কলমের খোঁচা

আন্তর্জাতিক নারীদিবসের সার্থকতা,


সূপর্ণা রায়:চিন্তন নিউজ:৭ই মার্চ:–কেন নারীদিবস! জন্ম নেওয়ার পর এতগুলি নারীদিবস কেটে গেল আর চোখের সামনে বদলে গেল নারীদিবস।।

ইউরোপে ১৯১১ সালের ১৯ শে মার্চ পালিত হয় নারীদিবস।।তারও অনেক বছর আগে জার্মানির রাজা নারীদের ভোটদানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই ৮ মার্চ।। সেকথা মনে রাখতেই ১৯১৩ সালের ১৯ শে মার্চের পরিবর্তে ৮ ই মার্চ নারীদিবস ঘোষণা করা হয়।। প্রাক্তন সোভিয়েত দেশগুলোর মধ্যে অনেকেই এই তারিখকে পূর্ণ ছুটির মর্যাদা দেন।।

সারা পৃথিবীতেই মেয়েরা পরিবারের নীরব কর্মী,যে অঙ্কের টাকা দিয়ে লোক রাখতে হয় অন্যথায় পরিবারের জন্য মেয়েরা যে কাজ প্রতিদিন অকাতরে করেন,উদায়স্ত খাটেন ভালোবাসায়, সংসারের প্রতি মমতায়।।অন্যত্র তাদের কাজের জায়গায় আরও এক দূর্ভোগ।। কাজের জায়গায় মেয়েদের প্রতি রয়েছে কটুক্তি,কুকথা, কুপ্রস্তাব ও অপমান।। এমনকি সভ্য দেশে স্বামী বা প্রেমিকের হাতে তাড়িত, অপমানিত ও নির্যাতিত মেয়েদের সংখ্যা কম না।। এখনও আইন দিয়ে পুরো পুরি সুরক্ষা দেওয়া যায় নি ।।।

যেখানে আমাদের আগের প্রজন্মের মায়েরা লড়াই করতেন কেরোসিন বা কাঠকয়লার উনুন থেকে গ্যাসের উনুনের প্রগতির জন্য, সংসারের সমস্ত কাজ করে একটু বাড়ির বাইরে যাওয়ার জন্য , বিয়ের পরে বাকী পড়াশোনা টুকু শেষ করার জন্য আর সেগুলো করতে পারলে তাঁরা ধন্য হয়ে যেতেন অথবা নিজের লেখা কবিতার খাতাটি সযত্নে আগলে রাখা কারণ সেটা ছাপানোর কাজ ছিল ভীষণ ভাবে পুরুষালি ক্ষেত্র।।

সেই তুলনায় বর্তমান প্রজন্ম অনেক বেশি সুযোগ পেয়েছে উচ্চ শিক্ষিত হবার ,চাকরি করার সুযোগ সুবিধা অনেক বেশি।। পরিবার গুলোর পক্ষ থেকে চাকরি করার ক্ষেত্রে বাধা দানের ঘটনাও কমে আসছে ক্রমাগত।। এখন মেয়েরা অফিসের বস্ হচ্ছে, লেখার জগতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করছে,নাচ,গান,শিক্ষকতা, তাছাড়া তারা যোগ্যতা অনুযায়ী ইন্জিনিয়ার, ডাক্তার,প্রশাসক, গবেষক হিসেবে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।। মেয়েরা এখন পাইলট হচ্ছে এমনকি চাঁদ এর মাটিতেও পা রাখছে।। আমাদের প্রজন্মের মেয়েরা জন্ম থেকেই ছেলে সন্তান এর মতো আদর পাচ্ছে,একই মানের শিক্ষার সুযোগ সুবিধা পাচ্ছে।।

কিন্তু ভারতীয় মহিলারা কি এতোই স্বাধীনতা পেয়েছে? তবে কেন হয় কন্যাভ্রূণ হত্যা , কেন জানার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয় আগত সন্তান ছেলে না মেয়ে।। যদি গর্ভের সন্তান মেয়ে হয় তবে অসময়ে তার জন্ম ঘটিয়ে ছুড়ে ফেলে দেওয়া হয় কুকুরের মুখে।।। মাঝে মাঝে হঠাৎ কেন বিস্ফোরণ এর মতো ফেটে পড়ছে নির্ভয়া বা হায়দ্রাবাদের ডাক্তারটির মতো ঘটনা।। পাশাপাশি আমরা অবিরত জানতে পারছি কামদুনি,মালদা, উত্তর বঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, উড়িষ্যার মফস্বল এর একেরপর এক ঘটে যাওয়া মহিলা বা বালিকা অথবা শিশুকন্যা ধর্ষণ এর খবর।। কেউ রেহাই পায়না।। প্রতিটি খবর আমাদের অসাড় করে দিচ্ছে প্রতিবাদ করতেও ভুলে যাচ্ছি।।

আর নয় মোমবাতি মিছিল,১ মিনিটের নীরাবতাও না এবার থেকে চিৎকার,, শুধু ধর্ষক না,দু’ চার জন অত্যাচারী না, সমাজের গভীরে চালানো পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোকে ভাঙতে হবে।। ধর্ষিতা থানায় অভিযোগ দায়ের করতে গেলে যে পুলিশ অভিযোগ নিতে চান না তাঁকে চিহ্নিত করতে হবে কারন তিনি এই কাঠামোর অংশ।।
যে গুরু বলেন মেয়েরা অপবিত্র,শিক্ষিত মেয়েদের বেশি বিয়ে ভাঙে তিনি এই কাঠামোর অংশ।যে কাঠামো মেয়েদের ছোট করে দেখায় মেয়েদের ভাবনা কে,টিভির সিরিয়ালে মেয়েদের হাস্যকর করে দেখায়।।। এসব একদিনে তৈরি হয়নি।।

পুরুষ তন্ত্র একলা পুরুষ গড়েনি।। পুরুষ প্রাধান্যের এই পৃথিবী গড়তে এগিয়ে এসেছেন মায়েরা_ মেয়েরা।। মায়েরা মা হয়েও ছেলেদের একভাবে আর মেয়েদের আরেকভাবে মানুষ করেছেন।। ছেলেদের সাথে বড় মাপের মাছ,বেশি দুধ ভালো খাবার তুলে দিয়েছেন।। শাশুড়ি হয়ে পুত্রবধূকে জ্বালিয়ে মেরেছেন। নিজে স্বামীর হাতে মার খেয়ে ছেলে কে উসকেছেন বৌমাকে মারতে।।।এসব মাথার খাঁজ কোটরে বসে আছে।।তাঁকে নিকেশ করতে বিদ্যাসাগর ,রামমোহন এর প্রয়োজন হয়েছিল আর ছিল শিক্ষিত নবজাগরণ প্রজন্ম।এই কাঠামোর ধ্বংস একদিনের কাজ না।। প্রতিনিয়ত,প্রতিক্ষণে এই কাঠামো ভাঙার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।।। তবেই নারীদিবসের সার্থকতা।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।