কলমের খোঁচা

বিবেকানন্দের সাম্যদর্শণ


কল্পনা গুপ্ত, চিন্তন নিউজ, ৪ঠা জুলাই: দেরেটোনা, বর্ধমানের কালনা মহকুমার একটি গ্রামে বিবেকানন্দের পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস। পরে এঁদেরই একজন রামমোহন দত্ত সিমলা, ৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে ৩৯ কাঠা জায়গার ওপরে বাড়ি করেন। তাঁর নাতি বিশ্বনাথ দত্তের ছেলে বিবেকানন্দ। বিবেকানন্দ অর্থাৎ নরেন দত্তের জন্ম ১২ ই জানুয়ারি ১৮৬৩ এবং মৃত্যু ৪ঠা জুলাই, ১৯০২ সালে। মাত্র ৩৯ বছরের আয়ুস্কাল।

বিবেকানন্দ শিকাগো ধর্ম মহাসভা থেকে ফিরে বলেছিলেন, “আমি কোন সেনাপতি নই, রাজা নই, ধনী নই, কিছু নই আমি শুধু দরিদ্র এক ভিখারি সন্ন্যাসী।” তাহলে শুধু এই দরিদ্র সন্ন্যাসী কেন আজও প্রাসঙ্গিক? কি ছিলো তাঁর জীবনবেদে? বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার শুরুতেই বর্তমান সময়ের কিছু মার্কসীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে এই মহা বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর সম্বন্ধে কিছু বিদগ্ধ ব্যাক্তির উক্তি দেখে নেওয়া যাক।

কালিকট বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেমিনারে মার্ক্সীয় রাজনীতিবিদ ই এম এস নাম্বুদ্রিপাদ বিবেকানন্দের দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলেন – “স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন সেই বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিক যিনি শুধু তাঁর চোখে দেখা ভারতীয় সমাজকে ব্যাখ্যাই করেন নি, তার পরিবর্তনও চেয়েছিলেন। যে বেদান্ত দর্শনের ওপর ভিত্তি করে শঙ্কর জাত – পাত ভিত্তিক সমাজকে সংহত করতে চেয়েছিলেন, তাকেই বিবেকানন্দ ব্যবহার করলেন জাত- পাত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে মানুষকে সমবেত করে। তিনি শূদ্র শাসণের তত্ত্ব প্রচার করেছিলেন – যা সর্বহারা শাসনের একটি হিন্দু রূপান্তর। তিনি সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক অর্থাৎ সার্বিক সাম্যের আহবান জানিয়েছিলেন। তিনি ভারতীয় সমাজের সম্পূর্ণ পুনর্গঠনের জন্য কাজ করে গিয়েছিলেন। তিনি ও তাঁর প্রজন্মের সহকর্মীরা যে কাজ করে গিয়েছিলেন তারই ফলে পরবর্তীকালে মার্ক্সবাদের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলন ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী আন্দোলন গড়ে ওঠে।”

তাঁর প্রসঙ্গে জ্যোতি বসু বলেছেন- “মানবসেবাই তাঁর কাছে ধর্ম।” মার্ক্সীয় তাত্ত্বিক নেতা হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় বলছেন, “বিবেকানন্দের মধ্যে যে মানবিক গুণ ছিলো তা আমাদের আকৃষ্ট করে। তিনি সাম্প্রদায়িক, কুসংস্কার ব্যবস্থাদির বিরুদ্ধে তীব্র জেহাদ ঘোষণা করেছেন। গোমাতা সংরক্ষণ সম্বন্ধে বলেছিলেন, Like mother Like son. যেমন মাতা তেমন সন্তান। সাম্যবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত রোমারঁল্যার সূত্রে পাশ্চাত্যে সমাজতান্ত্রিক জগতে বিবেকানন্দ সম্পর্কে আগ্রহ সঞ্চারিত হয়।”

ভারতীয় দর্শন ও ধর্মভাবনার মধ্যে নিজ বিশ্বাসের প্রতিফলন খুঁজে পেতেন যে তলস্তয়, তাঁর জীবনের শেষের দিকে অর্থাৎ ১৯০৮ সালে বিবেকানন্দ দর্শনের সঙ্গে নিবিড় পরিচিতির সুযোগ ঘটে। রুশ লেখক আই এফ নাঝিভিন বিবেকানন্দের দুটি ভাষণের রুশ অনুবাদ করেন এবং এটিই রুশ ভাষায় প্রথম বিবেকানন্দের রচনার ভাষান্তর। ১৯০৮ এর ৫ ই জুন তলস্তয় লেখেন – “সকাল ছটা থেকে বিবেকানন্দের কথা ভাবছি। গতকাল সারাদিন বিবেকানন্দের লেখা পড়েছি।”

এই স্বল্প পরিসরে বিবেকানন্দের স্বদেশ ভাবনার একটা সংক্ষিপ্ত আভাস দিয়ে শেষ করবো। স্বাধীনতা সংগ্রামী হেমচন্দ্র ঘোষের ভূপেন্দ্রনাথ দত্তকে লেখা থেকে প্রাপ্ত স্বামীজির সাথে তাঁর কথোপকথনের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি। “…… আমরা সেই মহান আচার্যের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলাম ১৯০১ সালের ১৩ ও ১৪ ই এপ্রিল। তিনি স্নেহভরে আমাদের কাছে টেনে নিলেন।…. স্বামীজি আবেগপূর্ণ কন্ঠে আমাদের উদ্দীপ্ত করলেন – দরিদ্র, পদদলিত, নিপীড়িত, অত্যাচারিত মানুষের সেবায় আত্মনিয়োগ করবার জন্য। চারদফা কর্মসূচি তিনি দিলেন – জনসাধারণের সেবা,অস্পৃশ্যতার উৎপাটন, ব্যায়ামাগার স্থাপন ও গ্রন্থাগার আন্দোলন।

কথাপ্রসঙ্গে তিনি স্বগোতক্তি করেছিলেন- হ্যা, সারা পৃথিবী জুড়ে শূদ্রের অভ্যুত্থান ঘটবে সমাজ বিজ্ঞানের নির্দেশেই।… চেয়ে দেখ চীনের ভবিষ্যৎ মহান অভ্যুত্থান এবং তার পেছনে পেছনে সারা এশিয়ার দেশসমূহের জাগরণ। জেনে রাখ শূদ্রের অভ্যুত্থান প্রথমে ঘটবে রাশিয়ায় এবং তারপর চীনে। ভারতের অভ্যুত্থান ঘটবে তারপর এবং ভবিষ্যৎ পৃথিবীতে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে ভারত।

হেমচন্দ্র ঘোষের কথায়- বিবেকানন্দ আমাদের কাছে ধর্মনায়ক অপেক্ষা রাজনৈতিক প্রফেট রূপেই প্রতিভাত হয়েছিলেন। বিবেকানন্দ হিমশৈলের সাম্যবাদী, সমাজতান্ত্রিক চেতনার কতটুকুই বা চর্চিত হয় এই দেশে। এক পুরু ধর্মীয় চাদরে ধর্মমোহের অবগুন্ঠণে অপ্রকাশিত থেকে যায় তাঁর বিদ্রোহী স্বত্তা। আজ বিবেকানন্দের প্রয়াণ দিবসে চিন্তনের পক্ষ থেকে জানাই শ্রদ্ধা, তাঁর প্রেরণাময় বাণী উদ্বুদ্ধ করুক ভারতের নব প্রজন্মকে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।