কলমের খোঁচা

শেষ নাহি যে শেষ কথা কে বলবে ?


রঘুনাথ ভট্টাচার্য:চিন্তন নিউজ:১৪ই জুন:– সারা পৃথিবীতে ডাক্তারি তো অনেকেই পড়ে। কিন্তু ডাক্তার হয়ে একটা গোটা মহাদেশ ঘুরতে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে আসে কজন? কী উদ্দেশ্যে? সখের ভ্রমণ-পাগলামি নয়! অতি সুচারু – পরিকল্পিত যাত্রাপথ, তাঁকে তো জানতে হবে, বুঝে নিতে হবে বিশ্বময় দারিদ্র্য, ক্ষুধার পীড়ণ, গরিবি-জনিত বিধ্বস্ত জনস্বাস্থ্য, এইসব অভিশাপের উৎসমুখ। জনসাধারণের দুর্দশার প্রকৃত কারণ জানার অনুসন্ধিৎসা ছুটিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছে এই অগ্নিময় যুবককে লাতিন আমেরিকার দেশে দেশে।

তিনি প্রত‍্যক্ষ করেছিলেন কীভাবে ধনতান্ত্রিক আমেরিকা তার সিআইএ বাহিনীর সহায়তায় গুয়াতেমালার ফলচাষীদের উপর শোষণ চালাত। সেখানে একচেটিয়া মালিকানা ছিল আমেরিকার সমর্থনে পুষ্ট ‘ ইউনাইটেড ফ্রুট কোম্পানীর। তারা ফলচাষী আর শ্রমিকদের উপর যে পীড়ণ ও শোষন চালাত । সেই জ্ঞাণের আলোয় তিনি ঋদ্ধ হন।সেই অভিজ্ঞতাই ক্রমশঃ তাঁর বিদ্রোহী সত্ত্বাকে জাগিয়ে তোলে এবং তাঁকে ক্রমশঃ সমাজ সংস্কারের পথে টেনে এনে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। সমসময়ে গুয়াতেমালার প্রেসিডেন্ট জেকব আরবেঞ্জকে সিআইএর সাহায্যে উৎখাত করা হয়। প্রত‍্যক্ষ তথ‍্যে চে’র চিত্ত সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

একচেটিয়া ব্যবসা আর ধনতন্ত্রী শাসকের ‘ নেক্সাস ‘-এর সেই ক্লিন্ন স্বরূপ গুয়েভারার বিপ্লবী চিত্তকে গভীর ভাবে নাড়া দেয় এবং রাজনৈতিকভাবে​ তার বামপন্থী অবস্থান নির্দিষ্ট করে দেয়। সে তখন বিশ্ব-পথিক।

মেক্সিকো সিটিতে মিলন হোল তিন নক্ষত্রের। ফিদেল কাস্ত্রো ও রাউল কাস্ত্রো এবং আর্নেস্তো ‘চে ‘ গুয়েভারা। তারা গড়ে তুললেন বিখ্যাত সেই আন্দোলন, যা পরে ‘ ২৬শে জুলাই আন্দোলন ‘ নামে খ‍্যাত হবে। সেখানেই পরিকল্পনা সম্পুর্ন হল কিউবায় আমেরিকা-সমর্থিত একনায়ক স্বৈরাচারী বাতিস্তার উচ্ছেদের। তাঁর পর তো ইতিহাস।

এই স্বতঃস্ফুর্ত সক্রিয়তা চে’কে বিপ্লবীদের নেতৃস্থানীয় করে তোলে। ক্রমশঃ কিউবার বিপ্লবীদের নেতৃত্বের দ্বিতীয় প্রধান ব‍্যক্তি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে। দুই বৎসর ব‍্যাপী গেরিলা যুদ্ধের শেষে কুখ‍্যাত বাতিস্তা সরকারের পতন হয়।

সার্থক কিউবা বিপ্লবের পর কিউবার স্বাধীন সরকারের পুনর্গঠনের কর্মসূচিতে গুয়েভারার সক্রিয় অংশগ্রহণ বিশ্বের বামপন্থী নেতৃত্বের সামনে এক অসামান্য দৃষ্টান্ত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত। সরকারেও চে তখন কাস্ত্রোর পরে দ্বিতীয় নেতৃত্ব হিসাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
নিপীড়িত বিধ্বস্ত কিউবার পুনর্গঠনে চে’র নিঃস্বার্থ আত্মদান পৃথিবীর জনজাগরণ – সংগঠনের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ‍্যায়।

বিপ্লবের পরবর্তী পর্যায়ে গুয়েভারা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ট্রাইব্যুনাল-এর আপীল সভার প্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। কৃষি ও ভূমি-সংস্কার দপ্তরের মন্ত্রীত্বে তার সাফল‍্য কিউবা তো বটেই সারা বামপন্থী বিশ্ব চিরকাল স্মরণ করবে। জাতীয় ব‍্যঙ্কের প্রধান হিসাবে তাঁর পরিকল্পনা শোষিত কিউবাকে এক পরিশীলিত , সুদৃঢ় ও সংস্কৃত প্রকৃত জনমুখী অর্থনৈতিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করে। কিউবার সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম নির্দেশক ছিলেন যখন তিনি সে দেশের সুরক্ষা ব‍্যবস্থাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছিলেন অতুলনীয় দক্ষতায়। কিউবার সমাজতন্ত্রের নিদর্শন সারা পৃথিবীতে জনপ্রিয় করে তোলার গুরু-দায়িত্বও তিনি পালন করেন কিউবার বিদেশ নীতির মুখপাত্র হিসাবে।

কিউবার শক্তিশালী মিলিশিয়া বাহিনীও গুয়েভারার সক্রিয় নেতৃত্বে গড়ে ওঠে। তাঁরই নেতৃত্বে সোভিয়েত রাশিয়ার অন্তর্দেশীয় ক্ষেপনাস্ত্র কিউবায় আনা হয় এবং ১৯৬৫ এর উত্তেজক ‘ মিশাইল ক্রাইসিস ‘ নামে পরিচিত বিশ্বরাজনীতির সেই কুখ্যাত অধ‍্যায় প্রায় শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়। এইভাবেই চে’ বিশ্বশান্তির ইতিহাসে তাঁর নাম লিখে রেখে গেছেন।

ছবির অন‍্যদিকে আমরা পাই অন‍্য এক চে’ গুয়েভারাকে, যিনি সৃষ্টিশীল সাহিত‍্যর রচয়িতা, সুলেখক, গ্রন্থকার, আত্মজীবনীকার। ‘ চে -গুয়েভারার ডায়েরি’ পৃথিবীর জাগ্রত যৌবনের স্বপ্ন তৈরি করেছে। তিনি তাঁর মার্ক্সীয়- লেনিনীয় শিক্ষালব্ধ অভিজ্ঞতার প্রয়োগ -কৌশলের ফসলের ডালিতে পৃথিবীকে দিয়েছেন এক অসাধারণ চেতনার সমৃদ্ধি যা প্রমাণ করেছে যে,আন্তর্জাতিক সাম্রাজ্যবাদ, নব উপনিবেশবাদ , একচেটিয়া ধনতন্ত্রবাদ, ইত‍্যাদি জনস্বার্থবিরোধী সমাজদূষণের একমাত্র প্রতিষেধক হল আন্তর্জাতিক সাম‍্যবাদপুষ্ট বিশ্ব -বিপ্লব। এই ধ‍্যানই তাঁকে ১৯৬৫ তে টেনে নিয়ে যায় সেই নিপীড়িত জনতার দেশে -কঙ্গোয়। সেখানে নানা কারণে তাঁর প্রথম প্রচেষ্টা ব‍্যর্থ হয়। পরে তিনি লাতিনআমেরিকায় ফিরে আসেন। বলিভিয়ার মুক্তি যুদ্ধে নেতৃত্ব দিতে। গেরিলা যুদ্ধের শিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন বলিভিয়ার মুক্তিযোদ্ধাদের। সেখানেই যুদ্ধক্ষেত্রে সিআইএর মদতে বলিভিয়ার শাসক জুন্টা ‘এ‍্যাক্সিডেন্টালি ‘ তাঁকে আটক করে ও গুলি করে হত‍্যা করে।

১৯৬৭ সালের ১৯শে অক্টোবর গুলি করে হত‍্যা করা হয় তাঁকে। তিনি তখন আগুন ঝড়ানো ঊনচল্লিশের এক যুবক। আর্জেন্টিনায় সান্টা ফে প্রদেশের রোজারিও তে ১৯২৮ এর ১৪ই জুন জন্ম হয় বিশ্বপথিক আর্নেস্তো গুয়েভারার।
তিনি জনপ্রিয় ‘ চে গুয়েভারা ‘ বা শুধু ‘ চে ‘ নামে। বাবা আর্নেস্তো গুয়েভারা লিঞ্চ ও মা সিলিয়া। স্ত্রী হিলডা গেদিয়া, চার সন্তানের জনক- জননী তাঁরা। আলেইদা, ক‍্যামিলো , সিলিয়া ও আর্নেস্টো। ডাক্তারি পাশ করার পর পর তিনি বিপ্লবের ধ‍্যানে নিবিষ্ট হয়ে পড়েন ও আমৃত‍্যু বিপ্লব সংগঠনে স্থিরচিত্ত থাকেন।

তাঁর বিরোধী মতবাদীরাও তাকে যথেষ্ট শ্রদ্ধা করতেন। ধনতন্ত্রের উগ্র সমর্থক এক দক্ষিণপন্থী মুখপত্র ‘ টাইম ম‍্যাগাজিন’ তাঁকে বিশ শতকের​ বিশ্বের ১০০ জন প্রভাবশালী জননেতার অন‍্যতম বলে চিহ্নিত করে। জনৈক আলবার্তো কোর্দো -য়ের তোলা তাঁর ছবি ‘ গেরিলা যুদ্ধের বীর ‘ নাম নিয়েছেন​ মেরিল‍্যান্ড কলেজ অব্ আর্ট-য়ের রাখা আছে। পরিচিতি দেওয়া হয়েছে ‘পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত ছবি ‘।

আর্নেস্টো ‘ চে ‘ গুয়েভারা গণজাগরণ ও শ্রেণী সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা হিসাবে সংগ্রামী জনগণকে এক নতুন পথ দেখান যা বিপ্লবের অভিধানে ‘গুয়েভারাবাদ’ নামে স্থান করে নিয়েছে। তাঁর শহিদী আত্মত‍্যাগ , শ্রেণী সংগ্রামের সৃজনশীল কাব‍্যিক চিন্তাধারা, সাহস আলোকিত শ্রেণীচেতনা, বিশ্বনেতৃত্বের স্বরূপে স্থিতি, তাকে এক নতুন মানবতাবাদের জনক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং তাঁর দুর্লঙ্ঘ‍্য নৈতিক বোধ বস্তুবাদ কে তুচ্ছজ্ঞানে বর্জন করেছে।

কিউবার সান্টাক্লরার ‘ চে-গুয়েভারা মোসেলিয়ম’ – য়ে ‘মরুবিজয়ের কেতন’ ওড়ানো এই স্বপ্নদ্রষ্টা চিরপ্রশান্তিতে চিরনিদ্রায় শায়িত। ‘ চে-গুয়েভারা ‘ অমর রহে।আজ আমাদের প্রিয় ‘ চে ‘-র তিরানব্বইতম জন্মদিন।এদিন তাঁকে পৃথিবী স্মরণ করবে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।