কলমের খোঁচা

ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়


গৌরী সেনগুপ্ত:চিন্তন নিউজ:২৭শে জুন:– ভারতীয় সাহিত্য ও রাজনীতির ইতিহাসে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়  তাঁর মৃত্যুর পর প্রবল তেজস্বিতার উৎস হয়ে উঠলেন তাঁর দেশমাতৃকার বন্দনার মধ্য দিয়ে । অত্যাচার বিরোধী শক্তি হিসাবে বিপ্লবীরা ফাঁসির মঞ্চ উঠেছেন বন্দেমাতরম’ ধ্বনি দিয়ে । যে কোন রাজনৈতিক আদর্শের কেন্দ্রবিন্দুতে এই দেশাত্মবোধক ধ্বনি ‘বন্দেমাতরম’ শ্লোগান যার স্রষ্টা বঙ্কিম । যার সাথে মিশে আছে গত পৌনে দু’শ বছরের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের মূল্যবোধ যার মধ্য থেকে জন্ম হচ্ছে নতুন বঙ্কিম, নতুন তাৎপর্য।

১৮৩৮ সালের ২৬শে জুন ২৪পরগণা জেলা কাঁঠালপাড়া গ্রামে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্ম । বাবা যাদবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের ডেপুটি কালেক্টর , মা দুর্গাদেবী । বঙ্কিম তাঁদের চতুর্থ সন্তান । ১৮৯৪ এর ৮ই এপ্রিল তিনি মৃত্যবরণ করেন ।

এক মানবিক বিজ্ঞান নির্ভর দৃষ্টিতে , নিত্য নব প্রত্যাশায় এক স্পর্ধিত ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় । তিনি স্বদেশবাসীকে সঠিক উন্নতির পথ দেখিয়ে বলেছিলেন,” যাহাতে মনুষ্যের শারীরিক ,মানসিক এবং সামাজিক সর্বাধিক উন্নতি হয় তাহাই ধর্ম “। তিনি ইওরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসনে দেশের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে স্বীকার করেও চরম বাস্তব সত্যকে প্রতিষ্ঠা করতে দ্বিধা করেননি ,” ভারতীয়  কৃষকেরা সেই শ্রীবৃদ্ধির ভাগী নয় অথচ দেশের নব্বই শতাংশ মানুষই কৃষিজীবী ।“ ঋষি বঙ্কিম একদিকে যেমন বাংলা ভাষা সাহিত্যে নবযুগ প্রবর্তন করতে চেয়েছিলেন তেমনই হাসিম সেখ ও রমা কৈবর্তদের উন্নতিতেই যে দেশের  শ্রীবৃদ্ধি সম্ভব তা দৃঢ়ভাবে প্রচার করেছেন ।

এক উদার মনোভাবের এবং সঠিক পথের দর্শনে দেশের প্রকৃত সত্য তুলে ধরেছেন । ‘বঙ্গদর্শন ‘ পত্রিকায় তিনি বলেছেন ,” বাঙ্গলা  হিন্দু মুসলমানের দেশ —একা হিন্দুর দেশ নহে ।“ জাতীয় ঐক্যের দিকে লক্ষ্য রেখে এবং দেশের উন্নতিকল্পে  তিনি তাঁর  সাহিত্যজগতে  বিচরণ করতেন । ‘বঙ্গদেশের  কৃষক ‘ এই প্রবন্ধে  বঙ্কিম লিখলেন , “ বাঙ্গালী কৃষকের শত্রু  বাঙ্গালী ভূস্বামী । বাঘ্রাদি বৃহজ্জন্তু ছাগাদি ক্ষুদ্র জন্তুগণকে ভক্ষণ করে ; রোহিতাদি বৃহৎ মৎস্য সফরীদিগকে ভক্ষণ করে ; জমীদার নামক বড় মানুষ  কৃষক নামক ছোট মানুষকে ভক্ষণ করে । জমীদার প্রকৃতপক্ষে কৃষকদিগকে ধরিয়া উদরস্থ করেন না বটে , কিন্তু যাহা করেন, তাহা অপেক্ষা হৃদয়-শোণিত পান করা দয়ার কাজ ।”

একথা ঠিক যে বঙ্কিম তাঁর সময়ের পটভূমিতে উপন্যাস এবং অন্যান্য সাহিত্যকর্ম  পাঠক সমক্ষে তুলে ধরেছিলেন স্বাভাবিকভাবে তৎকালীন সামাজিক দ্বন্দ্ব এবং তার আর্থসামাজিক  ও রাজনৈতিক প্রভাব সাহিত্যে স্পষ্টভাবে  প্রতিফলিত হয়েছিল ।  দেশের তৎকালীন পটভূমিতে হিন্দু মুসলমান এই দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সামাজিক বৈরিতা তাঁকে ব্যথাহত করতো যা তিনি নিরপেক্ষ এবং মোহমুক্ত দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর সাহিত্যে বঙ্কিম প্রতিভা এক বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে দেশবাসীর সামনে । ‘ধর্ম এবং সাহিত্য’ এই প্রবন্ধে বঙ্কিম ধর্মের  যথার্থ তাৎপর্য তুলে ধরেছেন , ‘  ধর্ম আত্মপীড়ন নহে—আপনার উন্নতি-সাধন, আপনার আনন্দ-বর্ধনই ধর্ম ।“  অনেক সময় কথা উঠেছে হিন্দুত্বের আড়ম্বর  বঙ্কিম সাহিত্যে প্রকট, কিন্তু তাঁর সাহিত্য পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তাঁর সত্যকার প্রতিপাদ্য হিন্দুত্ব একধরণের মানবতা । সাহিত্যিক হিসেবে তিনি ছিলেন যুগের সন্তান । তাই তাঁর যুগে যে জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা চলেছিল সে সবের সঙ্গে তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন আর সেই চেতনায় তিনি তাঁর চারপাশের লোকেদের স্পষ্ট জীবনবাদকে নির্দেশ করতে চেয়েছিলেন । মূলত তাঁর উদ্দেশ্য ছিল শ্রেয়লাভের যা চিরকালীন চিন্তাশীলেরা করে থাকেন । তাই তাঁর ‘ চন্দ্রশেখরের’ ‘ ‘শৈবলিনী’  পাপীয়সী । ‘আনন্দমঠে’ ‘কল্যাণীর কাছে ‘ ভবানন্দ’ দূরাচার পামর । এসব চরিত্র গড়ে উঠেছে মানুষের সঙ্গে সহজ আত্মীয়তার ফলে । আমাদের বিশ্বাস তাঁর পূজারী এবং উৎকট বিদ্বেষী দুইই একদা লুপ্ত হবে কেননা এই দুয়েরই চেতনার ভিতে আছে অজ্ঞানতা ।

  উনবিংশ শতাব্দীতে যেসব বঙ্গসন্তানেরা জ্ঞানবিজ্ঞান এবং যুক্তিবাদ সমৃদ্ধ ছিলেন বঙ্কিম অবশ্যই তাঁদের অন্যতম । জানা যায়  ভাটপাড়ার গোঁড়া ব্রাহ্মণ পরিবেষ্টনীর মধ্যে পালিত হয়েও তিনি ছিলেন সাম্যবাদী । কমিউনিজম , ইন্টারন্যাশনল ফুরীরিজমের তত্ত্ব তাঁর প্রবন্ধে উঠে এসেছে । রুশো তাঁর সাম্যবাদের গুরু ছিলেন  ।  সাম্যতত্ত্বে তিনি যা বুঝেছিলেন তাঁর কথাতেই বলি –“ তুমি যে উচ্চ কুলে জন্মিয়াছ সে তোমার গুণ নহে ; যে নীচ কুলে জন্মিয়াছে , সে তাহার দোষ নহে । অতএব পৃথিবীর এ সুখে তোমার যে অধিকার , নীচকুলোৎপন্নেরও সেই অধিকার । তাহার সুখের বিঘ্নকারী হইও না; মনে থাকে যেন যে, সেও তোমার ভাই । তোমার সমকক্ষ । যিনি ন্যায়বিরুদ্ধ আইনের দোষে পিতৃসম্পত্তি প্রাপ্ত হইয়াছেন বলিয়া দুর্দণ্ড প্রচণ্ড প্রতাপান্বিত, মহারাজাধিরাজ প্রভৃতিউপাধি ধারণ করেন, তাঁহারও যেন স্মরণ থাকে যে, বঙ্গদেশের কৃষক পরাণ মণ্ডল তাঁহার সমকক্ষ এবং তাঁহার ভ্রাতা ।“
  বঙ্কিম সৃষ্ট নারী চরিত্রে বঙ্কিম নিজস্ব আদর্শ প্রতিষ্ঠিত করে ছিলেন । এ আদর্শ, সাম্যবাদী বঙ্কিমের নিজস্ব আদর্শ ,তাই  ‘কৃষ্ণকান্তের উইলে’ ভ্রমর স্বামীকে লিখছেন,” যতদিন তুমি ভক্তিযোগ্য ততদিন আমারও ভক্তি , যতদিন তুমি বিশ্বাসী ততদিন আমারও বিশ্বাস । এখন তোমার উপর ভক্তি নাই বিশ্বাসও নাই । তোমার দর্শনে আমার সুখ নাই ।“সেই আদর্শে ব্রজেশ্বর দেবী চৌধুরানীর পা ধুইয়ে দেয় । বঙ্কিম আক্ষেপ করে বলেছিলেন “ বাঙ্গালার অর্ধেক অধিবাসী স্ত্রী-জাতি,– তাহাদিগকে উপকারার্থ কেহ নাই ।“

  বঙ্কিম মানসে একদিকে ছিল ঐতিহ্যের প্রতি মমতা অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানের জন্য আগ্রহ ,যুক্তির প্রতি আস্থা পাশ্চাত্য  বিজ্ঞান এবং কর্মদক্ষতায় শ্রদ্ধা—সব মিলিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল বঙ্কিম দর্শন ।  বঙ্কিমচন্দ্রের ধর্মের ভিত্তি ছিল বিশ্বপ্রীতি ও মানবপ্রীতি । বঙ্কিমের মানবধর্ম কমলাকান্তর মুখে উঠে এসেছে ,” মনুষ্যজাতির প্রতি যদি আমার প্রীতি থাকে তবে অন্য সুখ চাহি না ।“আধুনিক সামাজিক ও মনস্তাত্বিক সাহিত্য রচনার পথিকৃৎ ছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র ।

বঙ্কিমচন্দ্রের মৃত্যুর পৌনে দু’শ বছর অতিক্রান্ত । মানুষের ইতিহাসে পরিবর্তন ঘটেছে অভাবনীয় ভাবে । সাম্রাজ্যবাদের প্রবল আধিপত্য হয়েছে ,খণ্ড খণ্ড হয়েছে সংঘাতে । জাতিতে, ধর্মে, ভাষায় এসেছে দ্বন্দ্ব, তবু বঙ্কিমচন্দ্র আজও শ্রদ্ধেয় মৃত ব্যক্তিত্ব হিসেবে নয় । তিনি আমাদের অন্তরে  জীবিত একজন  কালজয়ী সন্নিষ্ঠ সাহিত্যিক ।আজ সাহিত্য সম্রাটের জন্মদিবসে শ্রদ্ধায় স্মরণ।



মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।