রাজনৈতিক রাজ্য

অষ্টম বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয় ও কিছু স্বপ্নের অপমৃত্যু


দিলীপ গঙ্গোপাধ্যায়: চিন্তন নিউজ:২১শে জুন:- বহু লড়াই আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মধ্যে দিয়ে ১৯৭৭ সালের ২১ জুন পশ্চিমবঙ্গে কমরেড জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় প্রথম বামফ্রন্ট সরকার। গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরার স্বপ্ন দেখতে থাকা বামনেতৃত্ব সেদিনই ঘোষণা করেছিল আমরা রাইটার্স বিল্ডিং থেকে নয়, সরাসরি শাসনভার তুলে দেবো গ্রামের মানুষের হাতে। গ্রামের মানুষের হাতে সরাসরি স্বশাসন তুলে দিতে বহু প্রতিকুলতাকে অতিক্রম করে আট মাসের মাথায় প্রতিষ্ঠা করলেন পঞ্চায়েতীরাজ ব্যবস্থা,যা আমুল বদলে দিলো গ্রাম বাংলাকে। ক্ষুধা আর অনাহারে ধুঁকতে থাকা গ্রামের মানুষগুলোর দু’ চোখে তখন স্বপ্ন। কী ছিল গ্রামগুলোতে? শুধু অভাব আর অভাব, উদয়াস্ত পরিশ্রম করেও পেটের জ্বালা মেটেনা।সুদখোর আর মহাজনে ভরা মাতব্বরদের হাত থেকে গ্রাম একটু একটু করে পেতে থাকলো মুক্তির স্বাদ। আদি অনন্ত কাল থেকে গ্রাম ছিল অবহেলিত, না ছিল শিক্ষার ব্যবস্থা, না ছিল খাবার, না ছিল পানীয় জলের ব্যবস্থা!ছিল না বিদ্যুতের ব্যবস্থা। কয়েক কিলোমিটার দূর থেকে জল সংগ্রহ করে নিয়ে আসতে হতো মা বোনেদের । অতি দরিদ্র পরিবারের পরিজনেরা একখন্ড কাপড় দিয়ে কোনমতে লজ্জা নিবারণ করতো। আজ যখন দেখি তাদের হাতে ঘড়ি, মোবাইল নিয়ে সেই সব পরিবারের ছেলেরা স্কুল কলেজে যাচ্ছে তখন গর্বে বুকটা ভরে উঠে, এখানেই বামফ্রন্ট সরকারের সাফল্য।

অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করে শিক্ষার আলোটুকু অন্তত ওদের বাড়ি পর্যন্ত পোঁছে দিতে পেরেছিল। এই সাফল্য এমনি এমনি আসেনি, মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন থেকে ভূমি সংস্কার, সেচ ব্যবস্থার উন্নতি থেকে অপারেশন বার্গার আন্দোলন ভূমিহীন ক্ষেতমজুরকে উন্নত করেছে কৃষকে। আজ আর পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে দাঁড়িয়ে আপনি বলতে পারেন না যে “ভূমিতে যাদের পড়েনা চরণ, ভূমির মালিক তারাই তো হন।” বেনামি জমি অধিগ্রহণ করে পাট্টা বিলির ফলে আজ অধিকাংশ জমি কৃষকের হাতে। স্কুল, কলেজ, পানীয় জল থেকে রাস্তা, বৈদ্যুতীকরণের মাধ্যমে গ্রামের চেহারাই পাল্টে গেছে। এই সাফল্যকে খাটো করে দেখা যাবে না। ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থাকে ভেঙে চুরমার করে দিয়ে আজ হাড়ি, বাগদি, কড়া ঘরের ছেলেরা কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিনিয়ে নিয়ে আসছে। তাদের যোগ্যতা আছে, আছে শক্ত দুটো হাত, সেই হাতে কাজ তুলে দেবার লক্ষ‍্যে যখন সপ্তম বামফ্রন্ট সরকার ঘোষণা করলো “কৃষি আমাদের ভিত্তি শিল্প আমাদের ভবিষ্যত।” সেইমতো কাজ যখন এগুচ্ছে তখন শুরু হলো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির চক্রান্ত।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে বামফ্রন্টের এই সাফল্যকে ওরা কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। ভূমি সংস্কারের সাফল্যের উপর ভরকরে যদি ৩৪ বছর ক্ষমতা ধরে রাখতে পারে তাহলে শিল্পের সাফল্য পেলে এই সরকারকে আর ফেলা যাবে না। সমস্ত অপশক্তি সেদিন একহয়ে সামিল হয়েছিল চক্রন্তের জাল বুনেছিল, লালঝান্ডা কাঁধে নিয়ে সেদিনের সেই চক্রান্তে পাশে ছিল এস ইউ সি আই ও মাওবাদীরা। আশি শতাংশ হয়ে যাওয়া একটা কারখানাকে ধ্বংসস্তুপে পরিণত করলো।

২০১১ অষ্টম বামফ্রন্ট সরকারের পরাজয়ের সাথে সাথে এই রাজ্যের হাজার হাজার বেকারের কাজের স্বপ্ন মুছে দিয়েছিল চিরতরে। আসলে সেদিন বামফ্রন্ট হারেনি, হেরেছিল বাংলার আগামীর ভবিষ্যত। ডিনামাইট আর বুলডোজার সেদিন সিঙ্গুরের কারখানাটাকেই শুধু ভাঙেনি, ভেঙেছিল অনেক মানুষের অনেক অনেক স্বপ্ন। টাটার মোটর গাড়ির কারখানা ধ্বংস হয়নি ওটা গুজরাতের সানন্দে সুন্দর ভাবে বিরাজ করছে। যা ধ্বংস হয়েছে তাহলো পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের ভবিষ্যত।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।