রাজনৈতিক রাজ্য

কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা – প্রধানপতি বা সরপঞ্চপতিতে কার্যত সায় দিলো এ রাজ‍‍্যের শাসক।


উত্তম দে, নিজস্ব প্রতিবেদন: চিন্তন নিউজ: ০২/০২/২০২৪;- — নারী ক্ষমতায়নকে ব‍ুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে,পুরুষতান্ত্রিক মনুবাদী সমাজ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া হিসেবে,কেন্দ্রের মোদী সরকারের দেখানো পথেই হাঁটলেন রাজ‍্যের মুখ‍্যমন্ত্রী।সম্প্রতি বিভিন্ন জেলাশাসক দপ্তরে রাজ‍্য সরকারের তরফে যে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে, তাতেই স্পষ্ট কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশিকা – প্রধানপতি বা সরপঞ্চপতিতে কার্যত সায় দিলো এ রাজ‍‍্যের শাসক।কেন্দ্রের তরফে পাঠানো নির্দেশে বলা হয়েছে,নির্বাচিত প্রধান হলে,সরকারী প্রশিক্ষণে থাকবে স্বামীও। আর এবার রাজ‍্যের তরফে জেলাশাসকদের দেওয়া নির্দেশিকায় বলা হলো,প্রধান, উপ প্রধান, পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি,জেলা পরিষদের সভাধিপতি মহিলা হলে, সরকারী প্রশিক্ষণে থাকবে তাদের স্বামীও।
সিপিআই(এম) রাজ‍্য সম্পাদক মহঃ সেলিম,গণতান্ত্রিক মহিলা সমিতির রাজ‍্য সাধারণ সম্পাদিকা কনিনিকা ঘোষ এর তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে এই নির্দেশিকা প্রত‍্যাহারের দাবী জানিয়েছেন।

তবে কি কেন্দ্র ও রাজ‍্য দুই সরকারই মনে করে, ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব‍্যবস্থায় মহিলারা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে অপারগ? আর তাই সংরক্ষণের নামে মহিলাদের চেয়ারে বসিয়ে,বকলমে পুরুষের হাতে ত্রিস্তর পঞ্চায়েতের পরিচালনার দায়িত্ব অর্পনের সরকারী শিলমোহর? অথচ, বামফ্রন্ট সরকারের উদ‍্যোগে ১৯৭৮ সালে, দেশের প্রথম চালু হওয়া ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব‍্যবস্থায় তো আমরা দেখেছি অসংখ‍্য মহিলা সফলতার সাথে এই দায়িত্ব পালন করে সরকারি পুরষ্কার পেয়েছেন।

বেশীদিনের কথা তো নয়? এই তো সেদিন,সংসদে মহিলা সংরক্ষণ বিল পাশ হয়ে গেল।যদিও এই সংরক্ষণের দাবীতে অনেকদিন ধরেই, প্রয়াত গীতা মুখার্জী, বৃন্দা কারাতদের নেতৃত্বে সংসদের ভেতর ও বাইরে বামপন্থীরা দাবী জানিয়ে এসেছিলেন। তবু তো আমরা এই বিলের কৃতিত্ত্ব নিতে প্রধানমন্ত্রীকে ব‍্যস্ত হতে দেখলাম। আমরা এটাও তো দেখছি, বেটি বাঁচাও,বেটি পড়াও বা কন‍্যাশ্রী,লক্ষীর ভান্ডার প্রকল্পের নামে নারী জাতির প্রতি তাদের সহমর্মিতা জানাতে রাস্তার মোড়ে,মোড়ে ফ্লেক্স,হোর্ডিং টাঙ্গিয়ে কেন্দ্র ও রাজ‍্য দুইই সরকার রাজকোষ থেকে কোটি কোটি টাকা ব‍্যয় করছে।তারপরেও মহিলাদের কার্যক্ষমতার প্রতি বড় প্রশ্ন চিহ্ন রেখ কেন বকলমে পুরুষের হাতে ক্ষমতা অর্পনের প্রচেষ্টা? তবে কি এসব প্রকল্প শুধুমাত্র মহিলাদের সহানুভুতিকে ভোট বাক্সে প্রতিফলিত করার চেষ্টা মাত্র?

অথচ ১৯৭৮ সালে প্রয়াত জ‍্যোতি বসুর নেতৃত্বের বামফ্রন্ট সরকার যখন দেশের প্রথম এ রাজ‍্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েত ব‍্যবস্থা চালু করে,তার মুল উদ্দেশ্য ছিলো,ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরন। মহিলা, প্রান্তিক মানুষের ক্ষমতায়ন।
এই প্রধানপতির আড়ালে লুকিয়ে রয়েছে সংঘ পরিবার তথা বিজেপির,মনুসংহিতার পথে দেশকে নিয়ে যাওয়ার এক সুপ্ত বাসনা।আর রাজ‍্যসরকার তার পাঠানো নির্দেশিকার মধ‍্য দিয়ে মনুবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজ গঠনে বিজেপিকে পক্ষান্তরে সাহায‍্য করছে।
কি এই মনু সংহিতা? এটি হলো কতকগুলি বিধিনিষেধ সম্পর্কিত গ্রন্থ। মনুতে লেখক হিসেবে ভার্গব বংশের নাম পাওয়া যায়। পরে নারদস্মৃতিতে এর লেখক হিসেবে সুমতি ভার্গবের নাম উল্লেখ করা হয়।যার ছত্রে ছত্রে শুদ্রের পাশে নারীর মানবিক অধিকার ক্ষুন্ন করা হয়েছে। “বাল‍্যকালে স্ত্রীলোক পিতার বশে,যৌবনে স্বামীর বশে,এবং স্বামীর মৃত‍্যু হলে পুত্রের বশে থাকবেন।পুত্র না থাকলে সপিন্ডের বশে থাকবেন।অর্থাৎ স্ত্রীলোক কখনোই স্বাধীনভাবে অবস্থান করবেন না” (৫/১৪২)

‘যেহেতু শাস্ত্রোত্ত বিধি অনুযায়ী মন্ত্রোচারণের মাধ‍্যমেই স্ত্রীজাতীর জাতকর্ম সংস্কার পালিত হয় না। তাই তাদের অন্তকরন নির্মল হয় না। স্মৃতি শাস্ত্র ও বেদ প্রভৃতি ধর্ম শাস্ত্রের ওপর স্ত্রী জাতির কোন অধিকার নেই। তাই তারা ধর্মজ্ঞ হতে পারে না।এমনকি কোন মন্ত্রের ওপরেও স্ত্রী জাতির অধিকার না থাকায় তারা কোন পাপ করলে মন্ত্রের সাহায‍্যে তা স্খালন করতে পারে না।তাই শাস্ত্রমতে মিথ‍্যা অর্থাৎ অপদার্থ'(৯/১৮)
অর্থাৎ মনুতে নারীকে অপদার্থ, মিথ‍্যাচারী, চিরপরাধীন, পুরুষের বশে থাকার বিধান দিয়ে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কথাই বর্ণিত হয়েছে।
আর এই মনুর দ্বারাই অনুপ্রাণিত হয়েই বিজেপি সরকার প্রধানপতির নামে পুরুষতান্ত্রিক ব‍্যবস্থা কায়েমের জন‍্য সচেষ্ট হয়েছে।

একদিকে একজাতিতত্ত্বের দ্বারা সাড়া দেশে উগ্র ধর্মান্ধতা সৃষ্টির মাধ‍্যমে,অন‍্য ধর্মালম্বীদের মধ‍্যে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করে দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা, সার্বভৌমত্ব,অখন্ডতাকে আঘাত করা হচ্ছে। অন‍্যদিকে, মনু দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে নারী অধিকার খর্বিত করে পুরুষতান্ত্রিক ব‍্যবস্থা কায়েমের ঘৃণ‍্য প্রচেষ্টা চালিয়ে,দেশকে অন্ধকার যুগে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।আর কেন্দ্রের গৈরিক শিক্ষানীতির মতো এই ব‍্যবস্থাতেও এ রাজ‍্যের শাসক নিরবে মান‍্যতা দিচ্ছে। সমস্ত শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের এই ঘৃণ‍্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠা উচিৎ।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।