কলমের খোঁচা

মিসাইলম্যান এপিজে আবদুল কালাম এর প্রয়াণ দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি


প্রতিবেদনে রত্না দাস: চিন্তন নিউজ:২৭শে জুলাই:– তিনি বলেছেন – প্রতিদিন সকালে এই পাঁচটা লাইন বলো :
১) আমি সেরা
২) আমি সব করতে পারি
৩) সৃষ্টিকর্তা সবসময় আমার সঙ্গে আছেন
৪) আমি জয়ী
৫) আজ দিনটা আমার

ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের বিখ‍্যাত রামেশ্বরম শিব মন্দিরটি কালাম স‍্যারের জন্মস্থানের বাড়ি থেকে মাত্র দশ মিনিট হাঁটা পথের দূরত্বে। সেই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত লক্ষণা শাস্ত্রী ছিলেন ওনার বাবার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ওনার বাবা জয়নুলাবদিন খুব বেশি লেখাপড়া জানতেন না – খুব বেশি ধন-সম্পদও তাঁর ছিল না। মা আশিয়াম্মা ছিলেন এক আদর্শ সহধর্মীনি। বিভিন্ন অসুবিধা সত্ত্বেও তাঁদের ছিল বিপুল সহজাত জ্ঞান। তাঁরা তিন ভাই ও বোন – বাবার কাছ থেকে পেয়েছিলেন সততা ও আত্ম-শৃঙ্খলা। মা’য়ের কাছ থেকে লাভ করেছিলেন ধার্মিকতা ও গভীর দয়ালুতার বিশ্বাস। কালাম স‍্যারের কথায় – “মা ও দাদী রাতের বেলায় আমাদের পরিবারের বাচ্চাদের রামায়ণ কাহিনী এবং রসুলের জীবনের নানা গল্প বলে শোনাতেন।”

শৈশবে কালাম স‍্যারের তিনজন ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল – রামানাথা শাস্ত্রী, অরবিন্দন এবং শিবপ্রকাশন। বন্ধুরা কেউই ধর্মীয় পার্থক্য নিজেদের মধ্যে অনুভব করতেন না। রামেশ্বরম এলিমেন্টারী স্কুলে কালাম স‍্যার তখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র, একদিন এক নতুন শিক্ষক এলেন স্কুলে। কালাম স‍্যার ও বন্ধুরা সব সময় ক্লাসে সামনের সারিতে একসাথে বসতেন। নতুন শিক্ষক প্রথম ক্লাস নিতে এলেন কালাম স‍্যারের শ্রেণিতে। সেদিন এক ঘটনা ঘটে..

কালাম স‍্যারের কথায় –
“আমি মুসলিম, মাথায় টুপি পরতাম, আর রামেশ্বর মন্দিরের প্রধান পুরোহিতের ছেলে রামানাথা পৈতে পরত। কিন্তু এক হিন্দু পুরোহিতের ছেলের সাথে এক মুসলিম বালক বসবে – তা সহ্য করতে পারলেন না নতুন শিক্ষক। তাই তিনি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আমাকে পিছনের বেঞ্চিতে বসতে বললেন। আমি খুব দুঃখ অনুভব করে পেছনের সারিতে চলে গেলাম। বন্ধু রামানাথাও খুব দুঃখ পেল.. আমার পেছনের সারিতে চলে যাবার সময় তার কান্নার দৃশ্য একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে রাখলো আমার মনের ওপর।

এর পরের দিন প্রধান পুরোহিত লক্ষণা শাস্ত্রী ঐ নতুন শিক্ষককে ডেকে পাঠালেন। এবং আমাদের উপস্থিতিতে শিক্ষককে বললেন যে, নির্দোষ শিশুদের অন্তরে সামাজিক অসাম্য এবং সাম্প্রদায়িক বিষ ছড়ান উচিৎ নয়। তিনি শিক্ষককে বললেন- হয় ক্ষমা চাইতে, নয়তো স্কুল ছেড়ে দিতে। নতুন শিক্ষক তাঁর ব্যবহারের জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেন। লক্ষণা শাস্ত্রীর এই সুদৃঢ় মনোভাব পরবর্তীকালে নতুন শিক্ষকের মনটাকেও সংস্কার করে দিয়েছিল। …”

“শিলংয়ে যাচ্ছি আইআইএমের এক অনুষ্ঠানে।” এমনটাই নিজের শেষ টুইটে লিখেছিলেন ভারতের মিসাইলম্যান এপিজে আবদুল কালাম।

রামেশ্বরমের ছোটখাটো মানুষটির আজ জগৎজোড়া খ্যাতি। তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী, লেখক ও সমাজচিন্তক, ছিলেন ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের একাদশ-তম রাষ্ট্রপতি (২০০২ – ২০০৭)। রকেট উন্নয়নের কাজে অবদানের জন্য তাঁকে ‘ভারতের ক্ষেপণাস্ত্র মানব’ বা ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ বলা হয়। ভারতের সর্বোচ্চ অসামরিক সম্মান ‘ভারতরত্ন’ সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্মান ও পুরস্কার পেয়েছেন কালাম স‍্যার।

আবদুল কালাম স্যার শুধুমাত্র ভারতের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাষ্ট্রপতি বা ভারতীয় প্রতিরক্ষার প্রযুক্তিগত কিংবদন্তী নন, তিনি ভারতীয় জনতার কাছে একজন সন্তের নাম – যিনি পুরো জীবনটাই ব্যয় করেছেন দেশের উন্নতির জন্য। আমাদের ভারতীয়দের নতুনভাবে শিখিয়েছেন স্বপ্ন দেখতে, বিশ্বাস করতে। তাঁর অসামান্য জাতীয় চেতনার মাধ্যমে এক সুতোয় গেঁথেছেন বিভিন্ন ধর্ম ও মতে বিভক্ত ভারতীয়দের। স্বাধীনতার পরে দেশের সবচেয়ে নিরপেক্ষ শ্রেষ্ঠ মানুষ – আবুল পাকির জয়নুলাবদিন আবদুল কালাম স্যার কে (১৫ অক্টোবর, ১৯৩১ – ২৭ জুলাই ২০১৫) জানাই প্রয়াণ দিবসে অন্তরের শ্রদ্ধা, প্রণাম ও ভালোবাসা।

“উদার ব্যক্তিরা ধর্মকে ব্যবহার করে বন্ধুত্বের হাত বাড়ায়। কিন্তু সংকীর্ণমনস্করা ধর্মকে যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে” – আবদুল কালাম স্যার।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।