দেশ

এলজি পলিমার থেকে বাঘজান, উদাসীন কেন্দ্র সরকার


মল্লিকা গাঙ্গুলি: চিন্তন নিউজ:১৩ই জুন:- এখনও জ্বলছে বাগজান। আগুন নেভাতে দুজন দমকল কর্মীর মৃত্যু হলেও নিয়ন্ত্রণ হয়নি আগুন। পূর্ব আসামের তিনসুকিয়া জেলার বাগজান খনি এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল দাউদাউ করে জ্বলছে। জ্বলছে ঐ অঞ্চলের স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের আগুন। ঘটনা ঘটেছে গত মঙ্গলবার তিনসুকিয়া জেলার বাগজানের ও.এন.জি.সি-র এক তেলের খনিতে। সেখানে আচমকাই ভয়াবহ আগুন ছড়িয়ে পড়ে বলে খবরে প্রকাশ।

কিন্তু আসলে ঘটনার সূত্রপাত বেশ কিছু দিন আগে থেকেই। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে ঐ খনি থেকে গ্যাস লিক করে ঝাঁঝালো গন্ধ মানুষ বাইরে থেকেও টের পেয়েছে, খনিতে কর্মরত শ্রমিকদের ঐ বিষাক্ত গ্যাসে যথেষ্ট কষ্ট ও হচ্ছিল। এমনকি সমস্যা খতিয়ে দেখতে সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষজ্ঞ দল ও আসে। তাঁরা কারন অনুসন্ধান করে সরকার তথা খনি কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলেন। তথাপি সরকারের উদাসীনতায় ও.এন.জি.সি কর্তৃপক্ষ আগাম কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ার জন্যই তেলের কুয়োতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে, আর তার সঙ্গে পর পর বিষ্ফোরণে আতঙ্কের রূপ নেয়। ক্রমে আগুন বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় গাছপালা পশুপাখি সহ নিরীহ মানুষ। বাসিন্দাদের প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হলেও সেখান থেকে ও বিষ্ফোরণের কম্পন অনুভুত হয়। আগুন বিধ্বংসী রূপ নেওয়ার পর উদ্ধার কর্মীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে কিন্তু আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয় নি।

লক ডাউনের মধ্যেই একের পর এক ঘটেছে একই ধরনের দুর্ঘটনার ঘটনা আর প্রতিটি ঘটনাতেই উদাসীন কেন্দ্র। বিশাখাপত্তনমের এল জি পলিমার কারখানায় গ্যাস লিক, ছত্তিশগড়ের কারখানায় গ্যাস লিক, গুজরাটে কারখানায় আগুনের পর আসামের বাগজান। একটি ক্ষেত্রেও কোন রকম ব্যবস্থা নেয়নি সরকার।

বাঘজান খনিতে দমকল ও খনি কর্মীরা হতাহত হলেও খনির ভিতরের আগুন নেভানোর কোনো উপায় এখনও বের হয় নি। প্রায় ৫০ কিমি ছড়িয়ে পড়া এই আগুন আয়ত্তে আনতে অন্তত এক মাস কেটে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আসাম রাজ্য সরকার নড়েচড়ে বসে। মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সানোয়াল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে আলোচনা করে স্থানীয় বাগজানের বাসিন্দাদের১২টা শিবির তৈরি করে সরিয়ে দেওয়া হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধান কমিটি গঠন করে হাইকোর্টে একটি জনস্বার্থ মামলা ও সরকার দায়ের করেছে। কিন্তু সরকারের গাফিলতির কারনেই যে এই অগ্নি বিপর্যয় একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকার এখন যে সমস্ত পদক্ষেপ নিয়ে জনসমর্থন আদায়ের প্রহসন করছে তা সাধারণ মানুষ কে আশ্বস্ত করতে পারছে না। প্রত্যক্ষ প্রভাবিত মানুষ এখনো ভয়ে কাঁপছে।

বাগজানের বাসিন্দা সঞ্জীব মোরানের বক্তব্য- ১৫দিন আগে থেকেই তারা গ্যাস লিক আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। অনেক আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট চোখ জ্বালা শুরু হয়েছে। কিন্তু মালিক পক্ষের লোকেরা কর্মরত শ্রমিকদের কথার কোনো গুরুত্ব দেয় নি। আতঙ্কিত শ্রমিকদের আশঙ্কা তাদের গোটা বাগজান অঞ্চল শেষ হয়ে গেল, চোখের সামনে সব পুড়ে ছাই হয়ে গেল, ফসল নষ্ট হয়ে গেল, এমন বিপর্যয় তারা আগে কখনও দেখেনি। তারা আর উঠে দাঁড়াতে পারবে না বলে আক্ষেপ করে । একেই হয়তো বলা যায় “মরার উপর খাঁড়ার ঘা”- যখন সমগ্র বিশ্ব তথা দেশে করোনা অতিমারির কারনে মানুষের স্বাস্থ্য জীবন রুজি রোজগার বিপন্ন সেই সময় এই মনুষ্য সৃষ্ট বিপর্যয় তিনসুকিয়া তথা আসাম বাসীর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছে । বাগজানের সাত হাজার মানুষ কে মাত্র ১২ টি শিবিরে সরিয়ে এনে আগুনে পোড়া থেকে বাঁচাতে গিয়ে সরকার ঐ ঘন শিবিরে গা ঘেঁষাঘেঁষি করে রেখে করোনা ছড়ানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চল প্রকৃতির রাজ্য। অসংখ্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর আসাম এখন মনুষ্য কৃত অগ্নি বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত। বর্তমানে বিষাক্ত গ্যাস, আগুন, করোনা সংক্রমণের বিপত্তি আর এর উত্তরকালে দীর্ঘদিন ধরে আসামবাসীর জীবনে চলবে শস্যহানি, জীববৈচিত্র ধ্বংস, প্রকৃতি বিনাশ, আর মারাত্মক বে রোজগার অনাহার ইত্যাদি বিপন্নতার শিকার হতে হবে। অথচ সরকার যদি একটু সচেতন হতো এই দুর্ঘটনা এড়ানো অসম্ভব ছিল না। পুঁজিবাদী সরকারের মূল লক্ষ্য শিল্পপতি শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে নিজের আখেড় গোছানো বলেই ও এন জি সি কর্তৃপক্ষের গাফিলতিতে মদত দিয়ে তিনসুকিয়ার লেলিহান অগ্নিকাণ্ডে জনজীবন বিপর্যস্ত । সময় অনুযায়ী পরিকল্পনা গ্রহণের অভাবে পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার পর সরকারও খনি মালিকের তৎপরতার নাটক খনি সংলগ্ন মানুষ গুলিকে অনিশ্চিত জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। আসাম সরকারের উদাসীনতায় রাজ্যে যে বিপর্যয় নেমে এসেছে তার দায় ও সরকারের। গণতান্ত্রিক দেশে জনগনের সরকারের এই জনবিরোধী স্বার্থপরতা কখনো ই গ্রহণযোগ্য নয়।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।