শিক্ষা ও স্বাস্থ্য

করোনা আতঙ্কিত বিশ্ব পরিবেশ দিবস – মল্লিকা গাঙ্গুলী


“দাও ফিরে সেই অরণ্য / লও এ নগর”
বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এ এক অবাস্তব ভাবনা। নগর এবং নাগরিক জীবনশৈলিকে পিছিয়ে অরণ্য জীবন কাম্য নয়, সম্ভবও নয়। আধুনিক বিশ্বায়নে ভূ গোলক এখন দুই গোলার্ধে বিভক্ত বা বিচ্ছিন্ন নয়। সাইবেরিয়া, আন্টার্টিকা, মরু সাহারা কিম্বা পলিমাটির বাংলা, শিক্ষায় দীক্ষায় সভ্যতায় একাকার। নিঃসন্দেহে এক গোলার্ধের ভালো এবং মন্দ উভয় আদান প্রদানই এখন বিশ্বনীতি।

বর্তমান বিশ্বের বিশ্বায়নের ভয়ঙ্কর ফসল করোনা ভাইরাস বা কোভিড ঊনিশ। প্রায় দু বছরে সারা বিশ্ব বিশেষ করে ভারত সহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে বেশ খানিকটা পিছিয়ে গেছে। আরও কতদিন মানব পৃথিবীর আহ্ণিক গতি শ্লথ বা স্তব্ধ থাকবে জানা নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ একটু অক্সিজেনের অভাবে অকালে প্রাণ হারাচ্ছে। পৃথিবীর গভীরতর অসুখ এখন। এই ভয়াবহ বাতাবরন সৃষ্টির পিছনে কি মানুষের কোনো দায় নেই…!

আজ পাঁচ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস। এ বছরের থিম “ইকো সিস্টেম রিসটোরেশন”। প্রকৃতিতে অগনিত জীব, অসংখ্য উদ্ভিদের বাস হলেও এই প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার ভার কেবলমাত্র মানুষের। সমগ্র বিশ্বের চিন্তাশীল পরিবেশবিদগণ এই একটি তারিখকে পরিবেশ রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট করে দিয়েছেন। বিশেষ দিন বলেই পৃথিবীর সব প্রান্তে আজ মঞ্চ সাজিয়ে বক্তৃতা প্রদান এবং আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপন উৎসব ইত্যাদির মধ্য দিয়ে দিনটি পালনীয়। কিন্ত একটু গভীর ভাবে ভাবলে একদিন পরিবেশ দিবস পালন করলেই কি পরিবেশ সুরক্ষিত থাকবে!!

গ্লোবাল ওয়ার্মিং, গ্রীনহাউস গ্যাস ইত্যাদি শব্দগুলি আর অপরিচিত নয়, বিষপূর্ণ এই প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষার জন্য কি করণীয় তাও কম বেশি সকলেই অবগত। বিশ্ব পরিবেশ তথা নিজের পরিবেশকে বাসযোগ্য করে তোলার এই বৃহত্তর ভাবনাকে বাস্তব রূপ দিতে যথেষ্ট উদ্যোগ আয়োজন প্রয়োজন। অথচ
পরিবেশ সংরক্ষণ অপেক্ষা সম্ভোগকে প্রাধান্য দেওয়ার কুফল মানুষ সহ জীবজগতকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। সমগ্র বিশ্বে অসাম্যের রাজনীতি। জীবনে, জীবিকায় সর্বত্র বিভেদ সৃষ্টি ক’রে একশ্রেণীর কতিপয় মানুষ নিজেদের লোভ চরিতার্থ করতে বৃহত্তর মানব সমাজকে শোষণ করে চলেছে, মুনাফার পাহাড় গড়ার রাজনীতি থেকে প্রকৃতিরও রেহাই নাই।

অর্থনৈতিক উন্নতির লক্ষ্যে প্রকৃতি মায়ের বস্ত্রহরণের কারণেই পরিবেশ আজ লাঞ্ছিত অপহৃত। আমাজনের বর্ষাবন পোড়া, অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চল ধ্বংস, সাইবেরিয়ার শ্বেত ভালুকের রাজপথে নেমে আসা থেকে ভারতের পূর্বের আমাজন বলে খ্যাত আসাম তিনসুকিয়ার ডিহং পাটকই অভয়ারণ্যে অবৈধ কয়লা উত্তোলনের মতো প্রকৃতি বিধ্বংসী ঘটনা গুলিই বিশ্ব উষ্ণায়নের মূল কারণ। বিভিন্ন অভয়ারণ্য বিনষ্টের ফলে অসংখ্য প্রজাতির স্তন্যপায়ী, সরীসৃপ, নানা প্রজাতির পাখি, জীবজন্তু আজ বিলুপ্ত প্রায়। প্রকৃতি প্রদত্ত বায়োলজিক্যাল ইকোসিস্টেম মানুষের স্বার্থে বিঘ্নিত। মানুষের লোভ আর দম্ভ থেকেই বিশ্ব পরিবেশ বিপর্যস্ত। করোনা আবহে মানুষ প্রতি মুহূর্তে বুঝেও উদাসীন।

তাই এক দিনের বন সৃজন বা পরিবেশ দিবস পালন নয়, প্রকৃতি পরিবেশ কে প্রাণঘাতি বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে হলে জাতি, ধর্ম, শিক্ষিত, অশিক্ষিত দলমত নির্বিশেষে প্রত্যেককে নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী সমস্ত প্রকার দূষণ রোধ, জল সংরক্ষণ এবং সবুজায়নে সামিল হতেই হবে। পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের মতো কিছু সংস্থা, ছোট বড় বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠন পরিবেশ সংরক্ষণের দাবি তুলছে। তারা নানা ভাবে জন সংযোগ করে জন সচেতনতার প্রসার এবং সাধ্য মত কর্মসূচি গ্রহণ করলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা প্রতুল নয়।

দেশের সরকারের আইন করে নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে আপন আপন দেশের আবহাওয়া ও প্রকৃতি অনুগামী পদক্ষেপ গ্রহণ করা আশু প্রয়োজন। আবার শুধুমাত্র সরকারের প্রতাশায় না থেকে ব্রজিলিয় দম্পতি- সেবাস্তিয় সালগাদো এবং লেলিয়া ডেলুইজ সালগাদো যেমন মাত্র কুড়ি বছরে ব্রাজিলের একটি পরিত্যক্ত মালভূমিকে বৃহৎ বনাঞ্চলে রূপদান করেছেন তেমনি ভাবে সমগ্র বিশ্বের সচেতন মানুষ এগিয়ে আসতে পারলে আগামী বিশ বছরে নিজের নিজের বাসভূমি যোগ্যতমের ঊর্ধতন প্রকৃতি রাজ্য হয়ে উঠবে। মনে রাখতে হবে “একটি গাছ অনেক প্রাণ” – গাছ বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে আর প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে পারলে সমগ্র জীবজগৎ সুষম জীবন লাভ করবে। তাই প্রকৃতি সুরক্ষার সু অভ্যাস গঠন করে আগামী প্রজন্মের কাছে অঙ্গীকার হোক – “শোনো রে মানুষ ভাই,
পৃথিবীকে বাঁচাতে হলে
গাছ লাগানো চাই।”


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।