রাজ্য

সন্দেশখালির অভিজ্ঞতা


বিশেষ প্রতিবেদন: শ্রাবণী চ্যাটার্জি: চিন্তন নিউজ: ১০/০৩/২০২৪:– বেশ কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবাংলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের খবর বারে বারে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছে, হাড় হিম করা সেই খবরের উৎস স্থল সন্দেশখালি। বাংলা তথা সমগ্র দেশে এখন সবচাইতে আলোচিত বিষয় সন্দেশখালি। কি বলছে সন্দেশখালি, কি চাইছে সন্দেশখালি, কি ভাবছে সন্দেশখালি, ইত্যাদি নানাবিধ প্রশ্ন এখন জট পাকাচ্ছে পশ্চিমবাংলার আপামর জনসাধারণের মনে। এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই গত রবিবার ৩রা মার্চ তারিখে, আক্রান্ত আমরা মঞ্চের 6 সদস্যের প্রতিনিধি দল আমরা পৌঁছে গিয়েছিলাম সন্দেশখালি প্রত্যন্ত গ্রামগুলিতে। সেখানে গিয়ে আমরা যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি তা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব। তবুও নিজেদের সেই তিক্ত অভিজ্ঞতা জনসমক্ষে প্রচারের তাগিদেই আজকের এই প্রতিবেদন।

কলকাতা থেকে সকালে রওনা দিয়ে আমরা প্রথমে পৌঁছলাম ধামাখালি ফেরিঘাটে। দলবদ্ধভাবে গেলে পুলিশি বাধার সম্ভাবনা আছে তাই আমরা বিচ্ছিন্নভাবে নদী পার হয়ে ওপারে সন্দেশখালি পৌঁছলাম। সন্দেশখালি খেয়া ঘাটের পাশেই সন্দেশখালি থানা। তাই একপ্রকার পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়েই আমরা বিচ্ছিন্নভাবেই সকলে গ্রামের ভিতর প্রবেশ করলাম। গ্রামের ভিতরে গিয়ে একত্রিত হয়ে আমরা একে একে পৌঁছে গেলাম পাত্র পাড়া, মাঝেরপাড়া, কলোনি পাড়া, নতুন পাড়া প্রভৃতি গ্রামগুলিতে। প্রতিটি গ্রাম ঘুরে নির্যাতিতা মা-বোনেদের সাথে কথা বললাম এবং জানতে পারলাম 2011 সালের পর থেকে কিভাবে গরীব মানুষের জমি জায়গা লুট হয়েছে, কিভাবে দিনের পর দিন তৃণমূল আশ্রিত শাহজাহান শেখ শিবু হাজরা উত্তম সরদার ও তাদের সাকরেদ দের হাতে গ্রামের মা-বোনেদের নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা এর প্রতিবাদ করতে গেলে কোদালের বাটের আঘাতে রক্তাক্ত হতে হয়েছে।

বর্তমানে কর্মসংস্থানের অভাবে সন্দেশখালি থেকে দলে দলে মানুষ পরিযায়ী শ্রমিকে পরিণত হয়েছে,। ভাঙাচোরা মাটির ঘরে তারা বাস করেন। তাদের আবাস যোজনার টাকাও মেলেনি কারোর, গ্রামে নেই পানীয় জলের কোন স্থায়ী সমাধান।

দিনের পর দিন রাত বিরেতে তৃণমূলের পার্টি অফিসে তুলে নিয়ে গিয়ে লুট করা হয়েছে নারীদের সম্ভ্রম।

ইতিহাস বলে মানুষের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত ক্ষোভ বিপ্লবের আকার ধারণ করে। এ ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। দেওয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া সন্দেশখালীর মা-বোনেরা প্রমাণ করে দিয়েছেন আমাদের দেশ, ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ, মাতঙ্গিনী হাজরা ও কল্পনা দত্ত প্রভৃতিদের মতো বীরাঙ্গনার দেশ। শাসকদলের আশ্রিত গুন্ডাবাহিনীর বিরুদ্ধে তারা যেভাবে জেহাদ ঘোষণা করেছেন তা সমগ্র নারী জাতির কাছে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

এতদসত্বেও স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন সহ রাজ্যের মহিলা মুখ্যমন্ত্রী অপরাধীদের আড়াল করার ঘৃণ্য প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিমুহূর্তে। প্রতিবাদিনীদের উপর নেমে আসছে আক্রমণ । তাদের বহিরাগত আখ্যা দেওয়া হচ্ছে। যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী একজন মহিলা সে রাজ্যে মহিলাদের নিরাপত্তা নেই এটা শুধু দুঃখেরই নয়, যথেষ্ট লজ্জারও বিষয়। সেখানে গিয়ে মহিলাদের সাথে কথা বলে ভারাক্রান্ত মনে ফিরে এসেছি। তবুও গর্ব করে বলতে পারি, সন্দেশখালির মা-বোনেদের জান কবুল লড়াই ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

বর্তমানে আমরা স্বাধীনতার পঁচাত্তর তম বর্ষে পদার্পণ করেছি,অথচ সন্দেশ খালির মত পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ জায়গায় চলছে এই ধরনের জঙ্গলের রাজত্ব।কাগজে-কলমে আমরা স্বাধীন হলেও বাস্তবে আদৌ আমরা স্বাধীন হয়েছি কি? এই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে

এদিন আক্রান্ত আমরা মঞ্চের 6 সদস্যের প্রতিনিধি দলে উপস্থিত ছিলেন,মঞ্চের আহ্বায়ক শ্রী অম্বিকেশ মহাপাত্র,শ্রী অরুনাভ গাঙ্গুলী ছাড়াও,প্রমিলা রায় বিশ্বাস, অরুনিমা পাল, মৌসুমী ঘোষ দাস ও শ্রাবণী চ্যাটার্জী।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।