কলমের খোঁচা

ফিচার-‘গড়চন্ডীপুর, না দীপ্তেনের জীবন’– গৌতম রায়


চিন্তন নিউজ: ২৩শে এপ্রিল:- গড়চন্ডিপুরের ধুলোতে বাউকুন্ডা বাতাস এলোমেলো থাবা এখনো বসাতে পারে নি।এখনো এই আধা শহর, আধা গাঁ জনপদটি একদিকে যেমন শহর হতে না পারার দুঃখ নিয়ে থাকে, তেমনি ই গাঁ থেকে যাওয়ার আনন্দটাও কম উপভোগ করে না।এই মধ্যবর্তী ত্রিশঙ্কু দশাটা নিম্নমধ্যবিত্তের মেজাজে আজকাল কেমন যেন একটা মধ্যবিত্ত হয়ে ওঠার চিত্তবাসনাকে বিত্তবাসনার দিকে উসকে দেয়।তবে উসকে দেওয়া টুকু ই সার।উসকে দেওয়া সলতে টাকে তো জ্বলতে দিতে হবে।আর এই সলতে টাকে জ্বলতে দেওয়ার জন্যে চাই তেল।হ্যাঁ ত্যেল।ত্যেল না হলে যে পিদুম নিভে যাবে।সলতে খানা শূন্য পিদুমে জ্বলতে জ্বলতে আপনি ই পড় পড় আওয়াজ তুলে একটা সময় দুম করে নিভে যাবে।তবে সে কালের মানুষেরা বলতো, পোঁড়া সলতের বাস নাকে এলে নাকি আয়ুবৃদ্ধি ঘটে।দীপ্তেনের দাদু একবার এমন ই এক সন্ধ্যে বেলা পোড়া পিদুমের গন্ধ নাকে আসাতে বলেছিল;
বুঝেছি, বাঁচতে হবে অনেককাল।
কথাটা সেই কোন ছোটবেলাতে শুনেছিল দীপ্তেন।ওর দাদু বেঁচেওছিলেন প্রায় আটানব্বই বছর।সেই থেকে ধম্মকম্ম নিয়ে সেভাবে মাথাব্যথা না থাকলেও এই পিদুমের সলতে পোড়ার গন্ধ ঘিরে কেমন যেন একটা প্রেজুডিস ওর মনে তৈরি হয়ে আছে।
সংস্কার মানুষের ভিতর কখন তৈরি হয়? দীপ্তেন ভাবে।এই যে সংযুক্তা প্রথম তাদের বাড়িতে আসার খবর পেয়ে সে যখন দোকান থেকে বাড়ির পথে আসছে একটা বেড়াল পথ কেটেছিল।সংস্কার, বিশেষ করে অন্ধ সংস্কারের চারপাশ দিয়ে না হাঁটা দীপ্তেন বেড়ালের এই রাস্তাকাটা কে পাত্তা দেওয়ার কথা মাথাতেও আনে নি।
সংযুক্তা দীপ্তেনকে বিয়ে করার দুমাসের ভিতরেই স্ট্রং ডাইরিয়াতে মারা যায়।ফুলশয্যার রাতে বৌয়ের স্তনের শক্ত অংশ টা দীপ্তেনের হাতে ঠেকেছিল।নতুন বিয়ের মৌতাতে দীপ্তেন পাত্তা দেয় নি।
বৌ খুনের অভিযোগে বিরামপুর সাব জেলে বসে দীপ্তেন আট নম্বরি সেলের উঁচু জানলাটা দিয়ে একটু খানি বাইরের রাস্তাটা দেখতে পাওয়ার সময় ভাবত, ভ্রাইভারদের ট্যাবু কি মধ্যবিত্তে জীবনে একটু ও ছায়া ফেলতে পারে?
বেল বন্ডে সইয়ের জন্যে যেদিন নীচে র থেকে ডাক পেয়েছিল, সেদিন কোর্টের ডেট আছে , এটা ভেবে একটা আশা নিয়ে বুক বেঁধেছিল দীপ্তেন সকাল থেকেই।অনেক দেরি করে চান করেছিল সেদিন।তারপর প্রতীক্ষা।প্রতীক্ষার সময় ও একটা সময়ে এসে আস্ত একটা দাঁড়ি টেনে বসে কালগ্রন্থিতে।তখন আগের ডেট গুলোর মতোই নামে হতাশা।
আজ ও তেমন হতাশাই নামতে শুরু করেছিল শীতের সন্ধ্যের মতো ঝুপ করে।হঠাৎ নীচ থেকে ওদের বিল্ডিং টাতে ওঠার মুখে বসে থাকা জেলের পুলিশের ভারী গলা ভেসে আসে;
দীপ্তেন মজুমদার।
বেল টিপ দিয়ে ও কেমন যেন বিশ্বাস আসে নি দীপ্তেনের।সেন্ট্রিকে একবার জিজ্ঞেস ই করে বসেছিল;
মুভ টিপ নয় তো?
জেল জীবনে এই বেল টিপ আর মুভ টিপ – এই দুটো শব্দের ভিতরে এক সাথে উচ্ছ্বাস আর হতাশা গা জড়াজড়ি করে পাশাপাশি থাকতে পারে,জেলে না এলে কখনো জানতেই পারতাম না- জেলের বাইরে খোলা হাওয়ায় দাঁড়িয়ে প্রথম উপলব্ধি হয়েছিল দীপ্তেনের।
জেল থেকে বাড়ি ফেরার আগেই তাকে বাড়িতে নিতে আসা মানুষদের কাছে মায়ের নাসিংহোমে ভর্তির কথা শুনেছিল।শুনলেও এই কদিনের জেল জীবনে স্নায়ুর একটা অদ্ভূত সহনশীলতায় একটিবারের জন্যেও চরম কিছু ভাবতে পারে নি দীপ্তেন।মা যে আর নেই, জামাইবাবুর কথা শুনেই সেভাবে হুঁশ ফেরে নি দীপ্তেনের।হুঁশ ফিরেছিল জীবনে যাঁকে শত বিপদেও কখনো কাঁদতে দেখে নি, সেই বাবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠার শব্দে।
জজসাহেব যেদিন বধু হত্যার দায়ে থেকে দীপ্তেন কে বেকসুর খালাস করে দিলেন, সিনেমাতে ছবি বিশ্বাসের মতো হারানো সময় ফিরিয়ে দেওয়ার মতো প্রার্থনা দীপ্তেন মহাকালের কাছে করে নি।কেবল এটাই ভেবেছিল; বেড়াল কাটা রাস্তাটা কে কুছ পরোয়া নেহি — না করলেই বুঝি পারতাম।
জীবনের রূপ রস গন্ধ থেকে একটু ও না টসকে , এইসব বস্তু গুলোকে টইটম্বুর করে ভোগ করতে পারলেই বেড়ালের রাস্তা কাটা টা যে কুসংস্কার হতো না- দীপ্তেন আজ সেটা খুব ভালোভাবেই বোঝে।আসলে সংস্কার আর অপসংস্কারের জাল কখন যে বেড়াজাল হয়ে যায় , সেটা দীপ্তেন কোন ছাড়, কোনো ত্রিকালজ্ঞ ই কি বুঝতে পারে? বুঝতেই যদি পারত, তাহলে নিজের নিজের অকাল কে কালে পরিণত করবার জাদুমন্ত্র ও তারা জিভের ডগাতে আওড়ে যেতে পারত।
সেটা মানুষ পারে না।কারণ, সময়কে জয় করবার কোনো ওসুধ, তাবিজ, কবচ, জলপড়া, তেলপড়া, জালকিঠি, শ্বেতলজ্জাবতীর মূল — এইসব কোনো প্রাকৃত কিংবা অপ্রাকৃত জিনিষপত্তরের দ্বারা সময়কে মানুষ জয় করতে পারে না।
এই যে গড়চন্ডিপুরের বাতাসে যে সময়ের ঘুরপাক লেগেছে, কোনো আবডালে হাওয়া ঘুরতে থাকলে, সেই হাওয়ার মাঝে খড়- কুটো, কাগজের টুকরো পড়লে- সেইসব ও খাওয়ার ঘূর্ণি তে ঘুরতে থাকে।এই ঘোরাকে দেহাতি বাচ্চারা দেখলে ভূত, চুড়েইল মনে করে আর বাড়ির বাইরে থাকে না।দে ছুট একদম মায়ের আঁচলের ভিতরে।আবার কোচবিহার, জলপাইগুড়ির মানুষ দেখলে এই বাওকুন্ডা বাতাস নিয়ে গান গেয়ে ওঠে সুরে বা বেসুরে।
মানুষের এই বিচিত্র স্বভাব , হাজার মখলন্দের ঝলগা তে ঝলমলে জীবনের ছন্দ, সেই ছোট বেলায় দাদুর কাছে শোনা নিভন্ত প্রদীপের সলতে পোড়া গন্ধের মতোই যেন একটা কালের গন্ধ , সময়ের গন্ধ দীপ্তেনের নাকে ঝাপটা মারে।তাই কি দীপ্তেন তাদের এই না সদর, না মফফসলের বাসরাস্তা তে আলো করে থাকা সিটি ভ্যারাইটিতে খোঁজ করেছিল , ল্যাভেন্ডার ডিউ ট্যালকম পাউডার পাওয়া যায় কি না।
দোকানদার অশোকের ছেলে, ছমাস অন্তর যে হালফ্যাশানের সাথে তাল মেলাতে নিজের হেয়ার স্টাইল আর বাইক এক ই সাথে পাল্লা দিয়ে বদলায়, সেই আন্তন , আন্তন চেকভের নামে নাম মিলিয়ে অশোকের কোন এক আত্মীয়, যে নাকি একটা সময়ে রাজনীতিতে বেশ কেষ্ট বিষ্টু ছিল , সে এমন একখানা আনকমন নাম রেখেছিল, সেই আন্তন , কেমন যেন একটা গোল্লা গোল্লা চোখ করে ,আজকের জেনারেশনের ভাষায়, সারপ্রাইজিং লুক দিয়েছিল দীপ্তেনের দিকে।
বিভূতিভূষণের ,’ অচেনার আনন্দ’ ,’ পথের পাঁচালি’ র এই অনুভূতিটা মানুষ নামক প্রাণীর জীবনে সময়- বয়স সব কিছুকে ই একতালে তুড়ি মেরে কেমন যেন একটা লেপটে বসে থাকে।দীপ্তেন ভাবে জেলের ভেতরে তুচ্ছাতিতুচ্ছ কোনো একটা জিনিষ নিয়ে একজন ভালোমানুষ গোছের বন্দি , যাকে দেখলে অপর একজন বন্দি, যে নিজে খুব ভালো করে জানে কোনো অপরাধ করে সে জেলে আসে নি, শণির পাঁচালিতে পড়া সময়কালের মতোই সে সময়ের নিপুন একটা টারগেট, এইরকম দুটো মানুষ ও কেমন শ্রমিক বস্তির সামনে মিউনিসিপ্যালিটির জলের কলের সামনে চলা ঝগড়াতে মেতে ওঠে।
এই অনুভূতির রকমফেরেই কি দীপ্তেন আজ ল্যাভেন্ডার ডিউ ট্যালকম পাউডারের খোঁজে গিয়েছিল? মাঝে মাঝে দীপ্তেনের মনে হচ্ছে এখন , এই লক ডাউনের কাল আর তার জেল জীবনের কাল- ব্যক্তির জীবনের কালসর্প আর রাষ্ট্রের সমষ্টির জীবনের কালসর্প– এইসব ও কি ম্যানডেন অ্যসট্রোলজির বুজরুকির চকমকির তারে আষ্টেপিষ্টে বাঁধা পড়ে আছে।সেই বাঁধন খুলতে গেলেই কি সেইকোন আদ্দিকালের ‘উদয়ের পথে’ সিনেমাতে বিনতা রায়ের গাওয়া,’ তোমার বাঁধন খুলতে লাগে’ গানের সেভেনটি এইট আর পি এমের রেকর্ড টা কলের গানে না বেজে ফিয়েস্তা সেটে বেজে উঠবে?


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।