রাজ্য

বজ্র আঁটুনি এবং ফস্কা গেরো .. হাওড়া হসপিটাল রাজ্যের স্বাস্থ্য দপ্তরের বাস্তব চিত্র


সৌম্যদ্যুতি ভৌমিক : চিন্তন নিউজ:৩১শে মার্চ:- বৈদ্যুতিন মাধ্যমের পর্দা জুড়ে বেশ ঘটা করেই বিজ্ঞাপিত প্রচার চালাচ্ছে রাজ্যসরকার । অনেকটা অনিল কাপুর অভিনীত ‘নায়ক’ চলচ্চিত্রের দৃশ্যের যেন বাস্তব প্রয়োগ । দূর থেকে দেখলে মনে হবে ‘সত্যিই কিরকম তৎপরতার সঙ্গে নভেল করোনা ভাইরাস এবং কোভিড-১৯ রোগের মোকাবিলায় ব্যস্ত আমাদের মমতাময়ী রাজ্যপ্রধান । গোটা দেশ কেন, গোটা বিশ্বে এই রকম পারদর্শিতার উদাহরণ পাওয়া কেবল ‘মুশকিল হি নেহি না মুমকিন হ্যাঁয়’ । কিন্তু চলচ্চিত্র এবং বাস্তবের চিত্রের মধ্যে যে কতটা ফারাক তা হাওড়া সদর হাসপাতালের ঘটনা চোখে আঙুল দিয়ে আমাদের সামনে উপস্থাপিত হলো ।
বিগত ২৯ তারিখে বিকেল ৫টা ১৮ মিনিটে ভর্তি হওয়া পেশেন্ট, রাত ৯টা ৩০ পর্যন্ত অন্যান্য আরও ৩০টি রুগীদের সঙ্গে জেনারেল বেডে সম্পূর্ণ অসুরক্ষিত অবস্থায় থাকলেন । নার্স এবং সিস্টারদের পক্ষ থেকে বারংবার অনুরোধ করা সত্ত্বেও হাসপাতাল কতৃপক্ষ কোনো সতর্কীকরণ ব্যবস্থাই নেননি । উল্টে তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ‘প্যানিক’ না করার । ইতিমধ্যে সেই রুগীর চেস্ট এক্সরে হয়ে গিয়েছে । লক্ষণ পরিষ্কার বুঝতে পেরে পুনরায় কতৃপক্ষকে জানালেও গ্লাভস পড়া ছাড়া অন্য কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি । তারপর সি.সি.ইউ তেও অন্যান্য রুগীর মধ্যে থেকে হাওড়ায় প্রথম করোনা আক্রান্ত রুগী বেবি পালের মৃত্যু ঘটে । আর তার সাথে সাথে গোটা হাসপাতাল সহ সমস্ত সেবিকা ও ডাক্তারদের করোনা আক্রমণের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়ে যান । কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই ঘটনা কি কেবল কতৃপক্ষ এবং সুপারের কর্তব্যে গাফিলতি, চরম উদাসীনতা এবং উপেক্ষার উজ্জ্বল নিদর্শন ? নাকি গোটা স্বাস্থ্য দপ্তরের নগ্ন বাস্তব চিত্র ?

আসলে প্রচার আর প্রয়োগের মধ্যে যে আলোকবর্য দূরত্ব তৈরী হয়েছে তা কেবল কথার মায়া দিয়ে ঢেকে রাখা সম্ভব নয় । হাওড়া সদর হাসপাতাল কেবল কোনো ব্যতিক্রম নয় । গোটা রাজ্যের স্বাস্থ্যব্যবস্থাই আজ প্রচন্ড অব্যবস্থার শিকার । ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে আমরা দেখেছি রোগ লুকিয়ে পরিসংখ্যার সততার সঙ্গে লুকোচুরি খেলার এক চরম ঘৃণ্য প্রতিযোগীতায় নেমেছিলো রাজ্যসরকার । এক্ষেত্রেও কি সেই একই পথের দিশা দেখাচ্ছে ? পরীক্ষায় ফাঁকা খাতা জমা দিলে বানান ভুলের কোনো সম্ভবনা থাকে না সুতরাং টেস্ট না করলে করোনা ভাইরাসের কোনো অস্তিত্বই থাকে না । বরং টিভির পর্দার জুড়ে নিজের হারানো জমির পুনরুদ্ধার করার রাজনৈতিক খেলাটার একটা মহামানবীয় রুপ দেওয়ার প্রচেষ্টাই ফুটে ওঠে । আসলে ক্ষমতা দখলের এই ঘৃণ্য রাজনৈতিক মেরুকরণ মানুষকে বড় সস্তা করে ফেলেছে ।
গোড়ায় যখন গন্ডগোল তখন শুধু বজ্র আঁটুনি দিয়ে কি সত্যই এক মহামারীর মোকাবিলা সম্ভব । বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘হু’ দ্বারা মহামারী ঘোষণার পরও প্রায় ১০ দিন কেন্দ্র বা রাজ্য সরকার দেশের কথা ভাবলেন না । গোটা দেশ জুড়ে গোমুত্র নিয়ে ন্যক্কারজনক প্রচার চললো অথচ কেন্দ্র মধ্যপ্রদেশের ক্ষমতা দখলের খেলায় মেতে রইলেন আর রাজ্য সরকার তার ভোটব্যাঙ্ক বাঁচানোর প্রচেষ্টায় কোন প্রস্তুতি নিলেন না । তারপর জনগণকে অপ্রস্তুত অবস্থায় রেখে লক ডাউন ঘোষণা করলেন অথচ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামোর উন্নতির কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়ার ভাবনা মাথায় এলো না । মানুষ গৃহ বন্দী থাকবেন কিন্তু কি খেয়ে থাকবেন কিভাবে থাকবেন তার কোন উল্লেখ নেই । ‘সুপার স্পেশালিটি যুক্ত ৩৪টি হাসপাতালের গুলোর কথা ছেড়ে দিলাম নুন্যতম সেপারেশন, টেস্টকিট কিংবা পোশাকের ব্যবস্থা তো আগে করা উচিত ছিলো । সংবাদ মাধ্যম আর ফটোগ্রাফার নিয়ে রাস্তায় এক্কা দোক্কার ছক কেটে নভেল করোনা ভাইরসের মোকাবিলা করা সম্ভব নয় । এখনও সময় আছে কিন্তু সরকার যদি সঠিক পরিকল্পনা না নিতে পারে তবে পশ্চিমবঙ্গ সহ গোটা দেশের অবস্থা ইটালি বা স্পেনের চেয়েও ভয়ঙ্কর হয়ে উঠবে । কারণ, শহরতলির প্রায় সমস্ত হাসপাতালের অবস্থা হাওড়া সদর হাসপাতালের সমান আর এত বছরের কাটমানি খাওয়ার অভ্যাস সঠিক কাজের অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায় । সকলে সাবধানে থাকুন, সুস্থ থাকন এবং সতর্ক থাকুন । তবেই এই ভয়ঙ্গকর মহামারির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা সম্ভব হবে ।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।