কলমের খোঁচা

ডুয়ার্স নিয়ে কিছু কথা – দ্বিতীয় পর্ব


শ্যামল চ্যাটার্জি:চিন্তন নিউজ:১৫ই মার্চ:–আজ ডুয়ার্স নিয়ে দ্বিতীয় পর্বের শুরুতেই বলি আমরা অনেকেই ভাবি ডুয়ার্স মানেই বনাঞ্চল। কিন্তু আসলে তা নয়। ডুয়ার্সের আনুমানিক আয়তন প্রায় ৪৭৫০ বর্গ কিলোমিটার। তার এক-চতুর্থাংশ ১২০০ কিলোমিটার বনাঞ্চল। ওদলাবাড়ি থেকে কুমারগ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত তিস্তা থেকে সংকোশ পর্যন্ত জলপাইগুড়ি জেলার মাত্র ১১টি ব্লকে ১৩৮টি ভাষা ও উপভাষার মানুষের বাসভূমি ডুয়ার্স। এখানকার স্থানীয় জনজাতি বলতে ম্যাঙ্গোলয়েড জনজাতি। শেরপা, ডুকলা, টোটো, মেচ (বোড়ো), রাভা, লেপচা, গারো প্রভৃতি। দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলে বসবাস করতো টোটো, ডুকপাসহ আরো কিছু জনগোষ্ঠী। আর সমতলে বসবাস করতো মেচ, রাভা, গারো, জলদা প্রভৃতি জনগোষ্ঠী। এরা মাঝে মধ্যেই তাদের বাসস্থান পরিবর্তন করতো। এদের জীবিকা ছিল সম্পূর্নভাবে প্রকৃতি নির্ভর। মাছধরা, বনজদ্রব্য আরোহন, শিকার আর ঝুম পদ্ধতিতে চাষ ছিল এদের জীবিকা। এদের সকলের আলদা আলদা ভাষা ছিল।

পরবর্তীকালে এই অঞ্চলে ব্রিটিশরা এখানে চা চাষের কাজ শুরু করে। আর এই চা বাগান পত্তনের সময় ছোটনাগপুর অঞ্চল থেকে শ্রমিক হিসেবে আসে ওরাও, মুন্ডা, সাঁওতাল, খাড়িয়া, ভূমিজ, নাগেশিয়া, মালপাহাড়িয়া আরো কিছু জনগোষ্ঠী। আর নেপাল থেকে শেরপা, লিম্বু, রাই জনগোষ্ঠী। আর একটা বিখ্যাত গান আমাদের অনেকেরই জানা আছে এই চা বাগান নিয়ে, ‘চল মিনি আসাম যাবো’। এই গানের মধ্যেই আছে যে সেই সময় এই চা শ্রমিকদের অবস্থা কেমন ছিল? তার ব্যাখা এখানে নিষ্প্রয়োজন। খ্রিষ্টপূর্ব ২৭৩৭ বছর আগে চীনে প্রথম চা-এর ব্যবহার বা উৎপন্ন শুরু হয়। আর ডুয়ার্সের গজলডোবাতে প্রথম চা চাষ শুরু হয় ১৮৭৪ সালে। ডুয়ার্স জুড়ে আছে প্রায় ১৫০টি চা-বাগান। বর্তমানে অনেক চা-বাগান বন্ধ বা ধুঁকছে। তাই মাঝে ডুয়ার্সকে কেন্দ্র করে চা-বাগান পর্যটন গড়ে ওঠার যে সম্ভবনা হয়েছিল তা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। চা-বাগানের কথা যখন এলই। তখন চা নিয়ে দু-চার কথা বলতেই হচ্ছে। সাধারণত ৭ থেকে ৮ দিন অন্তর চা পাতা তোলা হয়। বিজ্ঞাপনের ছবি দেখে আমরা জানি দুটি পাতা একটি কুঁড়ি হিসেবে পাতা তোলা হয়। তিনটেও তোলা হয়। উৎকৃষ্ট চা তৈরি হয় দুটি পাতা ও একটি কুঁড়ি থেকে। এবার জেনে নি চায়ে কি কি থাকে? ক্যাফিন কুঁড়িতে থাকে ৪.৭ শতাংশ। প্রথম পাতায় থাকে ৪.২ শতাংশ, দ্বিতীয় পাতায় থাকে ৩.৫ শতাংশ তৃতীয় পাতায় থাকে ২.৯ শতাংশ। আর কান্ডের উপরের অংশে থাকে ২.৫ শতাংশ। তিন রকমভাবে পাতা তোলা হয়।

এক) কোর্স প্লাকিং (Course Plucking) – এই পদ্ধতিতে নির্দিষ্ট পাতা তোলার যে নিয়ম তার পরিবর্তে বেশি পাতা তোলা হয়। এতে চায়ের পরিমান বাড়ে কিন্তু উন্নতমানের চা হয় না।
দুই) হার্ড প্লাকিং (Hard Plucking) – এই পদ্ধতিতে গাছে কোন কচি পাতা না রেখে সমস্ত পাতা তুলে নেওয়া হয়। এতে গাছ প্রবলভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিন) ক্লোজ প্লাকিং (Close Plucking) – এই পদ্ধতিতে চা গাছে নতুন পাতা হওয়া মাত্র তুলে নেওয়া হয়। এতে চায়ের পরিমান কম হলেও উৎকৃষ্ট মানে চা হয়।
একটি চা গাছ তার ১৫ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ভালো ও সবচেয়ে বেশি পরিমান পাতা উৎপন্ন করে। যদিও একটি চা গাছ ৫০ বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। ডুয়ার্স চলার পথে দুধারে প্রচুর চা-বাগান আমরা দেখি, দেখি চা পাতা তুলছে বহু নারী পুরুষেরা। গাড়ি থামিয়ে ছবিও তুলি। পারলে একবার কোনো চা ফ্যাক্টরিতে গিয়ে চা তৈরির পদ্ধতিটা দেখে আসবেন। অনেকে হয়তো দেখতে যান। চলবে—–


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।