কলমের খোঁচা

প্রফুল্লচন্দ্র সেন : দলের উর্ধে দেশ কে জায়গা দেওয়া ব্যক্তিত্ব–গৌতম রায়.


চিন্তন নিউজ:২৫শে সেপ্টেম্বর:- ছয় সি মিডলটন স্ট্রীটে ওঁর বসার ঘরের বড়ো জানলাটার ফাঁক গলে একখন্ড আকাশ দেখা যেতো।সামনের বড়ো নাম না জানা গাছটাতে তখন পাতা ঝরার মরশুম।ঘরে ঢুকতেই দেখি একজন লম্বা ছিপছিপে একজন মানুষ বেড়িয়ে গেলেন। ওঁর মুখোমুখি হওয়া মাত্রই বললেন, চিনিস? মাথা নাড়ালাম,চিনি না।বললেন, সেকি রে? মিহিরকে চিনিস না? মিহির সেন।দৌড় লাগালাম অটোগ্রাফের জন্যে।মিহির সেন তখন গ্রাউন্ড ফ্লোরে নেমে গেছেন।হাসি মুখে অটোগ্রাফ দিলেন।বললেন, সাঁতার জানো?মাথা নাড়লাম,না।বাড়ি  কোথায়? ভাটপাড়া।

সাবাস্ স্টেজ ম্যানেজের জন্যেও কখনো মিথ্যে বলবি না– যেন কথা গুলো বুকের ভিতরে গেঁথে দিলেন তিনি।দেখালেন নিজের বাঁ হাতের কনুইয়ের কাছে র ফুলো অংশটা।বললেন, ছোটবেলায় হকি খেলতে গিয়ে হাত ভেঙে গিয়েছিল।তখন তো আর আজকের মতো হাড়গোড় ভাঙার চিকিৎসা ছিল না। এখনো মাঝে মাঝে ব্যথা হয়।

সে তো গঙ্গার ধারেই। তবু সাঁতার জানো না। লজ্জায় কুঁঁকড়ে গিয়ে ছুটে এলাম তাঁর কাছে। কি রে? মুখ টা এতো চুপসে গেছে কেন? উনি আমায় জিগ্যেস করলেন, সাঁতার জানি কি না। তা কি বললি তুই? জানি না, সেটাই বললাম।

তিনি, যাঁর সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের শুরু পত্রমিতালির ভিতর দিয়ে। জরুরি অবস্থার সময়। চারিদিকে দমবন্ধকর অবস্থা।ইস্কুলে পড়ি, একটি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার পড়লাম প্রফুল্লচন্দ্র সেনের। জরুরি অবস্থার বিরুদ্ধে আগুণখেকো কথা। বাড়িতে বামপন্থী পরিবেশ। অতিবামদের তাড়নায় নিজের মামাতো দাদা অরুণ মৈত্র প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি থাকা স্বত্ত্বেও বাবাকে সপরিবারে নিজের বাড়ি ছেড়ে আশ্রয় নিতে হয়েছে শ্বশুর বাড়িতে। প্রফুল্লচন্দ্র জরুরি অবস্থার কঠোর সমালোচক এবং নানা নির্যাতনভোগী হলেও তাঁর কংগ্রেসী পরিচয়ের জন্যে তাঁকে ঘিরে বাড়িতে একটা কিন্তু কিন্তু ভাব আছেই। তা স্বত্ত্বেও তাঁকে ডাকে একখানা চিঠি দিয়ে বসলাম। কদিন পরেই তাঁর নিজের হাতে লেখা উত্তর এসে হাজির। তখন ও তিনি রাজনীতিতে অত্যন্ত সক্রিয়।বেশির ভাগ সময় থাকেন আরামবাগের মায়াপুরের কল্যাণকেন্দ্রে।

প্রথম চিঠিতেই আশীর্বাদের সঙ্গে গ্রাম দেখার সাদর আমন্ত্রণ। লিখেছেন; দেশ কে যদি জানতে হয়, চিনতে হয়, গ্রামকে চেনো। গ্রামকে না চিনলে দেশকে চেনা যায় না, নিজেকেও চেনা যায় না।লিখলেন; সময় সুযোগ করে, পড়াশুনার ক্ষতি না করে কয়েকটা দিন আমার কাছে এসে কাটিয়ে যেতে পারো।

জেদ ধরলাম বাড়িতে।বাড়ির যুক্তি, ইস্কুল পড়ুয়া ছোট ছেলে। একা একা কি ওঁর কাছে গিয়ে থাকতে পারবি? আমি নাছোড়বান্দা।আমার জেদ দেখে বাবাকে অনুরোধ করলেন দাদু আমাকে ঘুরিয়ে আনবার জন্যে। শেওড়াফুলি থেকে বাসে তারকেশ্বর গিয়ে সেখান থেকে বাস বদল করে গৌরহাটির মোড়। গৌরহাটি থেকে গরুর গাড়ি করে মায়াপুর। আজকের মতো রাস্তা তো দূরের কথা, সাতের দশকের মাঝামাঝি সে পথে বিকেলের পর মুড়ির টিনের বাস গুলোও উধাও হয়ে যেতো।জীবনে প্রথম গরুর গাড়ির অভিজ্ঞতা, খারাপ লাগে নি। সেই ঝিম ঝরা গোধুলিতে গরুর গাড়ির ক্যাচোর কোচর আওয়াজ মন্দ লাগছিল না।এখনো কিন্তু কান পাতলে সেই আওয়াজ শুনতে পাই।

কল্যাণ কেন্দ্র বলতেই এক কথায় সাওয়ারী করে নিয়েছে গাড়োয়ান। চারিদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার হয়ে আসছে। বাবার চোখে মুখে একটু বিরক্তিই। কারণ তিনি কলকাতা বন্দর সংস্থার কর্মী হিসেবে বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত।শ্রমিক নেতা কৃষ্ণপদ ঘোষের ঘনিষ্ট।প্রফুল্লচন্দ্র সেন কে ঘিরে ছয়ের দশকের বিরক্তি তাঁর ভিতরে যথেষ্টই রয়েছে। ছেলের আবদার মেটাতে এই অজ পাড়াগাঁয়ে সেই প্রফুল্লচন্দ্র সেনের কাছেই যেতে হচ্ছে বলে তাঁর মুখের ব্যাজার ভাব যেন আর যাচ্ছে ই না। আমার তখন শিশু অপুর তাঁর বাবা হরিহরের হাত ধরে নীলকুঠির মাঠ দেখতে যাওয়ার মতো দশা। যেন কুঠিয়াল লারমার সাহেবের শিশুপুত্রের সমাধির মতো চোখ ফেরালেই দেখতে পাবো ” সাগর কুটির”, আমাদের জাতীয় আন্দোলন কালে যক্ষাতে আত্মবিসর্জন দেওয়া সাগর হাজরার নামাঙ্কিত ছোট্ট একখানা পর্ণকুটির। প্রফুল্লচন্দ্রের নিজের গ্রাম বড়দোঙ্গলে। যেখানে বসেই তিনি জীবনপণ লড়াই করেছিলেন আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের।

কচোয়ান বললেন; রাইস্তার উপ্ রেই নেইমে যান গ্য। এইর পইর এইত্য খোঁচড় আইছে য্যে চলতি গেইলে হাঁড় মাস আলগ হয়ি যাবে বাবু।

বাবার আবার কিছুটা বিরক্তি ভরা মুখ নিয়ে নেমে পড়া।আমার কাঁধে ছোট একটা কাপড়ের ঝোলা ব্যাগ। রাতে থাকার একটা কি দুটো জামা প্যান্ট।কল্যাণ কেন্দ্রের চারিদিক তখন উন্মুক্ত। পাঁচিলের কোনো বালাই নেই।সামনের বারান্দাতেই একটা মাদুরের উপর কয়েকজনের সঙ্গে বসে তিনি কিছু আলাপ আলোচনা করছেন। একটা টিম টিম করে লাইট জ্বলছে। ভোলটেজ খুব কম। কারো মুখ ই ঠিক মতো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না।

আমি সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। পিছনে বাবা। আমাকে দেখেই সরাসরি আমার নাম ধরে ডেকে বললেন; আয়, আয়।বয়সের চাপল্যেই জিগ্যেস করে বসলুম,আমাকে চিনলে কি করে? একগাল হেসে বললেন, আমার বয়সের আশে পাশে পৌঁছলে তুই ও একবারেই চিনতে পারবি।

কি অনাবিল আনন্দমাখা পরিচয় পর্ব।হয়তো বয়সের চাপল্যে সেদিন অনুভব করতে পারি নি,রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, দোর্দন্ডপ্রতাপ রাজনৈতিক নেতা, আরামবাগের গান্ধী হিশেবে সবার কাছে প্রণম্য মানুষটি যে আমার পত্রবন্ধু, অথচ কি সাগরসদৃশ তাঁর গভীরতা, হিমালয় সদৃশ উচ্চতা আর সন্ন্যাসীর মতো ত্যাগ।তিনি তো আমার ” প্রফুল্লদাদু” , প্রথম চিঠির উত্তরেই নিজে এই নামেই নিজেকে সম্বোধিত করেছেন। এক অজানা, অচেনা ইস্কুল পড়ুয়া কিশোরকে এভাবে আপন করে নেওয়ার দক্ষতা– এ বুঝি বা একমাত্র তাঁদের কালের মানুষদের দ্বারাই সম্ভবপর হতো।

প্রথম ঘোর ভাঙলো ওঁর নির্দেশে কুয়োতলায় গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে আসার কথায়।আজকের মতো ওয়াশরুম সংস্কৃতি তখন দূর অস্ত হলেও আমাদের মফস্বলি বাড়িতে ও বাথরুম, কারো কারো ভাষাতে কলঘর ছিলো।প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এই থাকার জায়গাটাতে সেটুকুনিও নেই।প্রাকৃতিক কৃত্য সারার জন্যে খাটা পায়খানা। আর স্নানাদির জন্যে মুক্তো কুয়োতলা।

মা সরকারি আমলা হলেও বামপন্থী মানসিকতার মানুষ। তবু মন্ত্রী আত্মীয় অরুণ মৈত্রর বদান্যতায় খোদ রাইটার্স বিল্ডিংয়ে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ের বিখ্যাত বাথরুম দেখে এসেছি। যে সিদ্ধার্থশঙ্কর ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের আমলে ক্ষমতার একাধিপত্য ভোগের জন্যে কার্যত প্রফুল্লচন্দ্র সেনের সঙ্গে বিরোধ করেই দাবি জানিয়েছিলেন একজন সমন্বয়কারী দপ্তরবিহীন মন্ত্রীর। আসলে তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য ছিল ডাঃ রায় মন্ত্রীসভার দ্বিতীয় ব্যক্তি প্রফুল্লচন্দ্র সেনের অধিকার খর্ব করা। রাগ দেখিয়ে পদত্যাগ করে বামেদের সাহায্য নিয়ে সিদ্ধার্থশঙ্কর আবার ফিরে এলেন বিধানসভাতে। ডাঃ রায়ের মৃত্যুর পর রাজনীতিতে কোনঠাসা সিদ্ধার্থশঙ্করের বেশিরভাগ সময় কাটে লন্ডনে শ্বশুরবাড়িতে।প্রফুল্লচন্দ্রের মুখ্যমন্ত্রীত্ব কালে কংগ্রেসী রাজনীতির মূলস্রোতে ফেরার ইচ্ছে নিয়ে একজন বিশ্বাসভাজন ব্যক্তির কাছে বার্তা পাঠালেন মুখ্যমন্ত্রীর কাছে।বার্তা শুনেই প্রফুল্লচন্দ্রের চটজলদি জবাব, রাজনীতি করতে গেলে মানুকে কি শ্বশুরবাড়িতে বসে থাকলে চলবে?ওকে চলে আসতে বলো। ভুলে গেলেন এই কিছুদিন আগেই এই সিদ্ধার্থশঙ্কর কি বিষোদগার করেছেন তাঁর প্রতি। সেদিন যদি সিদ্ধার্থশঙ্করকে রাডনৈতিক ভাবে পুনর্বাসিত না করতেন প্রফুল্লচন্দ্র সেন তাহলে হয়তো পরবর্তী সময়ে সিদ্ধার্থশঙ্করের এহেন রাজনৈতিক পুনর্বাসন ই সম্ভবপর হতো না।তবে এই সিদ্ধার্থশঙ্কর ই জরুরি অবস্থার কালে তাঁর এককালের ত্রাতা প্রফুল্লচন্দ্রকে হেনস্তা করবার কম কসরত করেন নি।

যাইহোক,সিদ্ধার্থশঙ্করের   সেই বাথরুমের তখন বাংলা ছাপিয়ে প্রায় দেশ জোড়া আলোচনা। আর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর এ কি অবস্থা?একটু খটকাই লাগলো কুয়োতলা তে গিয়ে। কি পিছল রে বাবা।মনে মনে ভাবলাম, ফিরেই যাই নিজের বাড়ির নিরাপদ, নিচ্ছিদ্র আরামে।পরমুহুর্তে শুনতে পেলাম তীক্ষ্ণ কন্ঠের সতর্কতা; বড্ড পেছল আছে রে।সাবধানে যা।ভাবলাম, না এই মানুষটি তো কেবল দোর্দন্ডপ্রতাপ রাজনীতিকই নন। ইনি তো আমার বাড়িতে আমারই মাতামহের মতোই একজন পরম স্নেহপ্রবণ মানুষ। বাড়িতে তো অমন হুটোপাটি করে কলতলা বা চৌবাচ্চার পাড়ে গেলে , আমার দাদু ও তো ঠিক এভাবেই আমাকে সাবধান করে দেন।কোন অলক্ষ্য সুতোর টানে তাই এই খর্বকায়, তামাটে রঙের প্রায় বৃদ্ধটিকেও বড়ো আপনার জন মনে হলো ঠিক তখনই।

রাতে খেতে বসার আগে সে কি সঙ্কোচ রাজনীতির দোর্দন্ডপ্রতাপ মানুষটির।যিনি রান্না করে দেন , মোক্ষদামাসী, বিকেল থাকতেই তো রেঁধে দিয়ে চলে গেছেন। অপচয়ের বিরুদ্ধে চিরসংগ্রামী প্রফুল্লচন্দ্র মানুষকে না খাইয়ে রাখতে চান বলে এককালে অনেক অপবাদ কুড়িয়েছেন।তা বাইরের মানুষজনেরা যাই বলুক না কেন একেবারে গোনাগুন্তি টাকা নিয়ে তাঁকে তখন দিন গুজরান করতে হয়।বুঝি বা বিধায়ক বা স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে পেনশন তখনও চালু হয় নি।অতি কাছের মানুষজনেরাই চালিয়ে নিয়ে চলেন তাঁদের প্রফুল্লদার সংসার। অনেকটাই নুন আনতে পান্তা ফুরোনোর সংসার।বিত্তবান মানুষদের তো তিনি কোনো কালেই ধারে কাছে ঘেষতে দেন নি।মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন একবার তাঁরই দলের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী গুলজারিলাল নন্দা কলকাতায় এসে বিমানবন্দরে রাজ্য সরকারের দেওয়া গাড়ি না চেপে, চেপে বসলেন বিড়লাদের বাড়ি থেকে পাঠানো গাড়িতে।বিমানবন্দরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে গেছিলেন মন্ত্রী বিজয় সিং নাহার। তিনি মহাকরণে পৌঁছেই সব জানালেন মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্লচন্দ্রকে। মুখ্যমন্ত্রী নির্দেশ দিলেন তাঁর সব মন্ত্রীদের, কেউ যাবেন না কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর সভাতে। দল নয়, দেশ, রাজ্যের মর্যাদা ক্ষুন্ন হওয়ায় এভাবে নিজের দলের নেতা তথা কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উপেক্ষা করবার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আজ পর্যন্ত কোনো রাজনীতিক দেখাতে পারেন নি।

             রাজনৈতিক অর্থে মার্কসীয় ধারাতে বিচার করলে এই বিড়লারা হলেন প্রফুল্লচন্দ্রের রাজনৈতিক গতিপ্রবাহের শ্রেণীমিত্র। তবে প্রফুল্লচন্দ্রের মুখ্যমন্ত্রীত্ব কালে এ রাজ্যে বিড়লাদের স্বার্থ তৎকালীন রাজ্য সরকারের নীতির দরুণ যে ভাবে ক্ষুন্ন হয়েছিল, তেমনটা আর আগে পরে কোনোদিন হয় নি।এমনকি পরবর্তীকালে রেকর্ডকালীন বামপন্থী শাসনকালেও হয় নি।তাই প্রফুল্লচন্দ্রকে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু থেকে উৎখাত করতে এ রাজ্যে তাঁর বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি এবং তাঁর দলে র বিরুদ্ধ গোষ্ঠীর মতোই সবথেকে বেশি সক্রিয় ছিল এই বিড়লা পরিবার।প্রফুল্লচন্দ্রের জীবনের অন্তিম পর্বেই হয়তো এই বিড়লা পরিবার তাঁদের মালিকানাধীন হাসপাতালে প্রফুল্লচন্দ্রের শেষ চিকিৎসার ব্যয়ভারটি মুকুব করে তাঁদের পাপস্খালন করতে চেয়েছিলেন।যদিও প্রফুল্লদা গত প্রাণ অখিলেশ ভট্টাচার্য, আমাদের ছানাবাবুর জন্যে বিড়লা পরিবারের সেই অতীতে ইয়োরোপে পোপের সাম্রাজ্যে” ইন্ডালজেন্স লেটার ” কেনার মতো সেই সুযোগ আর পাওয়া সম্ভব হয় নি।

তা সেই রাত্রে আমরা বাপ ব্যাটা হঠাৎ করে জুটে যাওয়ায় কি খেতে দেবেন আমাদের তাই নিয়েই চিন্তা প্রফুল্লচন্দ্রের।সাদা ট্যলটালে ডাল আর আলু সেদ্ধ, ক্ষিদের মুখে অমৃত লাগলেও আজ ও যেন সেই পরম আদরের খাবারের স্বাদ পাই।সে রাত্রে একমাত্র তক্তপোষ আর একটা পাতলা তোষকের অধিকারী প্রফুল্লচন্দ্রের বিছানাতে জায়গা পেলাম ছোট ছেলে বলে।বাবার ঠাঁই জুটলো সকলের সঙ্গে মেঝের ঢালাও বিছানাতে।

পরের দিন বাবা ফিরে আসবেন। সঙ্গে নিয়ে ফিরবেন আমাকে।বাদ সাধলেন প্রফুল্লচন্দ্র।বললেন, ছেলে গ্রাম দেখতে এসেছে। একদিনেই কি গ্রাম দেখা হয়?রেখে দাও ওকে কিছুদিন আমার কাছে।নিমরাজি হয়ে ফিরে গেলেন বাবা।একা থেকে গেলাম কল্যাণ কেন্দ্রে।বাদ সাধলো পরের দিন সকালে। নিজের জামা কাপড় যে নিজে কাচতে, ধুতে, শুকোতে জানি না!প্রায় প্রত্যেকটি পর্ব প্রফুল্লচন্দ্র নিজে হাতে করে শিখিয়ে দিলেন।চলতে লাগলো গ্রাম দেখা।জরুরি অবস্থার অত্যাচার বোঝার মতো মানসিক অবস্থা তখনো পরিপূর্ণ ভাবে গড়ে ওঠে নি।গেলাম প্রফুল্লচন্দ্রের নিজের গ্রাম বড়দোঙ্গলে।দেখলাম সেখানকার ভটচায পুকুর। অসহযোগ আন্দোলনের আগে যে পুকুর থেকে ব্রাহ্মণরা ছাড়া আর কেউ জল নিতে পারতো না। অসহযোগ আন্দোলনের কালে প্রফুল্লচন্দ্র সেনের নেতৃত্বে আন্দোলনের ফলেই সেই ভটচায পুকুরে আজ জাতি ধর্ম নির্বিশেষে সকলে জল নিতে পারে।

                প্রফুল্লচন্দ্র জরুরি অবস্থার প্রতিবাদে আরামবাগ থেকে লঙ্ মার্চ শুরু করলেন।গন্তব্য কলকাতা। তাঁর পাশে গুটিগুটি হাঁটছি।প্রচন্ড গরম।গৌরহাটির মোড় পর্যন্ত আসা মাত্র পুলিশ মিছিল আটকে দিল।প্রফুল্লচন্দ্রকে একটি ছোট গাড়িতে তুলে সোজা পৌঁছে দিল কলকাতা।তাঁর কনিষ্ঠতম বন্ধু হিশেবে ঠাঁই জুটেছিল সেই গাড়িতে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।