রাজ্য

শাহী সফরেও এক চুল এগোলো না তিন বিঘা করিডোর


জয়ন্ত সাহা-চিন্তন নিউজ: ৭ই মে– মেখলিগঞ্জ (তিনবিঘা করিডোর),৬ই মে, টানা এক ঘন্টা মূল বাংলাদেশের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রইলো বাংলাদেশের “দহগ্রাম-অঙ্গারপোঁতা। নির্ধারিত সময়ের প্রায় দেড় ঘন্টা পরে ফুলকাডাবড়ির চা বাগানের ভেতরের বিএসএফের হেলিপ্যাডে সামরিক বাহিনীর বিশেষ বিমানে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশীথ প্রামানিক, সাংসদ শুভেন্দু অধিকারী ও সাংসদ সুকান্ত মজুমদারকে নিয়ে হেলিকপ্টার থেকে নামেন দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শা।

আন্তর্জাতিক তিনবিঘা করিডোরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী পুরোপুরি সরকারি সফরে এলেও রাজ্য মন্ত্রীসভার কোন প্রতিনিধিই স্বাগত জানাতে উপস্থিত ছিলেন না। বিএসএফের অস্থায়ী হেলিপ্যাডে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে স্বাগত জানান বিএসএফের উত্তরবঙ্গের আধিকারিকরা।
হেলিপ্যাড থেকে বিরাট কনভয়ের সাথে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তিনবিঘায় সড়কপথে পৌঁছেই বিএসএফের কড়া বেষ্টনীর মধ্যে প্রবেশ করেন তিনবিঘার বিএসএফের অস্থায়ী কনফারেন্স রুমে।প্রায় একঘন্টা তিনি বৈঠক করেন।


এদিন সাংবাদিকদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ধারে কাছে যেতে দেওয়া হয় নি। বৈঠক সেরে বেড়িয়ে অমিত শা তিনবিঘা করিডোর ধরে প্রায় ৫০ মিটার হেঁটে একেবারে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে চলে যান।প্রায় মিনিট তিনেক তিনি কাঁটাতারের বেড়ার ওপারের দিকে তাকিয়ে থাকেন।তখন দূর থেকে বাংলাদেশের নাগরিকেরা তাঁকে উদ্দেশ্য করে হাত নাড়াচ্ছিলেন। প্রত্যুত্তরে তিনি অবশ্য হাত নাড়েন নি। অনেকটা দূর থেকেই সাংবাদিকরা তার উদ্দেশ্যে কাঁটাতারের বেড়া যেসব এলাকায় নেই তার কি হবে,কিংবা সীমান্তের নাগরিকদের যন্ত্রনার প্রশ্ন তুললে তিনি নির্বাক ছিলেন।এরপর তিনি সড়ক পথে বিএসএফের জিগাবাড়ি বিওপিতে যান।
এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর ঘিরে বিএসএফ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মত।

রাজ্য পুলিস প্রচুর সিভিক ভলেন্টিয়ার এবং কিছু পুলিস আধিকারিক দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর যাত্রার সড়ক পথে নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছিল।স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী হেলিকপ্টার থেকে নামতেই তাঁকে ঘিরে নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলে বিএসএফ।
মনে করা হচ্ছে, মাসখানেক আগে রাজ্যসভায় দাঁড়িয়ে অমিত শা মন্তব্য করেছিলেন,”বাংলায় গেলে খুন হয়ে যেতে পারি”। তারপরেই অমিত শা র সফর ঘিরে ছিল নজিরবিহীন নিরাপত্তা।
অতীতে রাজনাথ সিং, গুলাম নবী আজাদ কিংবা বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তিনবিঘায় এলে কড়াকড়ির এত বাড়াবাড়ি ছিল না।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বিএসএফের সাথে একঘন্টার বৈঠকে সীমান্তের কৃষকদের যে হাজার হাজার একর জমি রয়েছে সেই জমিতে চাষের জন্য সময় বাড়ানোর দাবি কিংবা সীমান্তের উন্মুক্ত এলাকায় বেড়া দেওয়া নিয়ে আদৌ কোন আলোচনা হল কিনা বুঝতেই পারছেন না কৃষকরা।

তথ্য বলছে,কোচবিহার জেলায় ভারত- বাংলাদেশের সীমান্ত ৫৪৯ কিমি। এর মধ্যে এক চতুর্থাংশে কাঁটাতারের বেড়া নেই।
মেখলিগঞ্জের কুচলিবাড়ি এলাকায় যেখানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছেন সেই এলাকাও নেই কোন কাঁটাতারের বেড়া। তিনবিঘা কড়িডোরের পাশেও দহগ্রাম-অঙ্গারপোতা সীমানা অরক্ষিত।
তথ্য বলছে,জেলার ৫ টি মহকুমার মধ্যে ৪ টিই সীমান্ত লাগোয়া।দিনহাটা মহকুমায় ১৪৭ কিমি সীমান্তের মধ্যে ২৮.০৫ কিমি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নেই। মাথাভাঙ্গা মহকুমায় ৭৪ কিমি সীমান্ত এলাকা।এর মধ্যে ১৪ কিমি উন্মুক্ত।মেখলিগঞ্জ মহকুমার দুটি ব্লকে ৯২ কিমি সীমান্ত এলাকা।এরমধ্যে ১৪ কিমি এলাকায় কোন কাঁটাতারের বেড়া নেই।তুফানগঞ্জে ৮.৫ কিমি এলাকায় নেই কাঁটাতারের বেড়া।
রাজ্যের হিসেব ধরলে দুই বাংলার মধ্যে ২.৩১৬.৭০ কিমি সীমান্ত এলাকা রয়েছে।এরমধ্যে ১৬৩৮ কিমি এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া রয়েছে।বাকি ৫৭৮.৭০ কিমি এলাকা অরক্ষিত। আবার যেসব এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া হয়েছে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন মেনে জিরো পয়েন্ট থেকে ১৫০ গজ দূরে বেড়া দেবার কথা থাকলেও বেড়া বসেছে জিরো পয়েন্ট থেকে ৩০০-৪০০ মিটার দূরে। ফলে সীমান্ত এলাকার হাজার হাজার একর জমি পড়ে আছে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে। ওই জমির কোন ক্রেতা নেই।চাষ করতে যেতে বিএসএফের মর্জির ওপর নির্ভর করতে হয়।
এর আগে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী রাজনাথ সিং তিনবিঘা সফরে এলে সীমান্তের কৃষকেরা ভেবেছিল তিনি হয়তো বেড়ার ওপারে থাকা হাজার হাজার একর জমি অধিগ্রহনের বিষয়ে মন্তব্য করবেন।তখনও রাজনাথ সিং এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য করেন নি।এদিনও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সীমান্তের কৃষকদের এই দাবি নিয়ে কোন মন্তব্য করেন নি।
বিএসএফের চোখরাঙানী, ফরমানে নাজেহাল হচ্ছেন সীমান্তের কৃষকরা।

বাস্তবে বিজেপি সরকারের আমলে সীমান্ত এলাকার কোন সমস্যারই সমাধান হয় নি।
এদিন অমিত শা ফিরে যাবার পর ক্ষোভে ফেটে পড়েন তিনবিঘা আন্দোলনের শহীদ পরিবার।
উল্লেখ্য, ইন্দিরা-মুজিব চুক্তি মেনে বাংলাদেশকে তিনবিঘা করিডোর দেওয়া নিয়ে আরএসএস ও বিজেপি বিরোধিতায় নেমেছিল।সেই সময় আন্দোলন করতে গিয়ে তিনজন শহীদ হন।আজ অমিত শা নিজের দলের সেই শহীদদের শহীদবেদীতে শ্রদ্ধা না জানানোয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সমালোচনা শোনা যায় প্রকাশ্যেই।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।