কলমের খোঁচা

বিপ্লবী সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হারিয়ে যাওয়ার দিনে শ্রদ্ধার্ঘ্য।


মিতা দত্ত: চিন্তন নিউজ:৩ রা ডিসেম্বর,২০২০:– এই মানুষটিকে নিয়ে আমার মতো ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মানুযের লিখতে যাওয়া ধৃষ্টতামাত্র। কিন্তু কুঁজোরও তো চিৎ করে শোওয়ার ইচ্ছে হয়।. ইচ্ছে করলে সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় পারতেন অঙ্ক নিয়ে পড়াশোনা করে তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত হয়ে জীবনটাকে কাটিয়ে দিতে। কিন্তু তিনি তো ব্যতিক্রমী। তাই সারাজীবনের সৃষ্টি ও কাজ দিয়ে সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। কর্মসূত্রে তাঁর বাবাকে যেহেতু বিভিন্ন জায়গায় যেতে হতো, তাই সাঁওতাল পরগনায় তাঁর জন্মভিটে হলেও শৈশব,কৈশোর কেটেছে বিভিন্ন জায়গায়। ফলে নাগরিক ও গ্রামীণ মানুষের সান্নিধ্যে আসার সৌভাগ্য হয় ।এই সান্নিধ্যই হয়তো তাঁকে লেখার চরিত্র নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সহযোগী ভূমিকা পালন করেছে। ।

কলেজে পড়াকালীন তাঁর সাহিত্য প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। সে এক মজার গল্প। বন্ধুদের তাঁর গল্প লেখার ইচ্ছে প্রকাশ করায় বন্ধুরা বলে, বিজ্ঞানের ছাত্র গল্প লিখবে ! বন্ধুদের কাছে নিজের গল্পকার হবার যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে বিপ্লব ঘটে যায়। প্রথম গল্প অতসীমামী ,যে গল্পটি সেইসময় বিখ্যাত পত্রিকা বিচিত্রায় প্রকাশিত হয়। পাঠক পায় এক ভিন্নস্বাদেের গল্প যেখানে উঠে আসে যন্ত্র‌ণায় জারিত একটি ভালোবাসার গল্প ।মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় খুব সহজেই পাঠক মহলে মনের অন্দরে স্থায়ী আসন লাভ করে।

তারপর থেকেই মানিকের সৃ‌ষ্টিতে ছড়িয়ে পড়তে থাকে মণি মানিক্য ।সেইসময় সাহিত্যের যুগকে বলা হয় কল্লোল যুগ। রবীন্দ্রনাথ শরৎচন্দ্র থেকে বেরিয়ে ভিন্ন জগতে সাহিত্যের চলা শুরু হয় – যা কল্লোল যুগ নামে খ্যাত। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় কল্লোল যুগের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ।

তিনি তাঁর কাজ দিয়ে প্রমাণ করেছেন সাহিত্যিক শুধু ঘরে বসে সাহিত্য সৃ‌ষ্টি করবে না, সরাসরি সমাজ বদলানোর কাজের সাথে যুক্ত হওয়া তাঁর একান্ত কর্তব্য। সেই কর্তব্যবোধের ডাকে তিনি ১৯৪৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। নিজেকে মার্ক্সবাদী মন্ত্রে দীক্ষিত করেন। তৎকালীন লেখক শিল্পী সংঘের দায়িত্ব সামলেছেন। এক ঝড়ো সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ জনিত রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকট, মন্বন্তর ,দেশভাগ ।সবমিলিয়ে মানুষ ভালো নেই। এই ভালো না থাকা তাঁকে যন্ত্রণাবিদ্ধ করেছে। তাই তাঁর লেখায় উঠে এসেছে মার্ক্সীয় শ্রেণীদ্বন্দ্ব ও যন্ত্র‌ণার কথা।

তাঁর সৃষ্টির তালিকাটি দীর্ঘ। সাহিত্যের সবশাখায় ছিলো তাঁর নিরলস বিচরণ।একদিকে শ্রমজীবী মানুষ ,মধ্যবিত্তের জীবন। সবথেকে যে বিষয়টি ছুঁয়ে যায় মনের অন্তস্থলকে তুলে আনতেন তাঁর লেখায় ।নরনারীর মনস্তাত্বিক রসায়ন নিপুণতার সাথে তুলে ধরতেন ।পুতুলনাচের ইতিকথার শশীর সেই উক্তি, “শুধু শরীর, শরীর, তোমার মন নেই কুসুম? যা পাঠকের মনে শিহরণ তোলে। কুসুমের কথা, ” একটা জ্বলন্ত কাঠকে ফেলে রাখলে তাও ঠান্ডা হয়ে যায় ছোটোবাবু “। পদ্মানদীর মাঝি ,দিবারাত্রির কাব্য, প্রাগৈতিহাসিক ছোটো বকুলপুরের যাত্রী ,আরো কতো। প্রত্যেকটি ভিন্নস্বাদের সৃ‌ষ্টি শুধু সেইসময় নয় বর্তমান পাঠকসমাজকে ভাবায়।

তিনি নেই কিন্তু আছেন। সাহিত্য প্রেমীরা প্রতিদিন তাঁর ভাবনা,কাজ ও সৃ‌ষ্টিতে স্নাত হচ্ছেন । মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর পাঠকরাই বাঁচিয়ে রাখবে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।