কলমের খোঁচা

সাহিত্যিক আশাপূর্ণা দেবীর জন্মদিনে চিন্তনের শ্রদ্ধার্ঘ্য।


কল্পনা গুপ্ত: চিন্তন নিউজ: ৮ই জানুয়ারি: – স্বাধীনতা পূর্ব সময়ে ১৯০৯ সালের ৮ ই জানুয়ারি আশাপূর্ণা দেবী জন্মেছেন। তখন বাংলায় একটু একটু করে নারী শিক্ষার পথ খুলছে। পাল্কিসমেত বনেদি পরিবারের মহিলাদের গঙ্গায় ডুবিয়ে গঙ্গাস্নান করানো হতো। ঠাকুর বাড়ি, গঙ্গোপাধ্যায়,  মুখোপাধ্যায়,  বসু ইত্যাদি সব অভিজাত পরিবারের মেয়েরা ঘরে গৃহশিক্ষকের কাছে কিছু লেখাপড়া শিখতো।  তবে সেসবই পুরুষের ইচ্ছাধীন। বাংলাদেশের নারীর স্ব-ইচ্ছা বলে কিছু ছিলো না। তাই আবার মেয়েমহলে মেয়েরাই মেয়েদের শৃঙ্খলিত করার যন্ত্র ছিলো। অভাব ছিলো স্ত্রীশিক্ষার। একে ক্রান্তিকালও বলা যায় না, এ ছিলো এক অচলায়তন।

ঠিক সেখানে আশাপূর্ণা দেবী তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে ঘা মেরেছিলেন সেই অচলায়তনে। তাঁর লেখা ছোট গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি ছিলো চলমান সমাজের আয়না, সেসময়ের মেয়েদের মধ্যে একটা নাড়া দিয়েছিলো, আজও তা প্রাসঙ্গিক। প্রথম প্রতিশ্রুতি,  সুবর্ণলতা, বকুলকথা, নিলয় নিবাস, অগ্নিপরীক্ষা,চিত্রকল্প,দিব্যহাসিনীর দিনলিপি ইত্যাদি গ্রন্থ আজও সমাদৃত।
   
তাঁর জন্ম উত্তর কলকাতার মামার বাড়িতে। পিতা হরেন্দ্রনাথ গুপ্ত, মা সরলাসুন্দরী। মায়ের গভীর সাহিত্য প্রেম তাঁর মধ্যে শিশু বয়েস থেকেই সঞ্চারিত হয়। হরেন্দ্রনাথ ছিলেন সেসময়ের একজন কমার্শিয়াল আর্টিস্ট, যিনি বাংলার নামকরা পত্রিকাগুলির প্রচ্ছদও আঁকতেন। ঠাকুরমা নিস্তারিণী দেবীর কঠোর অনুশাসনে তাঁর কোন প্রথাগত শিক্ষা লাভ ঘটেনি। তাঁর স্মৃতি চারণায় বলেছেন, ” ইস্কুলে পড়লেই যে মেয়েরা….  বাচাল হয়ে উঠবে, এ তথ্য আর কেউ না জানুক আমাদের ঠাকুমা ভালোভাবেই জানতেন, এবং তাঁর মাতৃভক্ত পুত্রদের পক্ষে ওই জানার বাইরে কিছু করার শক্তি ছিলো না।” তবে মা সরলাসুন্দরী দেবী ছিলেন বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ, চৈতন্য লাইব্রেরি,  জ্ঞানপ্রকাশ লাইব্রেরির সদস্য।  তাঁদের বাড়িতে সেই সময়কার বিখ্যাত গ্রন্থের সমৃদ্ধ ভান্ডার ছিলো।

মাত্র তেরো বছর বয়েসে তিনি ‘শিশুসাথী’ পত্রিকায় ‘ বাইরের ডাক’ নামে একটা কবিতা পাঠান এবং তা প্রকাশিত হবার পরেই তাঁর লেখনি প্রতিভার প্রকাশ ঘটে। তাঁর উপন্যাস, ছোট গল্প ছাড়াও রম্যরচনা, শিশু সাহিত্য, সামাজিক প্রবন্ধ, স্মৃতি কথামূলক রচনা, ৬৩ টি বিভিন্ন ভারতীয় ভাষায় অনূদিত তাঁর বই ভারতীয় সমাজকে সমৃদ্ধ করেছে। তিনি তাঁর জীবন কথায় বলেন,  ” খুব ডাকাবুকো ছিলাম।…. প্রিয় ছিলো দিদি রত্নমালা আর বোন সম্পূর্ণা। যেন একটা অখন্ড ট্রিলজির অংশ।” ১৯২৪ সালে মাত্র ১৫ বছর বয়েসে কৃষ্ণনগর নিবাসী কালিদাস গুপ্তের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের এক কন্যা ও দুই পুত্র সন্তান।  স্বামী কালিদাস গুপ্তের সাহচর্য ও উৎসাহে তাঁর সাহিত্য জীবন আরো সমৃদ্ধ হয়।

বাংলা ছাড়া আর অন্যকোন ভাষা তিনি জানতেন না, কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা লাভ ঘটে নি, পাশ্চাত্য সাহিত্যজগতের সাথেও ছিলো না কোন পরিচয়। নিতান্ত আটপৌরে মা ও গৃহবধূ ছিলেন। তাই তিনি সহজভাবে নারীজীবনের গতি ও অবস্থান দেখেছেন,  দেখেছেন আর্থসামাজিক অবস্থানে পুরুষের নিয়ন্ত্রকের ভূমিকা। সমাজকে একেবারে এক্স রে আই দিয়ে দেখেছেন, সাহিত্যে তার সত্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। আজও তাঁর লেখা প্রাসঙ্গিক। তিনি যে পুরষ্কারে ভূষিত হয়েছেন – ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক,  প্রথম প্রতিশ্রুতির জন্য রবীন্দ্র পুরষ্কার, জ্ঞানপীঠ পুরষ্কার ইত্যাদি। সম্মানিত হয়েছেন – পদ্মশ্রী,  সাম্মানিক ডক্টরেট (জব্বলপুর, রবীন্দ্র ভারতী, বর্ধমান, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়), সাহিত্য আকাদেমি।  আশাপূর্ণা দেবীর জন্মদিনে চিন্তনের পক্ষ থেকে জানাই অনেক শ্রদ্ধা।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।