বিনোদন

মৃণাল সেন ও তাঁর শিল্পকৃতি


শাশ্বতী ঘোষাল, চিন্তন নিউজ, ১৪ এপ্রিল: বাংলা তথা ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতে মৃণাল সেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাঁর শিল্পকৃতি কোনো বাঁধাধরা পথে অগ্রসর হয় নি। মৃণাল সেন পরিচালিত সাতাশটি ছবি র মধ্যে যেমন মানুষের জীবন, রাজনৈতিক আন্দোলন বা রাজনীতির ওঠা পড়া আছে তেমনই আছে তাঁর ব্যক্তিগত উপলব্ধির প্রতিফলন। এখানেই তাঁর স্বাতন্ত্র্য। সত্যজিত রায় অবশ্যই ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বলতম জ্যোতিষ্ক। মৃণালের ছবির স্বকীয়তা তাঁর নজর এড়ায় নি। তিনি ছিলেন মৃণালের ছবির কঠোর সমালোচক। এই স্বকীয়তা নিহিত আছে সিনেমা সম্বন্ধে মৃণালের নিজস্ব ধারণার মধ্যে। তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র গুলি তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনার প্রতিফলন। কখনই তা বাণিজ্যের অঙ্গ ছিল না। তিনি ছিলেন সদা সচল ও পরিবর্তমান মননের অধিকারী। সত্যজিৎ তাঁর ছবিতে নিটোল একটি গল্প বলতেন। এটাই ছিল তাঁর ছবির মূল উপাদান। ঋত্বিকের ছবিতে আবার লক্ষ্য করা যায় মেলোড্রামার রাজনৈতিক ব্যবহার করেই তাঁর শৈল্পিক পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়েছে। মৃণাল সেন এর কোনো ধারাই গ্রহণ করেন নি। তাঁর প্রথম দিকের তিনটি ছবি যেমন পুনশ্চ, প্রতিনিধি, নীল আকাশের নীচে ছিল গতানুগতিক বাংলা ছবি অনুসারী। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আনলেন নতুন নতুন আঙ্গিক, তৈরী করলেন নব ভাবধারার সিনেমা, আনলেন নবযুগ। আলোড়ন উঠলো সিনেমা জগতে। যেমন ইন্টারভিউ, ভুবন সোম, প্রভৃতি। সত্তর দশকে পরিচালিত ছবি গুলি দিয়েই মৃণাল সেনের পরিচিতি নির্মিত হতে থাকে। ১৯৭৯ সালে পরিচালিত একদিন প্রতিদিন পর্যন্ত চলতে থাকে নতুন ভারতীয় ছবির আন্দোলনের সূত্রপাত। যা শুরু হয়েছিল ভুবন সোম পরিচালনার মধ্য দিয়ে।
আদ্যন্ত বামপন্থী ভাবধারায় বিশ্বাসী এই মানুষটি বিশ্বাস করতেন ভারতে পরিবর্তন আসবে বিপ্লবের মধ্য দিয়েই। তাঁর এই ব্যক্তিগত উপলব্ধি তাঁর বিভিন্ন সিনেমায় প্রতিফলিত হয়েছে। একের পর এক ছবিতে চালিয়ে গেছেন তাঁর আত্মবীক্ষণ। আকালের সন্ধানে, চালচিত্র, খারিজ, খণ্ডহর, একদিন অচানক (হিন্দি) প্রভৃতি ছবি তারই সাক্ষ্য বহন করে। সবগুলির মধ্যে ই মধ্যবিত্ত সমাজের মানসিক সংকীর্ণতার দিকটি তিনি উন্মোচিত করতে চেয়েছেন।
স্বল্প পরিসরে মৃণালের ছবি গুলির বিশ্লষণে না গিয়েও যেটা না বললেই নয় তা হলো প্রতিভাবান এই পরিচালকের মৃত্যু পৃথিবীর কাছে বাংলা
সিনেমাকে গুরুত্বহীন করে দিল। তিনি আমাদের মধ্যে ছিলেন বিশ্বসিনেমায় ঐতিহাসিক ভাবে শেষতম গুরুত্বপূর্ণ জীবিত বাঙালি হিসাবে।
দেশে বিদেশে বহু পুরস্কার তিনি পেয়েছেন ঠিকই তবুও দেশের মানুষের কাছে তাঁর সঠিক মূল্যায়ন আজও হয় নি। হয়তো অদূরবর্তী ইতিহাস এর কারণ খুঁজে পাবে। ভবিষ্যত প্রজন্ম পাবে এই ব্যতিক্রমী চিত্র পরিচালকের প্রতিভার যথার্থ পরিচয়।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।