কলমের খোঁচা

বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরার একশো একান্নতম জন্ম দিনে শ্রদ্ধার্ঘ।


মল্লিকা গাঙ্গুলী: চিন্তন নিউজ:১৯শে অক্টোবর:- দু’শো বছরের ইংরেজ কবলিত ভারতবর্ষের স্বাধীনতা ছিনিয়ে নিতে যে শ্রম,যে ঘাম, যে রক্ত, আর যে অগনিত তাজা প্রাণ বিনিময় করতে হয়েছিল আজ তা ধূসর ইতিহাস মাত্র। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা থেকে সমাপ্তি প্রতি ক্ষেত্রেই বৃহত্তর অবিভক্ত বাংলার ভূমিকা সারা দেশ শ্রদ্ধার সাথে স্বীকার করে। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শুধু বাংলার পুরুষরাই নয়, সমস্ত প্রকার সংগ্রামে ওতোপ্রতো ভাবে যুক্ত ছিলেন বাংলার সর্ব শ্রেণীর রমনীরা। এ রকমই একজন স্মরণীয়- বরণীয়- মহিয়ষী নারীর নাম মাতঙ্গিনী হাজরা।

পশ্চিমবঙ্গের অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার তাম্রলিপ্ত বর্তমান তমলুক শহরের অদূরে আলিনান নামে এক প্রত্যন্ত গ্রামে মাতঙ্গিনীর জন্ম হয় ১৮৮০ সালের আজকের দিনে অর্থাৎ ১৯শে অক্টোবর। পিতার নাম ঠাকুর দাস মাইতি মা ভগবতী দেবী। হত দরিদ্র কৃষক পরিবার তাতে সেকালের গ্রাম্য বালিকা মাতঙ্গিনীর প্রথাগত শিক্ষালাভ সম্ভব হয়নি। অত্যন্ত অল্প বয়সে বিবাহ এবং মাত্র আঠারো বছর বয়সে নিঃসন্তান বৈধব্যের শিকার হন। অদম্য প্রাণ শক্তি, ভরপুর উৎসাহ আর উন্নত স্বদেশ চেতনার অধিকারী মাতঙ্গিনী তার সমকালের অস্থির রাজনৈতিক পরিবেশ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে পারেন নি। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি প্রত্যক্ষ ভাবে স্বাধীনতা সংগ্রামে যুক্ত হন। মতাদর্শে তিনি ছিলেন গান্ধীবাদী। তমলুকের গুনমুগ্ধ অনুগামীদের কাছে তাই তিনি ছিলেন তাদের আদরের, শ্রদ্ধার “গান্ধী বুড়ি”। ১৯৩২ এ গান্ধীজীর আইন অমান্য আন্দোলনের অংশ হিসাবে লবণ আইন ভঙ্গ করতে গিয়ে তিনি প্রথম ইংরেজ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হন। এরপর নানা কারনে বারবার তাঁকে কারাবরণ করতে হয়, এমন কি পুলিশের লাঠির আঘাতে আহতও হন। অবশেষে ১৯৪২ সালে “ভারত ছাড়ো” আন্দোলনে মেদিনীপুর অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করলে মাতঙ্গিনীই ছিলেন তমলুক কংগ্রেসের প্রধান নেত্রী।

“ভারত ছাড়ো” আন্দোলনের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মেদিনীপুর জেলা থেকে ব্রিটিশ শাসন উচ্ছেদের পরিকল্পনা নিয়ে নারী পুরুষ নির্বিশেষে প্রায় ছ’হাজার সমর্থক নিয়ে মাতঙ্গিনী তমলুক থানার উদ্দেশ্যে অগ্রসর হলেন। ব্রিটিশ সরকার ১৪৪ ধারা জারি করে মিছিল ভঙ্গ করার চেষ্টা করলেও মাতঙ্গিনী নির্ভয়ে এগিয়ে চলেছেন, দলের পুরোভাগে ৭২ বছরের এক বৃদ্ধা যাঁর বাম হাতে বিজয় শঙ্খ, ডান হাতে জাতীয় পতাকা আর মুখে সরোষে ধ্বনিত “ইংরেজ ভারত ছাড়ো- করেঙ্গে ইয়ে মরেঙ্গে- বন্দেমাতরম-” বাংলার আকাশ বাতাস মুখরিত অনুরণিত করে তোলে। কিন্ত নির্দয় ইংরেজ পুলিশের প্রথম বুলেট লাগল তাঁর পায়ে, দ্বিতীয় গুলি তাঁর বাঁ হাতে আর তৃতীয় বুলেট কপাল বিদ্ধ করলে জাতীয় পতাকা মুঠোয় নিয়েই মাতঙ্গিনী হাজরার প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়লো তমলুকের পবিত্র মাটি শোণিত সিক্ত করে। সেই দিনটি ছিল ১৯৪২ এর ২৯শে সেপ্টেম্বর। এমন এক মানবতাবাদী গান্ধীবাদী মহিয়ষী নারী স্বাধীনতার জন্য জীবন পণ করেও জীবদ্দশায় সেই স্বাধীনতা স্বচক্ষে দেখে যেতে পারেননি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর মেদিনীপুর ও তমলুকের বহু রাস্তা, স্কুল, কলেজ মাতঙ্গিনী হাজরার নামে নামকরণ করে তাকে শ্রদ্ধা জানানো হয়। কলকাতার প্রথম যে নারী মূর্তিটি স্থাপন করা হয় সেটি মাতঙ্গিনী হাজরার প্রস্তর মূর্তি। ২০০২ সালে ভারত ছাড়ো আন্দোলন এবং তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার গঠনের ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ভারতের ডাক বিভাগ মাতঙ্গিনী হাজরার নামে পাঁচ টাকার ডাক টিকিট চালু করে এই মহান স্বাধীনতা সংগ্রামীকে স্মরণ করে। বীরাঙ্গনা মাতঙ্গিনী হাজরার জন্মের দেড়শো বছর পর মনে হয় এমন এক মহিয়ষী মহিলার আত্মত্যাগকে দেশবাসী কতটুকু মনে রেখেছে? এমন লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তে লেখা ভারতের স্বাধীনতার করুণ ইতিহাস আজ কেবল “শিশু পাঠ্য কাহিনীতে মুখ ঢেকে” আছে। উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত স্বাধীনতা আজ অধিকার হিসাবে উপভোগ করা হচ্ছে। একজন মাতঙ্গিনী হাজরার উদ্ধত জাতীয় পতাকার পিছনে অগনিত শহীদের আত্মোৎসর্গের বিনিময়ে প্রাপ্ত এই স্বাধীনতার মূল্যায়ন প্রয়োজন। আজ জন্মদিনের এই শুভ মুহূর্তে শহীদ জননী মাতঙ্গিনীকে শত কোটি প্রণাম।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।