কলমের খোঁচা

রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ও তাঁর চিন্তাধারা


মিতা দত্ত: চিন্তন নিউজ:২২শে আগস্ট:-
“যাহা ঘটে তাহাই যখন প্রাকৃত,

তখন অতিপ্রাকৃত ঘটনা তথ্যশূণ্য প্রলাপ মাত্র”
– রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, প্রবন্ধ অতিপ্রাকৃত।
ভারতবর্ষ তখন পরাধীন। ঔপনিবেশিক শক্তির শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত । ঔপনিবেশিক শক্তির তাঁর শাসনের প্রয়োজনে বাংলা ও পরে ভারতীয়দের দাবীতে ইংরেজি ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে শিক্ষানীতি ঘোষণা করে। আধুনিক সাহিত্য , বিজ্ঞান ও দর্শন শিক্ষার বিষয়ীভুক্ত হয়।। সেইসময় কলকাতা বাংলার রাজধানী হওয়ায় বাংলা বিশেষ করে কলকাতা আধু‌নিক শিক্ষার পীঠস্থান হয়ে ওঠে। কলকাতাকে কেন্দ্র করে একদল শিক্ষিত মানু্ষের চেষ্টায় নবজাগরণ শুরু হয়। এই নবজাগরণ নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তার প্রভাবে প্রভাবান্বিত হয় সমাজ ,সাহিত্য, বিজ্ঞান।

এই নবজাগরণের তিনটি ধারা। একটি ডিরোজিও নেতৃত্বে ইয়ংবেঙ্গল দল।এই ইয়ংবেঙ্গলের ছেলেরাই সমাজের পচনকে জনসমক্ষে আনে ও তা দূরীকরণের জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করে। ডিরোজিও কে অন্যায়ভাবে শাস্তি দেওয়া হয়, সেই ট্র্যাডিশন আজও চলছে।

দ্বিতীয় ধারা রক্ষণশীল রাজা রাধাকান্তদেবের নেতৃত্বে শুরু হয়। ওনারা সমাজের সংস্কারকে ঐতিহ্য বলে চালানোর চেষ্টা করে। কিন্ত শিক্ষার স্বপক্ষে ছিলেন।

তৃতীয় ধারা রামমোহন বিদ্যাসাগরের চিন্তা দিয়ে শুরু হয়ে ও কলকাতা থেকে সম্প্রসারিত হয়ে দিকদিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। এই তৃতীয় ধারার একজন ছিলেন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী ।যিনি ১৮৬৪সালে আজকের দিনে পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন ।কোনো কোনো মানুষের আসা নিছকই আসা নয় ওনার জীবনযাপন সেটাই প্রমাণ করে। মুর্শিদাবাদ জেলায় শক্তিপুরে জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে ওঠার সাথে কান্দী ও কান্দীর জেমো ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। এই প্রতিভাবান মানুষটি ছাত্র হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দেবেন এটাই স্বাভাবিক। ইনি রিপণ কলেজে প্রথমে অধ্যাপক ও পরে অধ্যক্ষ হয়েছিলেন। তাঁর গবেষণার ক্ষেত্র হয় হয় মানবসমাজের মানোন্নয়ন ।তিনি উপলব্ধি করেন সাহিত্য ও বিজ্ঞান চেতনা সমগ্র মানবসমাজের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ালেই উন্নতি সম্ভব। তাই এই কাজে আত্মনিয়োগ করেন। রচনা করেন একের পর এক প্রবন্ধ।প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি পাঠকসমাজের সাথে অন্তরঙ্গ হন।

তিনি জোর দেন বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার ওপর। বাংলা ভাষা শুধুমাত্র গুটিকয়েক মানুষের মধ্যে নয়, সমগ্র বাঙালির মধ্যে প্রসারিত করেন। বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ সৃ‌ষ্টিতে তাঁর ভূমিকার কথা সর্বজনবিদিত। মুর্শিদাবাদ বাংলা ভাষা চর্চার ইতিহাসে তাঁর নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। এই কাজে তাঁকে সাহায্য করেন দুই মানবিক মুখ মণীন্দ্রচন্ন্দ্রনন্দী ও যোগীন্দ্রনারায়ণ রায়। ভাবা যায় সেইসময় তিনি কাশিমবাজারে সাহিত্য সন্মেলন করেন ও স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্থিতিতে ।

তিনি স্বদেশ ভাবনায় ভাবিত ছিলেন। তাই তো বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের রবীন্দ্রনাথঠাকুরের সাথে তাঁর নাম উচ্চারিত হয়। তিনি সেই সময় বঙ্গনারীকে তাদের দৈনন্দিন জীবন থেকে বের করে এনে স্বদেশী আন্দোলনের ভাবধারায় দীক্ষিত করেন। তাই স্বদেশী আন্দোলনের সময় তাঁর ডাকে পালিত হয় “অরন্ধন দিবস”।সেই সময় রচনা করেন” বঙ্গলক্ষীর ব্রতকথা “যার মাধ্যমে সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার ডাক দেন। আজও এই ডাক খুব প্রাসংগিক হয়ে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাথে তাঁর সখ্যতার কথা আমরা জানি। তাই তো জীবনসায়াহ্নে এসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্পর্শ চান। তিনি ররীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রণামের প্রস্তাব দেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রথমে অসন্মতি প্রকাশ করলেও অবশেষে রাজী হন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চেয়ারের ওপরে উঠে দাঁড়ালে তিনি ররবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রণাম করেন যা আজকের দিনে শিক্ষণীয়।।কথিত আছে তারপর তিনি কোমায় চলে যান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স পঁয়ষট্টি বছর।

তিনি অমর হয়ে আছেন তাঁর লেখায় ,সমাজকে দেওয়া তাঁর বার্তায়।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।