রাজ্য

আলিপুর জেল মিউজিয়াম:চিন্তন পেজ এর জন্যে অনুসন্ধান মূলক


প্রতিবেদন: রত্না সর :চিন্তন নিউজ:০১/০৩/২০২৪:– বেশ কিছুদিন ধরেই চেষ্টা করেও যাওয়া হয়ে উঠছিল না। সম্প্রতি একটা সুযোগ আসতেই কয়েকজন বন্ধু সহ চলে গেলাম আলিপুর হয়েছিল আলিপুর সেন্ট্রাল জেল যার বর্তমান নাম আলিপুর জেল মিউজিয়াম। ঐতিহ্যবাহী বিল্ডিং ঘিরে মামলা মকদ্দমা চলার পর আদালতের নির্দেশ অনুসারে হেরিটেজ সাইট কে অক্ষত রেখে নতুন নির্মাণের কাজ করা হয়।

১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সেন্ট্রাল জেল হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে এই কারাগার। এখন এখানকার বন্দিদের বারুইপুর কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়েছে।অবশ্য এর আগেই কারাগারের বিশেষ কুঠুরিগুলো হেরিটেজ সাইটের তকমা পেয়েছিল কিন্ত জনসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না। প্রায় ১০৮ একর জমির উপর এই জেল মিউজিয়াম ২০২২ সালের ২১ শে সেপ্টেম্বর উদ্বোধন ও ২৩ শে সেপ্টেম্বর থেকে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।


মিউজিয়ামের প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। মঙ্গলবার থেকে রবিবার, সকাল ১১ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত খোলা থাকে। সোমবার মিউজিয়াম বন্ধ থাকে। সন্ধ্যায় আলো ও ধ্বনি (Light and Sound) বিশেষ শো এর ব্যবস্থা আছে। এই শো এর টিকিট মূল্য ১০০ টাকা।

৩০ টাকার টিকিট কেটে ভিতরে প্রবেশ করলে প্রথমেই চোখে পড়ে একদিকে বিশ্ব বাংলার লোগো,অন্যদিকে ‘স্যুভেনির শপ’। ভাবলাম স্যুভেনির শপে হয়ত মিউজিয়াম সংক্রান্ত কিছু লিখিত তথ্য পাবো, কিন্ত আশাহত হলাম। কর্তব্যরত কর্মীটি বললেন আগে এরকম একটা বই পাওয়া যেত যার দাম ছিল ১০ টাকা। বর্তমানে পাওয়া যায় না। এরপর প:বঙ্গের বিভিন্ন জেলার হস্তশিল্প মেলার জন্য তৈরি জিনিসের দোকান। সেখানে আচার থেকে শুরু করে জামা, কাপড়,ব্যাগ, গহনা সবকিছু পাওয়া যায়। এগুলোর সাথে মিউজিয়ামের কি সম্পর্ক ঠিক বোধগম্য হলো না। যাক, তারপর মূল মিউজিয়ামের দিকে অগ্রসর হলাম।


মিউজিয়ামের শুরুতেই রয়েছে নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, ড: বিধান চন্দ্র রায়, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্তের দিন কাটানো সেল গুলি। নেতাজীর সেলের সন্নিকটে রয়েছে ফাঁসির মঞ্চ। ফাঁসির মঞ্চের সঙ্গে আবহ সঙ্গীত বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত বন্দীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার জন্য আলাদা ঘরের ব্যবস্থা ছিল। এই জেলে বন্দী ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, ড:বিধান চন্দ্র রায়,জওহরলাল নেহেরু, দীনেশ মজুমদার ও আরও অনেকেই।
প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু ৮০ দিন বন্দী ছিলেন এই জেলে। কন্যা ইন্দিরা গান্ধী আসতেন পিতার সঙ্গে দেখা করতে। একটা গাছের নীচে ইন্দিরা গান্ধীর ছবি সহ সংরক্ষণ করা হয়েছে এখানে। রয়েছে একটি গ্রন্থাগার। সেখানে রয়েছে বেশ কিছু লেখকের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও সংগ্রামের ভূমিকা সম্পর্কে। এছাড়া রয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা কবিতার ও অন্যান্য বই ( জানিনা, উনি নিজেকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসাবে প্রচারে আনতে চান কি না)।

আরও আছে বন্দীদের জীবনচর্যা, ঐতিহাসিক কারাকক্ষ, আছে বন্দীদের উপর ব্রিটিশ পুলিশের অত্যাচারের নমুনা, আছে তাঁতকল রুম, আছে বাংলার বিভিন্ন সশস্ত্র বিদ্রোহের কাহিনীগুলোকে তুলে ধরার প্রচেষ্টা, বাংলার মহিলা স্বাধীনতা সংগ্রামী দের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন। আছে সশস্ত্র বিপ্লবীদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র সহ আগ্নেয়াস্ত্র। এই মিউজিয়ামে সেলুলার জেলের বন্দীদের বন্দীজীবনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। বিভিন্ন মনীষীদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করা হয়েছে এখানে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগর, রাজা রামমোহন রায়,স্বামী বিবেকানন্দ প্রমুখ।

মিউজিয়ামে তৈরী করা হয়েছে একটি আর্ট গ্যালারি। সেখানে পুরাতন দিনের পয়সা সংরক্ষণ করা হয়েছে। এরই সঙ্গে এখানে স্থান হয়েছে দক্ষিণ কলকাতার পূজো মন্ডপের দুর্গা প্রতিমার। দুর্গা প্রতিমা রাখার যৌক্তিকতা অবশ্য বোধগম্য হল না।মিউজিয়ামের একটি কক্ষ যেটি সি .এম(Chief Minister) রুম বলেই পরিচিত সেটি বিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করল।সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর ভাষণ দেওয়ার ছবি,রুপোলি পর্দার নায়ক নায়িকাদের সঙ্গে ছবি,এমন কী সম্প্রতি উত্তরবঙ্গের চা বাগানে যে বিশেষ ধরনের পোশাকে সজ্জিত হয়ে চা তুলেছেন সেটি এবং যে কয়েকটি চা পাতা তিনি তুলেছিলেন সেগুলিও অতি সযত্নে সজ্জিত আছে।

এছাড়াও এখানে বেশ কিছু খাবারের স্টল আছে।আর আছে কেতাদুরস্ত ঝাঁ চকচকে ক্যাফেটেরিয়া। তবে কোথাও কোথাও চড়া রং, চড়া আলোর ব্যবহার দৃষ্টিনান্দনিকতাকে আঘাত করেছে। মিউজিয়ামের বিভিন্ন সংগ্রহশালায় ব্যক্তিবিশেষের প্রাধান্য ও ব্যক্তি প্রচার বলে মনে হয়েছে।

পরিশেষে বলি,যে প্রচন্ড আবেগ তাড়িত হয়ে মিউজিয়াম পরিদর্শনে গেছিলাম ইতিহাস পিপাসু হিসেবে, তা যেন একটু আঘাত প্রাপ্ত হল। আন্দামানে সেলুলার জেলে দাঁড়িয়ে যে শিহরণ অনুভব করেছিলাম আজ সেই শিহরণে ঘাটতি থেকে গেল। আমার একান্ত অভিমত ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে বিপ্লবীদের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম ও জেলখানার গরাদের গায়ে জড়িয়ে যে রক্ত ঝরার ইতিহাস তার উপস্থাপনায় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের আরও আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।