দেশ

ফাদার ষ্টেন স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে? এই মৃত্যু কি স্বাভাবিক মৃত্যু? ………


সীমা বিশ্বাস, ৮জুলাই, চিন্তণ নিউজ… রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার ফাদার ষ্টেন স্বামী। ভীমা কোরেগাঁও এলগার পরিষদ মামলায় মাওবাদী তকমায় অভিযুক্ত ২০২০ সন থেকে বেআইনী কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে অর্থাৎ ইউ এ পি এ এর অধীনে কারাবন্দী করে রাখা হয় ষ্টেন‌ স্বামীকে। দেশের সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর ভীতির কারণ হিসেবে নরেন্দ্র মোদী সরকার ষ্টেন স্বামীকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিলেন। অন্যদিকে ষ্টেন স্বামীর পরিবার ৮৪ বছরের এই প্রবীণ সমাজকর্মী কে রাষ্ট্র ই হত্যা করেছে বলে ভয়ঙ্কর অভিযোগ উত্থাপন করে। পরিবারের মতে এটা প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা।এই মৃত্যুর ঘটনার জন্য সাধারণ জনতার সঙ্গে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তীব্র প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী সহ এন.সি.পি র মুরুব্বী শারদ পাওয়ার, সিপিআই এমের সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ফাদার ষ্টেন স্বামীর মৃত্যুর জন্য দায়ী কে তার বিচারের জন্য রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নিকট আবেদন জানিয়ে পত্র প্রেরণ করেন। রাষ্ট্র সংঘের মানবাধিকার আয়োগের‌ হাই কমিশনার বিচারাধীন অবস্থায় সমাজকর্মীর মৃত্যুতে দুঃখ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এক বিবৃতিতে হাই কমিশনার লিজ থ্রচে এভাবে বিনা বিচারে মাওবাদী সন্দেহে কারাবন্দী করে রাখা সমাজকর্মীদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার আবেদন জানায়। শুধুমাত্র প্রান্তীক মানুষ এবং আদিবাসীদের অধিকারের জন্য কাজ করা ফাদার ষ্টেন স্বামীকে বিনা বিচারে মৃত্যু পর্যন্ত এভাবে বন্দী করে রাখা টা মানবাধিকার উলংঘন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন, পার্কিংসন অসুখে ভুগছিলেন,কোভিডেও আক্রান্ত হন। এই পরিস্থিতিতে উচ্চ ন্যায়ালয়ে একাধিক আবেদন সত্বেও জামিন প্রদান না করাটা চরম পরিতাপের কথা। আশ্চর্যের বিষয় তদন্তকারী সংস্থা আদালতে উনার বিরুদ্ধে কোনো তথ্য প্রমাণ দাখিল করতে পারেনি।

উল্লেখ্য যে ২০২০ সনের মার্চে উচ্চতম ন্যায়ালয়ে রাজি‌ক পর্যায়ের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটিকে নির্দেশ দিয়েছিল যে বিনাবিচারে কারাগারে বন্দী হয়ে থাকা বন্দীদের কভিডের এই জটিল পরিস্থিতিতে মুক্ত করে দিতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ‌্য যে উচ্চতম ন‌্যয়ালয়ের সেই নির্দেশ কার্যকরী করা হলো না। আসামের শিবসাগর সমষ্টির বিধায়ক, কৃষক মুক্তি সংগ্রাম সমিতির নেতা অখিল গগৈক দীর্ঘ ১৯ মাস বিনা বিচারে জামিন বিহীন মামলায় ইউ . এ.পি.এ আইনের অধীনে আটক করে রাখে কিন্তু নিয়ার বিশেষ আদালত কোনো তথ্য প্রমাণ দাখিল করতে না পারায় অবশেষে অখিল গগৈকে কারামুক্ত ঘোষণা করে। তদ্রুপ আসামের কন্যা জে এন ইউ’র গবেষক ছাত্রী দেবেঙ্গনা কলিতা ,হরিয়ানার মেয়ে নাতাশা নারোয়াল , জামিয়া মিলিয়া র ছাত্র আশ্বিফ ইকবালকে সি.এ.এ আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে যুক্ত থাকার অপরাধে একবছর ইউ এ পি এ র আইনে মাওবাদী তকমায় জামিন বিহীন মামলায় বন্দী করে রাখে। পরবর্তী সময়ে তথ্য প্রমাণের অভাবে নিয়ার বিশেষ আদালত তাদেরকে জামিনে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়।

উল্লেখ্য যে প্রখ্যাত সাংবাদিক বিনোদ ডুবের বিরুদ্ধে এক বছর পূর্বে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা খারিজ করে উচ্চতম ন্যায়ালয় বলেছিল যে সরকারকে সমালোচনা করার জন্য রাষ্ট্রদ্রোহের অপরাধে সাংবাদিক কে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না। প্রত্যেকজন সাংবাদিকের আইনী সুরক্ষা লাভের অধিকার আছে। বিগত বছর রাষ্ট্রীয় লকডাউনের সময় এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে ৫৫জন সাংবাদিক এই সময়ে কোভিড-১৯ সংক্রমণ সংকটের বিষয়ে খবর তৈরি এবং স্বাধীন মত প্রকাশের জন্য গ্ৰেপ্তার, এবং এফ আই আর, আক্রমণ , হুমকির সম্মুখীন হতে হয়। এ কথা সত্যি যে সংবাদ মাধ্যমগুলোর সক্রিয়তা ও গঠনমুলক ভুমিকার উপর গণতন্ত্রের সফলতা বহু পরিমাণে নির্ভর করে। মত প্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম অপরিহার্য অঙ্গ। অতি দুর্ভাগ্যজনক যে বৃটিশ আমল থেকেই এই বেআইনী কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন অর্থাৎ ইউ এ পি এ আইন বলবৎ আছে। স্বাধীনোত্তর ভারতে এই আইনকে সঠিক ভাবে প্রয়োগ না করে সরকার স্বেচ্ছাচারী ভাবে ভিন্নমত পোষণ করা ব্যাক্তিদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদীর তকমা লাগিয়ে বিনা বিচারে আটক করে বৃহত্তম ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক অধিকারকে হত্যা করছে। তার জলন্ত উদাহরণ ষ্টেন স্বামীর বিনাবিচারে কারাবন্দী অবস্থায় মৃত্যু। এই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস আর কতদিন চলবে?


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।