কলমের খোঁচা রাজ্য

কলকাতা ট্রামের ইতিবৃত্ত:- পূষণ সরকার


চিন্তন নিউজ:০২/০৪/২০২৩:-লেখক পূষণ সরকার:- অনুবাদক মল্লিকা গাঙ্গুলি:-

(১)
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের কাছ থেকে ভারতবাসী যে সব ভাল জিনিস গুলো অর্জন করেছে, তার মধ্যে ট্রাম ব্যবস্থার গোড়াপত্তন সবিশেষ প্রণিধানযোগ্য। যদিওবা, সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক আগ্রহ নিয়েই কোম্পানী সপ্তদশ শতাব্দীর শেষের দিকে শিল্প স্থাপন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কলেবর বৃদ্ধি করে গড়ে তোলে তাদের বানিজ্যিক রাজধানী ক্যালকাটা (বর্তমানের কলকাতা)। পর্যায়ক্রমে, এই বণিকের রাজধানী কলকাতার বুকে আধুনিক বাহন হিসেবে এশিয়া তথা ভারতবর্ষের মাটিতে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে ট্রাম। কলকাতা ছাড়াও ঔপনিবেশিক ভারতবর্ষের বোম্বাই, মাদ্রাজ, দিল্লী, কানপুর এবং পাটনা শহরেও ট্রাম গাড়ির শুভসূচনা হলেও একমাত্র কলকাতাতেই ট্রাম তা টিকে থাকে।
ভারত তথা দক্ষিণ বিশ্বে ব্রিটিশের সাম্রাজ্যবাদী দৃষ্টিকোণ থেকেই নাগরিকদের সামাজিক অবস্থান, আধুনিক যন্ত্রবিদ্যা, এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার নিরিখে রাজধানী কলকাতার ট্রাম চলাচল ব্যবস্থার সংশোধন ও উন্নীতকরণের কথা ভাবা হয়।
একেবারে সূচনা লগ্নে কলকাতার আশপাশের শহরতলি (hinterland) থেকে শহরের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনের কারণেই ট্রাম চালানো শুরু হয়। এই পণ্যবাহী “ট্রাম-ট্রেন” নামে পরিচিত ট্রাম গাড়ি শিয়ালদহ থেকে বৈঠকখানা বাজার, বউবাজার (মতান্তরে বহুবাজার) এবং ডালহৌসী স্কোয়ার হয়ে আর্মেনিয়ান ঘাট পর্যন্ত যাতায়াত করত। দুটি অস্ট্রেলিয়ান ঘোড়ায় টানা ট্রামে একজন ড্রাইভার ও একজন কন্ডাক্টার কর্মী হিসেবে থাকতেন।
১৮৭৩ সালে ২৪শে ফেব্রুয়ারি তিনজন ইউরোপীয় এবং দুজন মোটবাহী ভারতীয় এই পাঁচজনকে নিয়ে কলকাতার প্রথম ট্রামটির যাত্রা শুরুর উদ্বোধন হয়। সাহেবদের এই নতুন আশ্চর্য আবিস্কার প্রত্যক্ষ করতে সেদিন পথের দু’পাশে অসংখ্য মানুষ ভিড় জমিয়েছিলেন। যদিও এই “ট্রাম-ট্রেন” ব্রিটিশের পক্ষে বিশেষ লাভজনক হয় না। এমন কি “ট্রামট্রেন” চালাতে গিয়ে প্রতি মাসে পাঁচশো টাকা করে লোকসান হতে থাকলে মাত্র ৯ মাসের মধ্যেই কোম্পানী ট্রাম চালানোর পরিকল্পনা ভেস্তে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। অপরদিকে তখন কলকাতাকে কেন্দ্র করে শিল্প বাণিজ্যের ক্রমবর্ধমান উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শহরের জনসংখ্যার বিপুল বৃদ্ধি ঘটে। ১৮৮১ সালে কলকাতার জনসংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬,১১,৭৮৪ ফলে এই উর্ধমুখী নগর জীবনের পক্ষে চিরাচরিত পরিবহণ ব্যবস্থা চরম সংকট সৃষ্টি করে। এই পরিস্থিতিতে ঔপনিবেশিক সরকার দ্রুতগামী জনপরিবহণকারী যান হিসেবে ট্রামের দিকে পুনরায় দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। ১৮৭৩ সালের ট্রামের অসাফল্য নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠলেও অনিশ্চয়তা মাথায় রেখেই কলকাতা কর্পোরেশন ১৮৭৯ সালে ইংল্যান্ডের রবিনসন স্যটার, লন্ডনের আলফ্রেড প্যারিস এবং লিভারপুলের ডিলোয়ান প্যারিস নামক তিনটি ইংরেজ শিল্প কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৮৮০ সালে গড়ে ওঠে ক্যালকাটা ট্রাম কোম্পানি বা সি.টি.সি., এবং কলকাতার নোনাপুকুরে ট্রাম কোম্পানির কর্মশালা বা ওয়ার্কশপের জন্য জমি কেনা হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে সি.টি.সি. এক জোড়া ঘোড়ার সাহায্যে যাত্রীবাহী ও মালবাহী দু’প্রকার ট্রাম চালাতে শুরু করে। কিন্ত গরমকালে প্রচন্ড দাবদাহ ও কলকাতার জলীয়বাষ্পপূর্ণ আবহাওয়ায় ঘোড়ার পক্ষে বৃহৎ ট্রাম যান টানা চরম কষ্টকর হয়ে ওঠে।তাছাড়া উনিশ শতকের কিছু বুদ্ধিজীবী পশুপ্রেমী বাঙালী পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ সংস্থা (“Society for the Prevention of Cruelty to Animals”) গঠন করে এই ঘোড়ায় টানা ট্রাম ব্যবস্থার বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলেন। ফলে অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং মানবিক সহানুভূতিতে বিবেচনা করে ট্রাম চালাতে যান্ত্রিক পদ্ধতি অধিকতর কাম্য বলে গৃহীত হয়।
১৮৮২ সালে সি.টি.সি. চৌরঙ্গী থেকে কালীঘাট বিভাগে স্টিম-ইঞ্জিন চালানোর অধিকার লাভ করে কিন্ত এই প্রচেষ্টাতেও দু’ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। প্রথমত, বাষ্প-ইঞ্জিনে শহরে দুর্ঘটনা বাড়তে থাকে। দ্বিতীয়ত, শহরের অভিজাত এলাকার মানুষ স্টিম-ইঞ্জিনের বিকট শব্দের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে শুরু করে, ফলে বিশেষ করে চৌরঙ্গী এলাকায় এক বছরের বেশি স্টিম-ট্রাম চালানো সম্ভব হয় না। ফলস্বরূপ, সমস্ত বাষ্প-চালিত-ট্রাম মূল শহর থেকে দূরে খিদিরপুর ডক এলাকায় স্থানান্তরিত করা হয়।
১৮৯৩ সালে মেসার্স কিলবার্ণ কোম্পানি কলকাতা কর্পোরেশনের কাছ থেকে বিদ্যুত চালিত ট্রাম চালানোর সম্মতি লাভ করলে শহরে বৈদ্যুতিক ট্রাম চালানোর অনুকূল পরিকাঠামো আছে কিনা তা পরীক্ষা করার জন্য ১৮৯৭ সালে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। ১৮৯৯ সালে কর্পোরেশন বিশেষ কিছু পরিমার্জন করে ঐ কমিটিকে বৈদ্যুতিক ট্রাম চালানোর প্রস্তাবে চূড়ান্ত সম্মতি দেয়।
১৯০০ সালের মার্চ মাসে শহরের বুকে প্রথম ইলেকট্রিক-ট্রামগাড়ি চলতে শুরু করে। ১৯০০ থেকে ১৯০৫ মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যেই কলকাতার সমস্ত ঘোড়ায়-টানা এবং বাষ্প-চালিত-ট্রামপথ বৈদ্যুতিক-ট্রাম পদ্ধতিতে রুপান্তরিত করা হয়।

১৯০০ পরবর্তী ট্রামের নিরবচ্ছিন্ন অগ্রগতির আলোয় ১৮৭০-৮০ দশকের ট্রামের “অন্ধকারময়” অতীত বিস্মৃতির অতলে বিলীন হয়ে যায়। কলকাতার ট্রাম এই সময়কালে শহরের ব্যস্ত জীবনে কম সময়ে যাতায়াতে একটি জনপ্রিয় যান হিসেবে বিশেষ অর্থ বহন করে।
বলা যায় এই সময় সমগ্র ভারতবর্ষে এমন কি এশিয়া জুড়ে ইংরেজের বানিজ্য নগরী হিসেবে কলকাতা প্রচারের হলুদ আলোয় আলোকিত নগরী হয়ে ওঠে। প্রায় একাত্তরটি বিদেশী সংস্থার অগনিত অফিসার তাদের নানাবিধ বানিজ্যিক ক্ষেত্রে তখন কলকাতায় কর্মরত। ঔপনিবেশিক সরকার তাই শহরের বিশেষ বিশেষ জায়গার যানজট লাঘব করার প্রয়োজন অনুভব করে। এই মর্মে বাংলার গভর্নমেন্টের সচিব তথা পাবলিক ওয়ার্কস বিভাগের (পি.ডব্লু.ডি) প্রধান সি. পি. ওয়ালশ্ সাহেব সি.টি.সি.র জেনারেল ম্যানেজার ও মূখ্য বাস্তুকারকে একটি চিঠিতে চৌরঙ্গী রাস্তা যেখানে ওক্টারলোনী রোড এবং মেয়ো রোড মিশেছে, সেই ব্যস্ততম রাস্তা চওড়া করার অনুমতি চায়। প্রস্তাবে বলা হয় রাস্তা বর্ধিত করে ঐ অঞ্চলে দ্বিমাত্রিক ট্রাম লাইন বসানোর ব্যবস্থা করা হবে, যার আনুমানিক ব্যয় হবে ১,১৪,৯৮৯ টাকা। সি.টি.সি. এই প্রস্তাব যাচাই ও যথাযথ পরিমাপ করে “টাটা আইরণ এন্ড স্টিল” কোম্পানিকে ১৫০ টন দ্বিতীয়-শ্রেণীর রেল লাইন সরবরাহ করার বরাত দেয়।
সি.টি.সি ১৯৪০ থেকে ৪৯ এই দশ বছরে সব থেকে বেশি ট্রাম পরিবহণে উন্নতি করে। ১৯৪৯ সালে ৫০টি অতিরিক্ত ট্রাম গাড়ি চালিয়ে ১৯৪০ এর তিন গুণ যাত্রী পরিবহণ করে। স্বাভাবিক ভাবেই ১৯২০-৩০ এর তুলনায় গড় আয় ও তিনগুন বৃদ্ধি পায়। ঘটনাক্রমে ১৯২০ সালে সি.টি.সি. নিজস্ব বাস পরিষেবা ও চালু করে কিন্ত বাস সেবা দীর্ঘ স্থায়ী হয় না। ১৯২৫ সালের মধ্যেই সিটিসি বাস স্থগিত হয়ে যায়।
ষাটের দশকের সূচনা থেকে কলকাতার ট্রাম মূলত সমাজের তথাকথিত নিম্ন ও শহুর-দরিদ্র (urban poor) মানুষের বাহন ছিল। শহরের ওই নির্দিষ্ট শ্রেণীর জন্যই এই পরিবহণ সংরক্ষিত ছিল। অধ্যাপক দীপ্তেশ চক্রবর্তীর লেখা থেকে জানা যায়, সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণী যাদের নিজস্ব গাড়ি ছিল না এবং বিশেষ অনুষ্ঠান বা বিনোদন ব্যতীত যাদের ট্যাক্সি ব্যবহার করার সামর্থ্য ছিল না অথচ অগণতান্ত্রিক হীনমন্যতার কারণে নিজেদের উন্নত-শ্রেণী বলে দাবী করতেন তাদের কাছে ও ট্রামে চড়া খুব সুখকর ছিল না। ট্রামের কামরা তখন দুটি কক্ষে বিভক্ত ছিল। প্রথম-শ্রেণী ও দ্বিতীয়-শ্রেণী। ভাড়া ও ছিল দুই প্রকার। প্রথম-শ্রেণীর কামরার জন্য বিশেষ সুখ সুবিধার ব্যবস্থা ছিল। আসন থাকতো কুশনে মোড়া এবং প্রখর গ্রীষ্মে গরম হাওয়া নির্গমনের জন্য মাথার উপর বিশেষ প্রযুক্তিযুক্ত পাখা লাগানো থাকতো।
কলকাতার ট্রাম যাত্রার গুরুত্ব পূর্ণ লক্ষনীয় দিক ছিল সমাজের জাতিগত ভাবে পিছিয়ে পড়া ও দরিদ্র মানুষকে যথেষ্ট অবজ্ঞা করা হতো। দরিদ্র-শ্রমজীবী চেহারার যাত্রী দেখলে প্রথম শ্রেণীর কন্ডাক্টার প্রথম শ্রেণীর কামরায় উঠতেই দিতেন না। স্পষ্ট বলে দিতেন “পিছনের কামরায় যাও এটা প্রথম শ্রেণী!”। অপরদিকে মধ্যবিত্ত-শ্রেণী দ্বিতীয়-শ্রেণীর কামরায় জায়গা থাকলেও উঠতেন না। আবার, ঔপনিবেশিক শাসন কালে বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে সাহেব মেমসাহেবদের ট্রামে চড়ার শখ হলে তাঁরা প্রথম শ্রেণীর সওয়ারী হতেন তখন পুরুষ যাত্রীরা বিশেষ করে অফিস নিত্যযাত্রীদের অবলীলায় মেমসাহেব দের আসন ছেড়ে দিতে হতো এমন কি দেশীয় পুরুষ যাত্রী কোনো মেম সাহেব কে নিজের আসন ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে এক ধরনের শ্লাঘা অনুভব করতো।

ক্রমশ ট্রাম তার জনপ্রিয়তা হারাতে থাকে। নয়া উদারনীতিবাদের প্রভাবে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে গতি আনার এক প্রবল নেশার সঙ্গে পাল্লা দিতে গিয়ে ট্রাম শ্লথ, ধীরগতি, সময়ানুবর্তীতার অভাব এবং অলাভজনক যান হিসাবে পরিগণিত হয়। একবিংশ শতাব্দীর গতির কাছে ট্রাম তার সত্যতা প্রমাণ করতে সক্ষম হয় না।
নতুন করে ২০১৩ সালে ট্রামের আধুনিকায়ন করা হয়। এখনও দু’টি কামরা থাকলেও দু’টি কক্ষই ছিল সমকক্ষ। ২০১৯ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি কলকাতা প্রথম বাতানুকুল ট্রামের সাক্ষ্য বহন করে। কলকাতার ট্রামপ্রেমী মানুষ বহুল হারে ঐতিহ্যবাহী ট্রাম চালানোর জন্য সওয়াল করলেও শেষ পর্যন্ত সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে কলকাতার বুকে ট্রাম প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়।
কলকাতার ট্রাম ইংরেজ সরকারের স্মারক হলেও স্বাধীনতা উত্তর কালে ট্রাম তার উপযোগিতা হারায়। ব্যস্ত শহরের বুকে হাল্কা ট্রাম লাইনের বিশ্বজুড়ে মূল্যায়ন শুরু হয়। আধুনিক বিশ্বে জনগনের শহরমুখী মনোভাব উত্তরোত্তর শহরের জনসংখ্যার প্রাবল্য, দ্রুতগামী যানের চাহিদা, জ্বালানির আকাশ ছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, ইত্যাদির কাছে ট্রামের অস্তিত্ব সংকটাপন্ন। তথাপি কলকাতার এক অংশের মানুষ এমন কি কলেজ পড়ুয়া যুবসমাজ ও ট্রাম চড়ার আনন্দ উপভোগ করতে চায়। কলকাতার ঐতিহ্য ট্রামের স্থান সম্পূর্ণ রূপে ইতিহাসের পাতায় না হোক এই প্রত্যাশা কলকাতার মানুষ করে।

লেখক পরিচিতি
পূষণ সরকার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে বি.এ., প্রেসিদেন্সি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ., এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.ফিল. করেছেন। বর্তমানে তিনি ভারতের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাসে, সামাজিক ইতিহাস ও নাগরায়ন নিয়ে গবেষণারত।
যোগাযোগ – [email protected]

অনুবাদক:Mollika Mukherjee (Ganguly)
Head Mistress
Chanda Improved Junior
High School.
Jamuria.


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।