কলমের খোঁচা

নবারুণের জন্মদিনে


রঘুনাথ ভট্টাচার্য: চিন্তন নিউজ:২৩শে জুন:-

“কিছু একটা পুড়ছে ‘
কিছু একটা পুড়ছে
আড়ালে , বেরেতে, তোষকের তলায়
শ্মশানে কিছু একটা পুড়ছে

আমি ধোঁয়ার গন্ধ পাচ্ছি
বিড়ি ধরিয়েছে কেউ
কেউ উবু হয়ে ফু দিচ্ছে উনুনে
কেউ চিতায় তুলে দিয়েছে
আন্ত্রিক রোগে মৃত শীর্ণতম শিশু

ওলোট পালোট খাচ্ছে জ্বলন্ত পাখি
কোথাও গ‍্যাসের সিলিন্ডার ফেটেছে
কোথাও কয়লাখনিতে ,বাজির কারখানায় আগুন কিছু একটা পুড়ছে
চার কোনা ধরে গেছে
জ্বলন্ত মশারি নেমে আসছে ঘুমের মধ্যে
কিছু একটা পুড়ছে

ক্ষুধায় পুড়ছে নাড়ি, অন্ত্রেরা
ভালোবাসায় পুড়ছে যুবক

পুড়ছে কামনার শরীর,তূষ, মবিলে ভেজানো তুলো কিছু একটা পুড়ছেই

কী ছুঁয়ে হাতে ফোস্কা পড়েছে
কিছু একটা পুড়ছে, গনগন করছে
চুপ করে পুড়ছে, মুখ বুজে পুড়ছে
ঝড় যদি ওঠে তাহলে কিন্তু দপ করে
জ্বলে উঠবে
কিছু একটা পুড়ছে বলছি
প্রকাশ‍্যে , চোখের ওপর
মানুষের মধ্যে
স্বদেশ।
কবি নবারুণ ভট্টাচার্যের রচনা।

সর্বার্থে , সর্বকালে সর্বত্র প্রাসঙ্গিক , সেই অর্থে আগাগোড়া আন্তর্জাতিক , কবি নবারুণ ভট্টাচার্য এসেছিলেন ১৯৪৮ এর।২৩শে জুন এক ক্ষণজন্মা দম্পতি – মহাশ্বেতা ও বিজন ভট্টাচার্য -এর কোলে, তাঁদের অসাধারণ ঐতিহ‍্যের উত্তরাধিকার নিয়ে। তারপর ফুটে উঠলেন। কারো কারো মতে সে ঐতিহ‍্য
ছাপিয়ে গেলেন তাঁর স্বকীয় আঙ্গিকে ও ভঙ্গীতে। কেউ কেউ বলছেন জন্মস্থান
বহরমপুরের সাঙ্স্কৃতিক ও বিশেষ রাজনৈতিক স্থিতি তাঁর মননশীলতার ভীত তৈরি করেছে। মামা স্বনামধন‍্য মণীশ ঘটক, অতি নিকট আত্মীয় নাট‍্য ব‍্যাক্তিত্ব ঋত্বিক ঘটকের প্রভাবও অবশ‍্য উল্লেখযোগ্য।

কলকাতায় তো আসতেই হবে, বাঙালি যখন। স্কুল,কলেজ, কলকাতায়। দ্রোহকাল পেড়িয়ে ১৯৭৩ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত চাকরি, তাও কলকাতায়। সাহিত্য প্রীতি তো সহজাত। তাই কলেজে ভূতত্ত্ব ছেড়ে, ইংরাজি। ‘সাহিত্যপত্র’ (কবি বিষ্ণুদে প্রণোদিত)-তে সম্পাদনা কিছুদিন। তারপরেই প্রগতিশীল ‘ ভাষাবন্ধন’ -এর সম্পাদনা। ইতিমধ্যে অনেক দিন পরিচালনা করেছেন ‘ নবান্ন ‘ নাট‍্যগোষ্ঠী। এইসব সক্রিয়তা তাঁর সাহিত্য -কৃতিকে যে সমৃদ্ধ করেছিল, সেকথা অনস্বীকার্য।

নিজস্ব প্রথম প্রকাশ সুপরিচিত ‘ পরিচয় ‘ পত্রিকায় একটি ছোট গল্প নিয়ে -‘ভাসান’ ১৯৬৮ তে। প্রথম কবিতার বই ‘ এই মৃত‍্যু উপত‍্যকা আমার দেশ না ‘(১৯৭২)। প্রথম উপন‍্যাস ‘ হারভার্ট ‘ (১৯৯২) তাঁর নামের সার্থকতা। পুরষ্কার আসে। ১৯৯৪-এ ‘ নরসিংহ দাস’, ১৯৯৬-তে ‘ বঙ্কিম ‘, আর, ১৯৯৭-এ সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার এলো। হারভার্ট – উত্তর উপন‍্যাসগুলিও ‘ইত‍্যাদি’ নয় মোটেই। নামোল্লেখে পাঠকমাত্রই রোমাঞ্চিত​ হন।যেমন- ফ‍্যাতাড়ু, কাঙাল মালসাট, রাতের সার্কাস, মোসলিয়ম, খেলনানগর,হালাল ঝান্ডা ও অন্যান্য। আরও আছে।

নবারুণ ভট্টাচার্যের রাজনৈতিক বহির্প্রকাশ অনেকেরই চাঞ্চল‍্যের কারণ। তিনি যা কামনা করেছেন, যে সমাজ- প্রতিকৃতির সাধনা করে গেছেন, তারই জয়গান গেয়েছেন তাঁর নিজের ছন্দে। তঞ্চকতাহীন , আকন্ঠ সততাই তাঁর
সৃষ্টির সম্পদ। পূঁজিবাদী রাষ্ট্রকাঠামোর সবল বিরোধিতা ও ধারাবাহিক সমালোচনা তাঁর সাহিত্য সৃষ্টির একমাত্র লক্ষ‍্য, আদর্শ। সেই ওজস্বীতা তাঁকে বলায়, ‘ যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায় আমি তাকে ঘৃণা করি।’

‘ লার্জার দ‍্যান লাইফ’ , আজীবন অকৃত্রিম বামপন্থী কবি ও সাহিত্যিক নবারুণ যখন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ( ২০১৪-এর ১লা আগষ্ট/ মতান্তরে ৩১শে জুলাই), তখন তিনি মাত্র ৬৬ বছরের যুবক। অপ্রতিরোধ্য কর্কটরোগ তার শরীর নিঃশেষ করলেও তাঁর প্রজ্ঞা, তাঁর মেধা শোষণ করতে পারেনি। ৬৬ তো একটা সংখ্যা মাত্র।

সমসময়োত্তীর্ণ সাহিত্যের স্রষ্টা কবি নবারুণ মৃত‍্যুহীন। তাঁর দ্রোহ, তাঁর আশ্লেষ, তাঁর কষ্ট দিয়ে গড়া তাঁর সৃষ্টি , তাঁর ঘৃণা, উত্তরকালকে সমৃদ্ধ করবে। ভবিষ‍্যতের তরুণরা গাইবে : ‘ ভাঙিলে দ্বার, সে কোন ক্ষণ অপরাজিত, ওহে।’


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।