কলমের খোঁচা

সাম্যতত্বে বঙ্কিমচন্দ্র


কল্পনা গুপ্ত, চিন্তন নিউজ :২৬শে জুন:- ১৮৩৮সালের ২৬শে জুন ২৪ পরগনার কাঁঠালপাড়া গ্রামে বঙ্কিমচন্দ্রের জন্ম হয়। আজ তাঁর ১৮২ তম জন্মদিন ক্ষনে তাঁকে স্মরণ করি তাঁর কাজের মাঝে। সাহিত্য সম্রাটের একটি দর্শনের সাথে আমরা সচরাচর পরিচিত নই অনেকেই। সেটি হলো তাঁর সাম্যতত্ত্ব। এত কম পরিসরে সেই দিকটিকে যথাযথভাবে তুলে ধরার সুযোগ কম। তাই তাঁর রচনার কিছু অংশ উদ্ধৃত করে বিষয়টিকে উল্লেখ করার চেষ্টা করছি।

ঊনবিংশ শতাব্দীতে যেসব বাঙালী পাশ্চাত্য জ্ঞান, বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তিবাদে নিজেদের সমৃদ্ধ করেছিলেন তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম। ভারতীয় পরিবেশে ধর্ম ও বর্ণাশ্রমের মধ্যে থেকেও বঙ্কিমচন্দ্র কিভাবে ও কোনপথে নিজেকে সাম্যবাদী চেতনায় উন্নীত করেছিলেন তা তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে, রচনায় পাওয়া যায়। ভারতবর্ষের সামাজিক পটভূমিতে নারী- পুরুষ ও বিভিন্ন মানুষের আর্থ সামাজিক মূল্যায়নের ভিতর দিয়ে যে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছিলো তা তাঁর বিভিন্ন রচনায় প্রকাশ পেয়েছে। রুশো,মিল, কৎ য়ের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে প্রভাবিত করে। কম্যুনিজম, ইন্টারন্যাশনাল ফুরীরিজম তিনি জানতেন। তিনি তিন মহাপুরুষকে পৃথিবীর সাম্য অবতার বলেছিলেন- বুদ্ধদেব, যিশুখ্রিস্ট, রুশো।

সাম্যতত্ত্ব কি বুঝেছিলেন তা তাঁর কথাতেই বলি, ” মনুষ্যে মনুষ্যে সমান।….সামাজিক বৈষম্য নৈসর্গিক বৈষম্যের ফল, তাহার অতিরিক্ত বৈষম্য ন্যায়বিরুদ্ধ এবং মানুষ জাতির অনিষ্টকর।”
Proletraiat এবং Intelligentzia র ব্যাপারে বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন, ” যখন জনসমাজে ধন সঞ্চয় হইল, তখন কাজে কাজেই সমাজ দ্বি-ভাগে বিভক্ত হইল। এক ভাগ শ্রম করে, এক ভাগ শ্রম করে না। এই দ্বিতীয় ভাগের শ্রম করিবার আবশ্যকতা নাই বলিয়া তাহারা করে না। প্রথম ভাগের উৎপাদিত অতিরিক্ত খাদ্যে তাহাদের ভরণপোষণ হয়। যে চিন্তা করে, শিক্ষা পায় অর্থাৎ যাহার বুদ্ধিমার্জিত হয়, সে অন্যাপেক্ষা যোগ্য ও ক্ষমতাশালী হয়, সুতরাং সমাজমধ্যে ইহাদেরই প্রধানত্ব হয়। যাহারা শ্রমোপজীবী, তাহারা ইহাদিগের বশবর্তী হইয়া শ্রম করে, অত‌এব প্রথমে বৈষম্য উপস্থিত হইল।…..একবার অবনতি আরম্ভ হইলেই সেই অবনতির ফলে আরও অবনতি ঘটে।

শ্রমোপজীবী দিগের যে পরিমাণে দূরবস্থা বৃদ্ধি হইতে লাগিল, সেই পরিমাণে তাহাদিগের সহিত সমাজের অন্যান্য সম্প্রদায়ের তারতম্য অধিকতর হইতে লাগিল। প্রথমে ধনের তারতম্য, তৎপরে তাহা অধিকারের তারতম্য। শ্রমোপজীবীরা হীন হইল বলিয়া তাহাদের উপর বুদ্ধি উপজীবীদের প্রভুত্ব বাড়িতে লাগিল। অধিক প্রভুত্বের ফলে অধিক অত্যাচার। এই প্রভুত্বই শুদ্রপীড়ক স্মৃতিশাস্ত্রের মূল। এই বৈষম্যই অস্বাভাবিক, ইহাই অমঙ্গলের কারণ।”

তিনি বুঝেছিলেন কৃষকের উন্নতি না হ’লে দেশের উন্নতি হবে না। “” দেশের অধিকাংশ লোকই কৃষিজীবী। তোমা হইতে আমা হইতে কোন কার্য হইতে পারে? কিন্তু সকল কৃষিজীবী খেপিলে কে কোথায় থাকিবে? কি না হইবে? যেখানে তাহাদের মঙ্গল নাই, সেখানে দেশের কোন মঙ্গল নাই।

স্ত্রী পুরুষের সাম্যাবস্থা সমাজে প্রয়োজন, সে বিষয়ে তাঁর উক্তি- ” মনুষ্যে মনুষ্যে সমান অধিকার বিশিষ্ট। স্ত্রীগণও মনুষ্যজাতি, অতয়েব স্রীগণও পুরুষের তুল্য অধিকারশালিনী। যে যে কার্যে পুরুষের অধিকার আছে, স্ত্রীগণেরও সেই স্রি কার্যে অধিকার থাকা ন্যায়সংগত। কেন থাকিবে না? ” বঙ্কিম তাঁর রচিত নারী চরিত্রগুলিও সাম্যবাদী আদর্শে রচনা করেছেন। তাই আদর্শমতী ভ্রমর স্বামীকে লিখছেন- যতদিন তুমি ভক্তিযোগ্য ততদিন আমারও ভক্তি, যতদিন তুমি বিশ্বাসী, ততদিন আমারও বিশ্বাস। এখন তোমার উপর ভক্তি নাই, বিশ্বাসও নাই। তোমার দর্শনে আমার সুখ নাই।।

এই বিষয়ে এই কথাটি বলেই শেষ করি যে, বঙ্কিমচন্দ্র যে সাম্যবাদের বীজ বপন করেছিলেন, তা এখন অঙ্কুরিত হয়েছে। আশা করা যায় অদূর ভবিষ্যতে এই সাম্যবৃক্ষ ফুলফলে সজ্জিত হয়ে বাংলা তথা সারা ভারতকে ছায়াদানে পরিতৃপ্ত করবে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।