রাজ্য

সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রামী শ্রমিক কমিটি’র মারণব্যাধী থেকে মুক্তির দাবিতে মিছিল


সন্দীপন ঘোষ : চিন্তন নিউজ:১৮ ই ডিসেম্বর:-বর্তমান সময়ে এত সুসংগঠিত মিছিল দেখে হতবাক এলাকার মানুষ। প্রত্যেক শ্রমিকের মুখে মাস্ক মাঝেমধ্যেই তাদের হাতে স্যানিটাইজার স্প্রে করে দিচ্ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত আরো কিছু শ্রমিক। আশ্চর্যের বিষয় হলো গোটা মিছিলে একটিও রাজনৈতিক পার্টির পতাকা নেই। আছে শুধু শত শত প্ল্যাকার্ড আর কিছু ফেস্টুন। প্রায় প্রতিটি শ্রমিকের হাতেই একটি করে প্ল্যাকার্ড তাতে লেখা “সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রামী শ্রমিক কমিটি” । বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্যাকিং এর জন্য যে বড় বড় কাগজের পেটি ব্যবহার করা হয় সেই পেটি গুলোই কেটে কেটে এই প্ল্যাকার্ডগুলো বানিয়েছেন গ্রামবাসী শ্রমিকরা নিজেরাই ‌।

প্রসঙ্গত গত ১৫ই ডিসেম্বর দুপুর বারোটা নাগাদ, উত্তর ২৪ পরগনা বারাসাত কাছারি ময়দান এর ব্যস্ত জনপদ থমকে গিয়ে দেখল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য । শত শত শ্রমিক মিছিল করে এগিয়ে চলেছেন বারাসাত উত্তর ২৪ পরগনা জেলা শাসকের দপ্তরে। মিছিল যখন এগোচ্ছে দু’পাশে দাঁড়িয়ে থাকা জনসাধারণ মাঝেমধ্যে বিস্মিত হয়ে আপন মনে বলে উঠছেন “মিছিলের শেষ কোথায়?” হ্যাঁ ঠিক তাই। এই মিছিলের শেষ দেখবার জন্য আপনাকে কিছুক্ষণ এক জায়গায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হবে।

কী ছিল দল-মত নির্বিশেষে শ্রমিক শ্রেণীর এই মিছিলের দাবি?

তাদের দাবি ছিল সমস্ত পাথর খাদান পাথর ফ্যাক্টরি যাতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে আইন অনুসরণ করে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো গ্রহণ করে।

সমস্ত সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের দু লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সরকারকে।

সিলিকোসিস এ আক্রান্ত মৃত শ্রমিকদের পরিবারকে চার লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে সরকারকে ।

সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিক পরিবারদের জন্য বিশেষ রেশন ব্যবস্থা করতে হবে।

সিলিকোসিস আক্রান্ত শ্রমিকদের জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্য শিবির এর ব্যবস্থা করতে হবে।

যারা জানেন না তাদের কাছে আবেদন জানুন, সিলিকোসিস হলো একটি পেশাগত মরণব্যাধির নাম। এই ব্যাধির কোনো চিকিৎসা নেই। পাথর ভাঙা কারখানায় কর্মরত শ্রমিকদের মধ্যে সিলিকোসিস বেশি দেখা যায়। পাথরের ধুলিকণা নাক, মুখ এমনকি চোখ দিয়ে ঢুকলে শ্রমিকরা এ রোগে আক্রান্ত হন। রোগের লক্ষণ হিসেবে শ্বাস-প্রশ্বাসের সমস্যা দেখা দেয়। হাত-পা শুকিয়ে যেতে থাকে। শেষ পরিণতি মৃত্যু। ভূমি খনন করে পাথর উত্তোলন, পাথর নেটিং, ডাম্পিং ও ক্র্যাশিংয়ের সময় নাক মুখ দিয়ে ধুলাবালি শরীরে প্রবেশ করে। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছেন পাথর শ্রমিকরা। ফুসফুসের এই দুরারোগ্য রোগে একের পর এক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে চলেছে।

এই মুহূর্তে ভারতে সিলিকোসিস আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় দেড়কোটি। শ্রমিকরা আক্রান্ত এবং মৃত্যু পথযাত্রী হলেও পাথর খাদানগুলো বন্ধ হয়নি। এই মুহূর্তে দু’কোটি বা তার বেশি মানুষ এই সব খাদানে কর্মরত। তারাও আক্রান্ত হবে। আক্রান্ত শ্রমিকের সাথে তার পরিবারও সর্বশান্ত হয়ে যাচ্ছে। তিনকোটি শ্রমিকের যদি গড়ে ৫ জনের পরিবার হয় তাহলে সর্বশান্ত হওয়ার সংখ্যাটা দাঁড়ায় প্রায় পনেরকোটি। শুধু পাথর খাদান নয়, ইঁটভাটা, সিমেন্ট কারখানা, এডবেস্টস এর কাজ, বিভিন্ন খনিজের খাদান, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক সহ বিভিন্ন ধাতুর কাজের শ্রমিকরা এই রোগে আক্রান্ত হতে পারে।

সব থেকে বড় কথা হল সিলিকোসিস জাত ধর্ম বর্ণ পতাকা দল দেখে না। আর ঠিক এই কারণেই প্রায় সাত আট টি গ্রামের হাজারখানেক শ্রমিক ধর্ম-বর্ণ-দল নির্বিশেষে যোগ দিয়েছিলেন গতকাল উত্তর ২৪ পরগনার এই মিছিলে। সিলিকোসিস এবং অন্যান্য পেশাগত রোগ বিরোধী কো-অর্ডিনেশন কমিটির পক্ষ থেকে উপস্থিত ছিলেন শ্রীযুক্ত তাপস গুহ, শ্রীযুক্ত প্রদীপ রায়, ডক্টর সুগত রায় , শ্রী তরুণ ভরদ্বাজ, শ্রী সৌরভ চক্রবর্তী এবং প্রমূখ বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ববর্গ।

শেষ পাওয়া খবর অনুযায়ী উত্তর ২৪ পরগনা জেলাশাসক শ্রমিকদের দাবিকে মান্যতা দেবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে শ্রমিকদের বক্তব্য হল তাদের দাবি যদি মেনে নেওয়া না হয় আগামী সময়ে তারা আরও বৃহত্তর শ্রমিক আন্দোলনের ডাক দেবেন।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।