কলমের খোঁচা

শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক, মহান দাতা এবং জনহিতৈষী হাজী মুহম্মদ মহসীন স্মরণে


রত্না দাস : চিন্তন নিউজ:৩০শে অক্টোবর:- ভ্রমণ মানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করে এই বিশ্বাসে তিনি বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। এইসময়ে তাঁর পিতা-মাতা মৃত্যুবরণ করেন এবং তাঁর একমাত্র বোন মন্নুজান হুগলির নায়েব-ফৌজদার মির্জা সালাহউদ্দীনের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। অল্পবয়সে বিধবা হয়ে যাওয়া নিঃসন্তান মন্নুজান তাঁর বিশাল সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য মহসীনকে ব্যাকুলভাবে দেশে ফিরে আসার আহবান জানান। মোহসীন দীর্ঘ ২৭ বছর পর বাড়িতে ফিরে আসেন। ১৮০৩ সালে মন্নুজানের মৃত্যুর পর মহসীন তাঁর বিশাল সম্পত্তি লাভ করেন। কঠোর তপস্বী মহসীন ১৮০৬ সালে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন এবং দু’জন অছি নিযুক্ত করেন। তিনি তাঁর সম্পত্তিকে নয়টি শেয়ারে ভাগ করেন। তিনটি শেয়ার ধর্মীয় কর্মকান্ডে ব্যবহারের জন্য; পেনশন, বৃত্তি এবং দাতব্য কাজে ব্যয়ের নিমিত্ত চারটি শেয়ার এবং দুটি শেয়ার রাখা হয় অছিদের বেতন হিসেবে। মোহসীন খুব সাধারণ ও ধর্মীয় জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। অছিদ্বয় তহবিল তসরুফ করায় ১৮১৮ সালে সরকার মোহসীন ফান্ড-এর ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিজ হাতে তুলে নেয়। সম্পত্তির বর্ধিত অংশ বিভিন্ন দালান-কোঠা নির্মাণ কাজে ব্যয় করা হয়। উনিশ শতকের পঞ্চাশ-এর দশকে নির্মিত এই সকল দালান-কোঠার মধ্যে ছিল আবাসস্থল, স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, হাসপাতাল, সমাধিসৌধ ও ইমামবারার ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি বাজার।

হাজি মুহাম্মদ মহসীন বাংলার একজন দানবীর মানুষ হিসাবে খ্যাত। তিনি মানুষের কল্যাণে বহু কাজ করেছেন। এখনও মহসীনের নামে বহু শিক্ষালয় আছে। খুলনার হাজী মহসীন কলেজও ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও হাজি মুহাম্মাদ মহসীনের নামে ছাত্রাবাস আছে। মহসীন এস্টেটের আয় থেকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে হুগলী মহসীন কলেজ, হুগলী মাদ্রাসা এবং হুগলীর জেলা হাসপাতাল ‘ইমামবাড়া সদর হাসপাতাল’। আর এই আয় থেকে এখনো দুস্থ ও কৃতী ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয় বৃত্তি।

১৭৬৯-৭০ সালের সরকারি দলিল থেকে জানা যায় যে, ওই সময়ের মহাদুর্ভিক্ষে মুহম্মদ মোহসীন বহু লঙ্গরখানা স্থাপন করেছিলেন এবং সরকারি সাহায্য তহবিলে প্রচুর অর্থ প্রদান করেছিলেন।

হাজী মুহাম্মদ মহসীন এর জন্ম- ১৭৩২ সালের ৩০ অক্টোবর,হুগলিতে। তাঁর পিতা হাজী ফয়জুল্লাহ এবং মাতা জয়নাব খানম। এটি ছিল জয়নাবের দ্বিতীয় বিবাহ। তাঁর প্রথম স্বামী আগা মোতাহার ছিলেন একজন ব্যবসায়ী। তিনি হুগলিতে বসতি স্থাপন করেন এবং হুগলি, যশোর, মুর্শিদাবাদ ও নদীয়ায় বিস্তীর্ণ জায়গির লাভ করেন। তিনি তাঁর বিপুল সম্পত্তি তাঁর একমাত্র কন্যা মন্নুজান খানম-এর নামে উইল করে যান। ফয়জুল্লাহর পিতাও ছিলেন একজন জায়গিরদার।

ফয়জুল্লাহ তাঁর পুত্রকে আধুনিক শিক্ষায় যথেষ্ট শিক্ষিত করে তোলেন। একজন গৃহশিক্ষক মোহসীন ও তাঁর সৎ বোন মন্নুজানকে শিক্ষা প্রদান করতেন। মনোযোগী ছাত্র হিসেবে মোহসীন বিভিন্ন শাস্ত্রে অসামান্য ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। পরে তিনি উচ্চ শিক্ষার্থে বাংলা সুবাহর তৎকালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদ গমন করেন। ভ্রমণ মানুষের জ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত করে এই বিশ্বাসে তিনি খুব শীঘ্রই বিশ্বভ্রমণে বেরিয়ে পড়েন। তিনি ইরান, ইরাক, আরব, তুরস্ক প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন।

হাজী মুহম্মদ মহসীনের- মৃত্যু হয় ১৮১২সালের ২৯ নভেম্বর। ইমামবাড়ার একটু দূরেই মুহসীনের পারিবারিক কবরস্থান। এখানে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন হাজি মুহম্মদ মুহসীন।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।