রাজনৈতিক রাজ্য

অবিষ্মরণীয় কমিউনিস্ট নেতা বিজয় মোদকের জন্মদিনে শ্রদ্ধা জ্ঞাপন।। — রূপচাঁদ পাল


চিন্তন নিউজ:২৭শে জুন:– আজ ২৭ শে জুন।১৯০৬ সালে এই দিনে বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী ও হুগলি জেলা -তথা যুক্ত বাঙলার -কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন‍্যতম পথিকৃৎ কমরেড বিজয় মোদকের জন্ম হয়।তাঁর বাবা বিনয় কৃষ্ণ মোদকও ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী।পেশায় ইঞ্জিনিয়ার। নিবাস হুগলি ইমাম বাজার রোড।
১৯২১ সালে গান্ধীজীর ডাকে সরকারি স্কুল ছেড়ে হুগলির যে সকল ছাত্র অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন তাদের মধ‍্যে ছিলেন বিজয় মোদক ও তার ভাই হৃদয় মোদক (পরবর্তী জীবনে প্রখ‍্যাত চক্ষু চিকিৎসক)। এছাড়া যাঁরা ছিলেন তাদের মধ‍্যে বিশেষ করে হামিদুল হক ও সিরাজুল হকের কথা উল্লেখ করতে হয়।
চৌরিচৌরার হিংসাত্মক ঘটনার পর গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলন প্রত‍্যাহার করলেন।স্কুল -ত‍্যাগী ছাত্রদের জন‍্যে
হুগলি চকবাজারে র কাছে প্রতিষ্ঠা হোল’ হুগলি বিদ‍্যামন্দির’।এখানে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের বহু নেতা এসেছেন।থাকতেনও।’ হুগলি বিদ‍্যামন্দির’ স্বাধীনতা সংগ্রামের অহিংস পন্থী ,জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার অনুগামীদের সহাবস্থানের এক উল্লেখযোগ্য কেন্দ্র।
বিজয় মোদক তদানীন্তন যাদবপুর জাতীয় শিক্ষায়তন (পরে যা বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে ইঞ্জিনিয়াররিং পাশ করেন। কিন্তু যুবক বিজয়ের মনে তখন দেশ স্বাধীন করার স্বপ্ন। ইতিমধ্যে বিপ্লবী ‘যুগান্তর’দলের কর্মী। কমরেড জ‍্যোতি বসু তাঁর স্মৃতিচারনায় লিখেছেন জ‍্যঠাতোতো দাদার জিম্মায় রাখা বিজয় মোদকের রিভলবারের কথা। এর পরে হুগলি ও বর্ধমানের বিভিন্ন যুবগোষ্ঠী মিলে তৈরি হয়’ইন্ডিয়ান প্রলেতারিয়ান রেভেলিউশনারী পার্টি’ (আই পিআরপি)। এই দলে ছিলেন বিজয় মোদক ,কালীচরন ঘোষ, পাঁচুগোপাল ভাদুড়ী ,ফণীন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায় ,নিরাপদ মুখার্জি ,বিনয় চৌধুরী। এর সঙ্গে আরও যুক্ত হন মনোরঞ্জন হাজরা,প্রমথ দত্ত, স্মৃতীষ ব‍্যানার্জী,তুষার চট্টোপাধ্যায় ,কৃপানাথ দত্ত, ভূপালসাধন বসু,হেলারাম চট্টোপাধ্যায় (বর্ধমান),আনন্দ পাল।
       যারা পরে যোগ দেন তাদের মধ্যে ছিলেন -সুশীতল রায়চৌধুরী, দয়াল কুমার, ননীগোপাল মুখার্জি, অপূর্ব মুখার্জি (কোলকাতা),দেবব্রত মুখার্জি(হাওড়া),বীরেন ঘোষ,মহীতোষ নন্দী, হৃষীকেশ চট্টোপাধ্যায়ের, সৈয়দ শাহেদুল্লাহ,জগন্নাথ সেন(বর্ধমান),বিপদ তারণ রায়,সন্তোষ ভড় প্রমুখ।
আইপিআরপি কে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির হুগলি জেলার পূর্বসূরি বলা হয়। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ শ্রমিক -কৃষক আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তোলায় আইপিআরপি খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গ্রেফতার হওয়ার আগে পর্যন্ত বিজয় মোদক আইপিআরপি-র গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে। অন‍্যদিকে হুগলি জেলায় কৃষক আন্দোলন ও সংগঠন গড়ে তোলার কাজেও লিপ্ত থাকেন ত্রিশের দশকের আগে থেকে। কংগ্রেস কর্মী হিসেবে ,কখনও বা অতুল‍্য ঘোষের সহযোগী হয়ে আরামবাগে।কখনও নিজের সঙ্গী সাথী নিয়ে।হুগলি জেলায় কম‍্যুনিস্ট পার্টি গড়ে ওঠে ১৯৩৪ সালে।প্রথম সম্মেলন ঐ বছর চন্দননগরে।প্রথম সম্পাদক কমরেড আনন্দ পাল।পরে সম্পাদক হন কমরেড কালীচরন ঘোষ।
১৯৩৪ সাল থেকে পার্টি বেআইনী। ১৯৩৯-এ অন‍্য অনেক কম‍্যুনিস্ট চিন্তার অনুগামী বন্দীদের সঙ্গে বিজয় মোদকও জেল থেকে মুক্তি পান। ঐবছরই তিনি ভারতের কম‍্যুনিস্ট পার্টির সদস্য পদ লাভ করে। মুক্তি প্রাপ্ত অনেকেই -যারা পূর্বে আইপিআরপি তে ছিলেন তারা সহ- ভারতের কম‍্যুনিস্ট পার্টির সদস‍্যপদ লাভ করলেন।
১৯৩৯ থেকে আমৃত‍্যু , ১৯৯৪ এর ৯ই মে পর্যন্ত বিজয় মোদক ছিলেন পার্টির এক বিশ্বস্ত পরীক্ষিত সৈনিক।এক অসাধারণ সংগঠক। এক অবিসংবাদি নেতা।
বিদেশি ব্রিটিশ শাসক ও স্বাধীন দেশের কংগ্রেস শাসকেরা বারে বারে তাকে কারারুদ্ধ করেছে নানা অছিলায়। সবমিলিয়ে জীবনের প্রায় ১২ বৎসর কেটেছে কারান্তরালে।শোষণ মুক্ত সমাজ গঠনের লক্ষ‍্যে অবিচল থেকে সংগ্রাম করে গেছেন।
তাঁর কিছু কথা ও কাজ সংকটের মধ‍্যেও পথ দেখিয়েছে মানুষ কে। তিনি সোভিয়েত দেশে সমাজতন্ত্রের বিপর্যয়ের পর দৃপ্ত কন্ঠে বললেন “যতোদিন ক্ষুধা থাকবে সমাজতন্ত্রের জন‍্যে মানুষের সংগ্রাম থাকবে”।
১৯৫৬ থেকে ১৯৬১ বিজয় মোদক ভারতের কম‍্যুনিস্ট পার্টি হুগলি জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন।১৯৬৪ তে সংশোধনবাদী বর্জিত নতুন সংগঠিত ভারতের কম‍্যুনিস্ট পার্টি(মার্কসবাদী), হুগলি জেলা কমিটির সম্পাদক নির্বাচিত হন।১৯৬৪ থেকে আমৃত‍্যু ১৯৯৪ এর ৯ই মে তিনি এই দায়িত্ব পালন করেছেন।
হগলি জেলায় কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলায় তাঁর ছিল অবিস্মরণীয় ভূমিকা।হুগলি  জেলায় পার্টি গড়ে তোলায় রেখে গেছেন তাঁর ঐতিহাসিক অবদান ,যা কোনদিন ভোলার নয়।
তিনি পার্টি কর্মীদের বলতেন” প্রশ্নহীন হয়োনা। যতোটা সম্ভব গভীরে গিয়ে জেনে নাও ,”বুঝে নাও”। বলতেন-“প্রশ্নহীন আনুগত্যে ডুবে যেও না”। তিনি বার বার মানুষ কে সেবা,বিপদে তার পাশে দাঁড়ানোর কথা বলতেন।
তিনি লিখছেন,”১৯৪২ থেকে ১৯৪৬ আরামবাগে ছিলাম। একটানা দীর্ঘদিন রিলিফ আন্দোলন সংগঠিত করেছি।….
আর্ত দূর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের মধ‍্যে কাজ করতে গিয়ে মানুষ আমাদের কাছের মানুষ বলে ডেকে নিয়েছে। পরে সেই ভিতের উপর পার্টি গঠনের কাজ সহজ হয়েছে। যার ফসল আরামবাগে বিস্তির্ণ এলাকায় মানুষের উপর আমাদের রাজনৈতিক প্রভাব”।
এই ভাবনায় চালিত হয়ে প্রতিষ্ঠা হয়” হুগলি জেলা নিরক্ষরতা দূরীকরণ কেন্দ্র” যা পরবর্তী কালে সাক্ষরতা আন্দোলনের রূপ নেয়।
১৯৭০-এ অশান্ত দিনগুলিতে পার্টি কর্মী ও সাধারণ মানুষ কে রক্ষা ও সেবার লক্ষ‍্যে তাঁরই উৎসাহে প্রতিষ্ঠিত হয় হুগলি’পিপলস রিলিফ কমিটি’।১৯৭৮ এর বিদ্ধ্বংসী বন‍্যায় কি অন‍্য বিপর্যয়ে সাধারণ মানুষের সেবায় যা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।
‘বাঙালি ইতিহাস বিস্মৃত জাতি’ বলে অপবাদ আছে। বিজয় মোদক এগিয়ে এলেন জীবনের শেষ প্রান্তে ” ইতিহাস অনুশীলন ,ইতিহাস অনুসন্ধানে “যুক্ত মানুষ দের উৎসাহ যোগানোর কাজে।
হুগলি জেলার উন্নয়নে তাঁর ছিল নিজস্ব ভাবনা।হুগলির বলাগড়ে বগা-শ্রীকান্ত এলাকায় গরীব কৃষক পরিবারের সন্তানদের জন‍্যে নিজে মাথায় মাটি বয়ে বিদ‍্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছেন।
আবার উচ্চশিক্ষার জন‍্যে কলেজ প্রতিষ্ঠায় অগ্রনী ভূমিকা নিয়েছেন।কলেজের নামকরনের প্রসঙ্গ উঠতে বয়স্করা -যাদের মধ‍্যে বিরোধী রাজনৈতিক মতের মানুষ ও ছিলেন-দাবী তুললেন-কলেজের নাম হোক সেই মানুষটির
নামেই যিনি একদিন আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় নিজে মাথায় মাটি বয়ে স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিজয় মোদকের আপত্তি টেঁকেনি।
১৯৬৭,১৯৭১,১৯৭৭,১৯৮০ তে মোট চার বার সাংসদ হয়েছেন।প্রায় সতেরো বছর।কিন্তু বিজয় মোদকের উন্নয়ন চিন্তায় ঘুরে ফিরে এসেছে- নিম্নদামোদরের বন‍্যা, বাঁধ এর প্রয়োজনীয়তা র কথা।সংসদে তাঁর অন‍্যতম দাবির মধ‍্যে এসেছে তা বারে বারে।
জমির আন্দোলন আমূল ভূমিসংস্কার কৃষক নিয়ে তাঁর ভাবনার গভীরতা ছিল বিষ্ময়কর।
আর মানুষ হিসেবে এই বিরাট মাপের মানুষ টি ছিলেন অতুলনীয়।তিনি একটা কথা প্রায়ই বলতেন”ভালো মানুষ না হলে কম‍্যুনিস্ট হওয়া যায় না।”
“কি রকম?”– জিগ‍্যেস করলে তিনি বলতেন’ না না”গুডি গুডি ম‍্যান নয়,”গুড ম‍্যান”।
গ্রীক সভ‍্যতায়”গুড ম‍্যানের”একটা বিশেষ ধারণা ছিল।
আবার বাইবেলে “গুড সামারিটান” একটা নৈতিক দায়িত্বশীল মানুষের কথা বলে। বিভিন্ন আধুনিক বিচারে দায়িত্বশীল নাগরিকের ধারনা ও “ভালো মানুষের” ধারনা মিলেমিশে গেছে।
লিও শাও চি (পরিচিত উচ্চারণে) ভালো কম‍্যুনিস্ট হওয়ার লক্ষ‍্য বিষয়ে যা বলতে চেয়েছিলেন; কমরেড মাও সে তুং -এর লং মার্চের সময় কমরেড দের পালনীয় নির্দেশাবলী র মধ‍্যেই বোধহয় লুকিয়ে আছে বিজয় মোদকের” গুড ম‍্যানের ” ধারনা, যে কম‍্যুনিস্ট হতে পারে তার সম্ভাবনা।
আজ এই মার্কসবাদী মননশীল নিবেদিত প্রাণ কম‍্যুনিস্ট নেতা ও পথিকৃৎ এর জন্মদিন।নতুন প্রজন্ম তাঁর জীবন ও চিন্তা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে সামনের লড়াইয়ে এগিয়ে যাক।
আজকের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে বিজয় মোদকের সংগ্রামী কর্ম জীবন, মার্কসবাদী ভাবনা চিন্তা আজকের প্রজন্ম কে অনুপ্রানিত করুক।তাদের আত্মবিশ্বাস দিক ,যাতে দৃপ্ত কন্ঠে বলতে পারে-” আমরা করবো জয় নিশ্চয়”। অসাধারণ এক কমিউনিস্ট নেতা ও সংগঠক বিজয় মোদকের জন্মদিনে আসুন তাঁকে জানাই অন্তরের গভীর শ্রদ্ধা।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।