কলমের খোঁচা

আমার চোখে জ্যোতি বসু


স্বপন কুমার রুদ্র: চিন্তন নিউজ:১লা আগস্ট:- জ্যোতিবাবুর কথা বলতে মনে পড়ে যে মানুষটি বিলেতে ব্যারিস্টারি পড়ার সময়ে সেখানে “ইন্ডিয়ান লীগ” এর সম্পাদক হিসাবে সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাঁর সভার সফল আয়োজন করেছেন। ব্যারিস্টারি পড়ার পরে কলকাতায় ফিরে বাড়ির সম্পূর্ণ অমতে খাঁকী হাফ প্যান্ট ও খাঁকী হাফ শার্ট পরে কলকাতা ডকের কর্মরত কালীমাখা শ্রমিকদের মধ্যে মিশে গিয়ে, তাদের বঞ্চনা , দাবী দাওয়া নিয়ে সতর্ক করে তাদের হয়ে লড়াই করে পার্টির শ্রমিক ইউনিয়নের কাজ করেছেন দিনের পর দিন। তাঁর এই কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ সাফল্য সম্পূর্ণ অজানা থাকলেও নিজের কেরিয়ার বা আইনী পেশার ব্যাপারে ভ্রুক্ষেপ করেননি। শুধুই নিজের আদর্শে একাগ্র ছিলেন।

যাঁরা মাঝে মাঝে তাকে “এলিটিস্ট” বলতে চান, তারা ওনার মতো এই অহংশুন্য কার্যক্রমের দৃষ্টান্ত দেখাতে পারবেন? কেউ তখন স্বপ্নেও ভাবেনি কমিউনিস্ট পার্টি কোনদিন ক্ষমতায় আসবে। কেউ কেউ তাঁকে প্রনাম সেরে বেড়িয়ে এসে পরবরতী কালে বলতে পেরেছেন ” উনি দেহত্যাগ না করলে পদত্যাগ করবেন না” তাঁদের বক্তব্যকে উপহাস করে তিনি তাঁর মুখ্যমন্ত্রীর পদ ত্যাগ করে তাঁর দূরদর্শিতা দেখিয়েছেন।

এখন তো “নিগ্রহ দিবসের বর্ষপূর্তি হয় বিপুল অর্থ ব্যয় করে। জ্যোতিবাবু যে পুলিশের নিগ্রহে কপালে আঘাত পেয়েছেন লাঠির, সেটা কোনদিনই বিজ্ঞাপিত হয়নি। এখন যারা নানা পুরস্কারের বিজ্ঞাপনে গর্বিত নেতৃত্ব, তারা ভুলে যান জ্যোতিবাবুর “ভারতরত্ন” পুরস্কার প্রত্যাখান করার কথা । তিনি বুঝিয়েছিলেন” কমিউনিস্টরা মানুষের জন্য কাজ করে, পুরস্কার এখানে অপ্রাসঙ্গিক” । আর কোন দলের নেতা আছেন ভারতে? জ্যোতিবাবুর মতো, যিনি প্রধানমন্ত্রীর হবার শত অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়েছেন শুধু তাঁর নিজের দলের অনুজদের মতামতকে মান্যতা দিয়ে।

ভারতে মার্ক্সসীয় বিজ্ঞানের তিনিই শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী যিনি একটানা ৩৪ বছর বামপন্থী ঐক্যকে জয়ী করে, নেতৃত্ব দিয়েছেন। শোনা যায় বিধানচন্দ্র রায় জ্যোতিবাবুর সমালোচনার আইনী প্রখরতায়, তাঁকে বলেছিলেন, ” তুমি এত বেশী সমালোচনা করো কেন? তুমিই তো একদিন আমার চেয়ারে বসবে।” বিধানবাবুর দূরদর্শিতা ছিলো নির্ভুল।এখন কথায় কথায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানহানির মামলার হুমকী দেন। অথচ জ্যোতিবাবু এই ধরনের প্রস্তাব উড়িয়ে দিয়েছেন।

অসমর্থিত সংবাদ অনুযায়ী ৩৪ বছরে দক্ষিণবঙ্গ হতে কেবলমাত্র আসানসোল, বক্রেশ্বর, মেজিয়া অবধি অনেক কারখানা স্থাপিত হয়েছে। উত্তরবঙ্গের দিক ধরা হয়নি। এইসব কারখানার মার্বেল ফলকে উদ্বোধনের তারিখ দেওয়া আছে। সেইজন্য প্রয়াত সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বলেছিলেন, “দয়া করে নিজেরা দেখে আসুন কি বিপুল শিল্পসংস্থান হয়েছে।”

অনেকে অভিযোগ করেন, “সিপিআই(এম) তো বিদেশী আদর্শে বিশ্বাসী” তারা ভুলে যান স্বামী বিবেকানন্দের কনিষ্ঠ ভ্রাতা ভুপেন্দ্রনাথ দত্ত কমিউনিস্ট আদর্শ ও সমাজতন্ত্রে গভীর আস্থাবান ছিলেন। ছিলেন রবীন্দ্রনাথও।
কলেজস্ট্রীটের মোড়ে মহাত্মা কৃষ্ণচন্দ্র পালের মর্ম্মরমূর্তি স্থাপিত হয়েছিলো একযোগে দেশীয় নেতা এবং ব্রিটিশ প্রশাসনের শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে। একে জাতীয়তাবাদের পিতা” বলে বর্ণনা করেছেন সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়। মহাত্মা গান্ধী, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় থেকে শুরু করে বিজ্ঞানী সিভি রমন শ্রদ্ধা করতেন বিদ্যাসাগরের এই বন্ধুকে। । ব্রিটিশরা তাঁকে হার মেজেষ্টি অপোজিশন (Her Majesty”s Opposition”) বলতে বাধ্য হতেন। জ্যোতিবাবু কৃষ্ণদাস পালের অবদানের ব্যাপারে এতটাই ওয়াকিবহল ছিলেন যে, কৃষ্ণদাসের বর্তমান উত্তরাধীকারিদের কাছে অনুরোধ করেন, কৃষ্ণদাস পালের জীবনী প্রকাশ করার ব্যাপারে।
লেখক নিজে এবিষয়ে অবগত। ১৯১০ সাল নাগাদ একই নির্দেশ দিয়েছিলেন ভুপেন্দ্রনাথ বসু এবং পরবরতীকালে কমল বসু ও প্রতাপ চন্দ্র চন্দ্র। কৃষ্ণদাসের জীবনীটি প্রকাশিত হলেই লেখক, বইটির লেখক প্রয়াত সুবোধ চৌধুরীর সহিত জ্যোতিবাবুর সাথে ইন্দিরাভবনে দেখা করে তাঁর হাতে পুষ্পস্তবক ও কৃষ্ণদাস পালের জীবনী তুলে দেন। এই ঘটনায় জয়কৃষ্ণ বাবুর সহায়তায় আমরা কৃতজ্ঞ। জ্যোতিবাবু বইটি পেয়ে খুশী হয়েছিলেন। আমাদের ভারতীয় আদর্শবাদের ইতিহাস সম্বন্ধে তিনি কতো ওয়াকিবহল ও শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এই ঘটনাটি তাঁর নিদর্শন ।

আমরা বিধানসভার অধিবেশনে জ্যোতিবাবুকে দেখেছি সবার বক্তব্য মন দিয়ে শুনতে।অত্যন্ত গাম্ভীর্যময় পরিবেশ থাকতো অধিবেশনের সময়ে। একবার পুলিশের এক বিশাল দল বিদ্রোহ করে হানা দিয়েছিলো বিধানসভায়। অনেকেই খবর পেয়ে বিধানসভা ত্যাগ করেছিলেন বলে কাগজে বেড়িয়েছিলো। কিন্তু জ্যোতিবাবু নিজের ঘরে অনড় হয়ে বসে। পুলিশরা আসতে তিনি কড়াভাবে তাদের উদ্দ্যেশ্যে বক্তব্য রাখেন। সে সঙ্গে জানিয়ে দেন তাদের বক্তব্য থাকলে কীভাবে তাদের জানাতে হবে। ওনার ব্যক্তিত্ব ও বাচনভঙ্গীতে পুলিশেরা ওনার যুক্তি মেনে ফিরেও গিয়েছিলেন। এই ব্যাপারটি সর্বস্তরে প্রশংসিত হয়েছিলো
জ্যোতিবাবুর ব্যাপারে আমি জয়কৃষ্ণ বাবুর কাছে দুটি ঘটনা শুনেছিলাম। একখানা গনিখান চৌধুরী গেছেন ইন্দিরা ভবনে জ্যোতিবসুর সাথে দেখা করতে, জ্যোতিবাবু তাঁকে বললেন, ” কি ব্যাপার, শুনলুম নাকি আপনি সমুদ্রে ফেলেটেলে দেবেন আমাদের”। গনিখান বললেন ” দেখুন ওসব রাজনীতির গরমাগরমি আর কি। আমি এসেছি আপনার সাহায্য চাইতে, আমার চক্ররেলের কাজ ভীষণ পিছিয়ে যাচ্ছে, তাই আমি আপনাকে দিয়ে উদ্বোধন করাবো বলে দিন স্থির করে বিজ্ঞপ্তি দেব। আপনি দয়া করে রাজি হয়ে যান, জ্যোতিবাবু রাজি হয়ে গেলেন।
আর একবার তখন ইন্দিরা গান্ধী পরাজিত হয়েছেন। তাই ওই দুঃসময়ে খুব একটা কোথাও বেড়োতেন না। জ্যোতিবাবুকে ইন্দিরা গান্ধী ফোন করে বললেন উনি দার্জিলিং এ থাকতে চান কিছুদিন জ্যোতিবাবুর যদি অসুবিধা না থাকে। শুনে জ্যোতিবাবু বললেন, “এটা কোন ব্যাপার নয়, আপনি সপরিবারে যতদিন খুশী দার্জিলিং এ থাকুন। আমি ওখানকার রাজ্যপালের ভবনে বলে দেব, সব ব্যবস্থা ওরা করে দেবে। এটা আমার দায়িত্ব। আপনি নিশ্চিত থাকুন” । বলাবাহুল্য ইন্দিরা গান্ধী খুবই খুশী হয়েছিলেন। জ্যোতিবাবু যখন চীনে যান, ইন্দিরা ওনাকে ভারতসরকারের প্রতিনিধি হিসেবে গন্য করে কিছু রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকর্ম দিয়েছিলেন। জ্যোতিবাবু পালনও করেছেন যথাযথ যোগ্যতায়।

ওনার বিশেষ উপদেশটির কথা বলে এই লেখাটির উপসংহার টানি। উনি বলেছিলেন (“we communists never give up for cause of people)..আমরা কমিউনিস্টরা জনগনের স্বার্থে কখনো হাল ছাড়িনা। এটাই সবাই এর চলার পথের দিশা হোক , ওনার প্রতি শ্রদ্ধায়।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।