কলমের খোঁচা

রাঢ়ের যথার্থ রূপকার গ্রামজীবনের চারণকবি লাভপুরের তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ।


গৌরী সেনগুপ্ত: চিন্তন নিউজ:২৩শে জুলাই:– নাগরিক জৌলুষের বাইরে এক বিশাল অন্ধকার মানবিক ভারত যা ছিল বা এখনও আছে তার সত্যকে উপলব্ধি করবার চালচিত্র রচনা হয়েছিল তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবন আলেখ্যর মধ্যে দিয়ে । এক বিশাল আধা অগ্রসর দেশের বাস্তব ইতিকথা সম্বন্ধে শিক্ষা দিয়েছিলো তারাশঙ্করের জীবনবোধ ।যেসব ঘটনা দুঃখ দিয়েছে , আঘাত করেছে সেইসব ঘটনাকে তিনি তাঁর স্পর্শকাতর অনুভূতিতে গেঁথে দিয়েছেন । তারাশঙ্করের সাহিত্যের বিশেষত্ব ছিল অঞ্চলনিষ্ঠ মানুষের কথা তুলে ধরা যেমন কাহার, বাগদী, মেথর, ডোম বেদে, ঝুমুর এইসমস্ত মানুষের জীবনবেদ বা মানবিক অস্তিত্ব বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্করের আগে এমনভাবে উঠে আসে নি । তাঁর সাহিত্যবোধের মানবমূল্য এখানেই বিশেষত্ব লাভ করেছে । নীচুতলার মানুষের মধ্যে তিনি বহুমাতৃক সত্তা লক্ষ্য করেছেন । শুধু তাঁর অঞ্চলের মানুষজন নয় স্বল্পের পরিচয়েও সাধারণ মানুষের আচরণের মধ্যে তিনি নিত্যমূল্যের সন্ধান পেয়েছেন । তাঁর চারপাশের জানা চরিত্রগুলোর সম্বন্ধে তিনি বলেছেন ,”গ্রাম্য ভদ্রলোকের সমাজে, চাষির গ্রামে,বৈষ্ণবের আখড়ায়—তাদের জানবার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল ।—পাথরের দেবমূর্তি ভেদ করে দেবতার আবির্ভাবের কথা যেমন গল্পে আছে তেমনি ভাবেই এই পাপপূণ্যের রক্তমাংসের দেহধারী মানুষগুলির অন্তর থেকে সাক্ষাৎ- দেবতাকে বেরিয়ে আসতে দেখেছি ।“ এইসব সাধারণ মানুষের জীবনসত্য তারাশঙ্করের সাহিত্যসৃষ্টির উপাদান হয়ে ওঠে । তারাশঙ্করকে কেউ কেউ আঞ্চলিক বিশেষণে চিহ্নিত করেছেন । কিন্তু একথা সত্য আঞ্চলিকতার মধ্যে দিয়ে এইসব মানুষেরা পৃথিবীর নাগরিক হয়ে উঠেছেন ।
রবীন্দ্রনাথের প্রতি তারাশঙ্করের শ্রদ্ধা ছিল অপরিসীম । বিশ্বকবির গ্রামোন্নয়নের কর্মোদ্যমে তিনি মুগ্ধ ছিলেন । তাঁর বিশ্বাস ছিল নিজের সময় ও অর্থ দিয়ে এই পিছিয়ে পড়া মানুষদের উন্নয়নের জন্য কোন লেখক এভাবে এগিয়ে আসেননি ।

বস্তুত উনবিংশ শতাব্দীর পরিসমাপ্তির মুখে অর্থাৎ ১৮৯৮ সালে আজকের দিনে তারাশঙ্করের জন্ম হয় । কলকাতা থেকে প্রায় দুইশত কিলোমিটার দূরে বীরভূম জেলার লাভপুর গ্রামে তিনি জন্ম নেন । ১৯৩৫ সালে গান্ধীজীর ডাকে আইন অমান্য আন্দোলনে অংশ নিয়ে তিনি কারাদণ্ড ভোগ করেন । জেলে বসেই প্রত্যক্ষভাবে রাজনীতি থেকে তিনি সরে যেতে চান । সাহিত্যসৃষ্টিকেই জীবনের লক্ষ্য হিসেবে স্থির করে সাহিত্যসাধনায় আত্মনিয়োগ করেন । কিন্তু তারাশঙ্করের সৃষ্টি অনুধাবন করলে দেখা যায় তিনি সাহিত্যকর্মে রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা থেকে মুক্ত হতে পারননি । ‘গণদেবতা’, ধাত্রীদেবতা “, মন্বন্তর’, উত্তরায়ণ’, কালিন্দী’, ঝড় ও ঝড়াপাতা ‘ এইসব উপন্যাসগুলিতে রাজনীতির বিশেষ ভূমিকা ধরা পড়েছে । সমাজজীবনে রাজনীতিকে অবজ্ঞা করা যায় না একথা তিনি স্বীকার করেছেন । লেখক হিসেবে তারাশঙ্কর ছিলেন বাস্তববাদী, সমাজ পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তিনি অনুভব করতেন । সমাজ থেকে অর্থনৈতিক শোষণের অবসান আশু প্রয়োজন তিনি স্বীকার করতেন । তবে রক্তাক্ত বিপ্লবের পথে নয় । গান্ধীবাদী ভাবধারার সমর্থক ছিলেন তিনি তাই অহিংসার পথকেই তিনি সমর্থন করতেন । তিনি মার্কসবাদী অর্থনৈতিক চিন্তা ও সমাজ বিপ্লবের চিন্তার সমর্থক ছিলেন তবে তার সাথে ভারতীয় অধ্যাত্মবাদকে মেনে নিয়েছিলেন । ভাবনাটা ছিল তাঁর একান্ত নিজস্ব যা হয়তো ইতিহাসসম্মত নয় । তবে তাঁর দেশের প্রতি ভালোবাসা ,দায়বদ্ধতা ,সমাজকল্যাণবোধ , মানবহিতৈষনা ছিল নির্ভেজাল । এই ভাবনাই পুষ্ট হয়েছিল তাঁর সাহিত্যকর্মে যার জন্য তিনি বাংলাভাষার সার্থক কথাশিল্পীদের মধ্যে অন্যতম, ভারতবর্ষের একজন মহৎ বরণীয় জীবনশিল্পী ।

ধূলিধূসর গ্রাম্য বাগদী, বাউড়ি মানুষগুলিকে নিয়ে ছিল তাঁর অকুণ্ঠ আবেগ । তাঁর আত্মজ সরিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাষায় , “ “ লাভপুর স্টেশনে নেমে সেই কৃষ্ণচূড়া গাছ,বেনেমামার চায়ের দোকান, লাভপুরের লাল মাটি,জীর্ণ ধাত্রীদেবতা বাসগৃহ, তাঁর সাহিত্যের মানুষগুলি দেখে, কলকাতা নাগরিক বেশ ত্যাগ করে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচতেন । তাই বলছি আমার পিতার ঠিকানা ছিল—তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, সাকিম-লাভপুর, জেলা-বীরভূম। স্বয়ং তারাশঙ্কর বলেছেন,” আমি বিশ্বাস করি মাটিতে আর মানুষে । তাই আমি সারাটা জীবন মাটির কথা বলবার চেষ্টা করেছি আর মানুষের কথা বলবার চেষ্টা করেছি । এ মানুষরা রাজা-মহারাজা বা নবাব-বাদশা নয় এরা অত্যন্ত সাধারণ মানুষ—হয়ত বা মাটির মানুষ ।আমার, তোদের আশেপাশের মানুষ । এরা তোর খুশিতে খুশি হবে, তোর দুঃখে দুঃখ পাবে । হয়ত নীরবে দু ফোঁটা চোখের জলও ফেলবে ।“

তারাশঙ্করের জন্ম যদিও লাভপুরে তবু তিনি জীবনের অনেকখানি সময় অতিক্রম করেছেন শহর কলকাতায় তথাপি তিনি শহুরে মানুষ হতে চাননি । গ্রাম বাংলার উদারতা, আন্তরিকতা, ইতিবাচক জীবনবোধ তাঁর জীবনকে প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছিল । রাঢ় বাংলার সার্থক লেখক । তাঁর সাহিত্যের গায়ে ফুটিয়ে তুলেছেন রাঢ় অঞ্চলের মানুষদের ইতিকথা । রাঢ়ভূমির মানুষের আশা আকাঙ্খা হতাশা বা ব্যর্থতা , জৈব কামনাবাসনা এসবেরই আত্মপ্রত্যয়ী উপস্থাপন করেছেন তিনি তাঁর সাহিত্যে । তাই তারাশঙ্করের সাহিত্য পড়লেই বীরভুমকে চেনা যাবে । রাঢ়ের যথার্থ রূপকার গ্রামজীবনের চারণকবি হলেন লাভপুরের তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় । তাই রাঢ়ের লোকসাহিত্যের রসে পুষ্ট রাঢ়ের বাস্তব ভুগোলের পটভূমি , রাঢ়ের রূপকথার রঙ প্রতিভাত হয়েছে তারাশঙ্করের সাহিত্যপীঠে । আজও রাঢ়ের রুক্ষ মাটিতে পা ফেলে হেঁটে চলেছে ভৈরবী , রাধা, বসন, স্বর্ণ,পদ্মরা । তাই রাঢ় অঞ্চলে দাঁড়িয়েও তিনি সর্বকালের গণদেবতা’র প্রতিনিধি হতে পেরেছেন, প্রতিষ্ঠা দিতে পেরেছেন তাঁর ‘ গণদেবতা’কে মহান মর্যাদায় । জীবন সত্যের পূজারী তারাশঙ্কর তাঁর সহজ সত্যকে এভাবেই চিরকালীন রূপ দিয়েছেন ।

বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ ও শরৎচন্দ্রের উত্তরসাধক কথা সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বহু পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কলক্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের শরৎ স্মৃতি পুরস্কার ও জগত্তারিণী পুরস্কার । ‘ আরোগ্য নিকেতন’ এর জন্য রবীন্দ্র পুরস্কার এবং সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার । জ্ঞানপীঠ পুরস্কার ( ১৯৬৭ ), পদ্মশ্রী ( ১৯৬২ ), ও পদ্মভূষণ (১৯৬৮ ) উপাধি লাভ করেছেন । ১৯৭১ সালের ১৮ই সেপ্টেম্বর এই মহান কথা সাহিত্যিকের মৃত্যু হয় ।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।