কলমের খোঁচা

বিশ্ব মাটি দিবস উদযাপন ও জনজীবন এ তার প্রাসঙ্গিকতা। — – অগ্নিভ সিনহা (গবেষক, কৃষি রসায়ন ও মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ বিধান চন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়)


চিন্তন নিউজ:৬ই ডিসেম্বর,২০২০:–রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য এবং কৃষি সংস্থার(FAO) উদ্যোগে প্রতিবছর ৫ ই ডিসেম্বর বিশ্ব মাটি দিবস পালিত হয়। এই দিনটি উদযাপনের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষের মধ্যে মাটি, গুনগতমান ও তার বিজ্ঞানসম্মত ব্যবহার নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, যা জীবনধারণ, খাদ্য নিরাপত্তা, বাস্তুতন্ত্রের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।

২০০২ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ সয়েল সায়েন্স(IUSS) বিশ্ব মাটি দিবস উদযাপনের প্রস্তাব দেয়। রাষ্ট্রসঙ্ঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০১৩ সালের জুন মাসে রাষ্ট্রসংঘের ৬৮ তম জেনারেল অ্যাসেম্বলিতে বিশ্ব মাটি দিবসের সার্বিক অনুমোদনের মনোনয়ন পেশ করে।  “রাষ্ট্রসংঘের জেনারেল অ্যাসেম্বলি ২০১৩ সালের ডিসেম্বর মাসে,” ২০১৪ সালের ৫ই ডিসেম্বরকে সরকারী ভাবে প্রথম বিশ্ব মাটি দিবস হিসেবে মান্যতা দান করে। থাইল্যান্ডের রাজা ভুমিবল অদুল্যদেজ এই বিশ্ব মাটি দিবস রূপায়ণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। তাই তাঁর সম্মানার্থে তাঁর মৃত্যুদিন ৫ই ডিসেম্বর সারা বিশ্ব জুড়ে বিশ্ব মাটি দিবস উদযাপন করা হয়।

‘বিশ্ব মাটি দিবস’ এর এবারের থিম হলো- “মাটিকে বাঁচান, মাটির জীববৈচিত্র্য রক্ষা করুন”(Keep Soil Alive, Protect Soil Biodiversity)। মাটির গুণগত মান বজায় রাখতে ও ক্রমবর্ধমান খাদ্যচাহিদা মেটাতে বর্তমানে বেড়ে চলা প্রতিবন্ধকতাগুলিকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত জরুরি। এই কাজে বিশ্বব্যাপী সমস্ত দেশের সমস্ত জনগোষ্ঠীর সক্রিয় অংশগ্রহণ অবশ্যই কাম্য।

কিন্তু বর্তমানে আমাদের মাটির প্রতি অবহেলা, অজ্ঞানতা, বিচক্ষণহীনতা আমাদের সীমাহীন এক বিপদের সম্মুখীন করে তুলেছে। যে মাটি তৈরি হতে লক্ষ লক্ষ বছর সময় লেগে যায়, যে মাটির ওপর ভিত্তি করে আমাদের পুরো সভ্যতা দাঁড়িয়ে, অতি সহজেই আমরা সেই মাটিকে চাষের অযোগ্য, বন্ধ্যা মাটিতে পরিণত করে ফেলছি। ফলস্বরূপ বিশ্বের নানান জায়গায় দেখা দিচ্ছে খাদ্যের অভাব ও দুর্ভিক্ষ। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন, নগরায়ন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, এছাড়া মাটির অতিকর্ষণ, অত্যধিক সার প্রয়োগ, মাটিতে জৈব বস্তু প্রয়োগে অনীহা মাটির স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটাচ্ছে।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় সরকার সয়েল হেলথ কার্ড স্কিম চালু করে, যেখানে প্রতি কৃষকের জন্য সয়েল হেলথ কার্ড বরাদ্দ করা হয়। এই কার্ডে শস্য অনুযায়ী চাষবাসের জন্য  সার সংক্রান্ত সমস্ত তথ্য  দেওয়া থাকে।

এখন সব থেকে বড় প্রশ্ন হলো, যেভাবে আমরা মাটিকে দূষিত করে ফেলেছি,এখান থেকে কি আর ফেরা সম্ভব? উত্তর হলো অবশ্যই সম্ভব। তবে তার জন্য কিছু নিয়ম আমাদের পালন করতেই হবে।   – মাটি যে নিছকই শুধু নোংরা নয়(Soil is not just a dirt), মাটির স্বাস্থ্য রক্ষাও যে আশু প্রয়োজন, এব্যাপারে জনসাধারণ কে সচেতন করে তুলতে হবে।

-ভুমিক্ষয় রোধে বৃক্ষরোপনে জোর দিতে হবে।

-কৃষিবর্জ্য মাঠের মধ্যেই যাতে পোড়ানো না হয়, সেই ব্যাপারে কৃষক ভাই দের মধ্যে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে,  

-জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।  -ইন্টিগ্রেটেড পেস্ট ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে রাসায়নিক কীটনাশক, ছত্রাকনাশক, আগাছানাশকের ব্যবহার কমাতে হবে। 

-জৈব সার ব্যবহার বাড়াতে হবে। রাসায়নিক সার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।.

এই নিয়মগুলো যদি আমরা মেনে চলি ও মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে যদি একটু হ’লেও জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পারি, তবেই বিশ্ব মাটি দিবস উদযাপন সার্থকতা লাভ করবে ও আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যাওয়ার অঙ্গীকার করে যেতে পারবো।
 





মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।