হন।১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার আগে ব্রিটিশ সেনা চট্টগ্রামের কাছাড়পাড়া গ্রামে আক্রমণ ও ব‍্যপকহারে নারী ধর্ষণ করলে,দলের জেলা কমিটির সাহায‍্যে তিনি কংগ্রেস,বামদলগুলিকে ঐক‍্যবদ্ধ করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সাতদিন হরতাল পালিত হয়। এই প্রতিরোধে সেনা পিছু হটতে বাধ‍্য হয়।
১৯৪৬ সালে বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে তিনি কমিউনিস্ট দলের প্রার্থী হিসেবে চট্টগ্রাম থেকে কংগ্রেস প্রার্থী দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহনের স্ত্রী নেলী সেনগুপ্তের বিরুদ্ধে দাড়ান। তার জনপ্রিয়তার ফলে খোদ জহরলাল নেহেরুকে কং প্রার্থীর প্রচারে আসতে হয়। যদিও এই নির্বাচনে কল্পনা দত্ত জিততে পারেন নি।১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি ভারতে চলে আসেন ও ভারত-সোভিয়েত সাংস্কৃতিক সমিতির কাজে যুক্ত হন। তার লেখা একমাত্র বই “চিটাগাং আর্মারি রেইডার্স রেমিনিসেন্স” ১৯৪৫ সালে প্রকাশিত হয়। তাছাড়া চল্লিশ দশকে পিপলস ওয়ারে তার বেশকিছু লেখা রয়েছে। যদিও তার জীবনের ওপর লেখা ৩০০০ পাতার পান্ডুলিপি দিল্লীতে এক অটো রিক্সায় ভ্রমণকালে হারিয়ে যায়। এই মহান বিপ্লবী কমিউনিস্ট নেত্রী কলকাতার শেঠ সুখলাল করোনানী মেমরিয়াল হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত‍্যাগ করেন।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।