কলমের খোঁচা

ইলা মিত্র – এক নিপীড়িত মানুষের প্রতিনিধির নাম।


প্রতিবেদক : মিতা দত্ত: চিন্তন নিউজ:১৮ই অক্টোবর:– ছোটোবেলা থেকেই মেয়েটির প্রতিভার স্ফুরণ দেখা যায়। পড়াশোনার পাশাপাশি শরীরচর্চা ও খেলাধুলা তাকে অন্য জগতে পৌঁছে দিয়েছিলো। খেলোয়াড় রূপটাই যেন এই মেয়েটিকে অন্তর থেকে সংগ্রামী হিসাবে গড়ে তুলেছিলো । সেই মেয়েটি হ’লেন কমিউনিস্ট আদর্শে নিবেদিত ইলামিত্র। পিতার চাকুরী সূত্রে কলকাতায় বসবাস করার সুবাদে কলকাতাতেই তিনি আজকের দিনটিতে জন্মগ্রহণ করেন ।
পিতা নগেন্দ্রনাথ সেন ও মাতা বিভাময়ী দেবী পরম যত্নে ইলাকে শৈশব থেকেই বঞ্চিত জনগণের “মনের মানুষ” করে বড়ো করে তুলেছিলেন।

প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে তিনি বেথুন কলেজে আসেন। পড়াশোনার পাশাপাশি সমাজপতি সৃষ্ট মেয়েদের নানাবিধ সমস্যা তাঁর দৃষ্টি এড়ায়নি। তিনি যোগ দিলেন মহিলা সমিতিতে। সেইসময় সনাতন হিন্দুপন্থীদের হিন্দু কোড বিল নিয়ে মহিলা সমিতির আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। মাত্র আঠারো বছর বয়সে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। বিভিন্ন লড়াই আন্দোলনে থাকলেও পড়াশোনার প্রতি তাঁর সমান গুরুত্ব ছিলো। তাই প্রতিটি পরীক্ষায় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখতেন।

শুরু হয় বৃহৎ সাংসারিক জীবন। জীবনসাথী হিসেবে পাশে পান কমিউনিস্ট মতাদর্শে দীক্ষিত রমেন্দ্রনাথ মিত্রকে, যে তাঁর জীবনপ্রবাহকে সঠিক খাতে প্রবাহিত করে। জমিদারপুত্র রমেন্দ্রনাথ খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন ব্রিটিশ সরকার সৃষ্ট জমিদারি ব্যবস্থায়পুষ্ট কৃষকদের দূরাবস্থা। এই বিষয়টি তিনি তাঁর স্ত্রীর কর্ণগোচর এবং দৃষ্টিগোচর করেন। ইলা মিত্রের মর্মে আঘাত লাগে। মনে পড়ছে সলিল চৌধুরীর সেই বিখ্যাত গান ” আজ নয় গুনগুন গুঞ্জন প্রেমের ……”।

কিন্ত জমিদারবাড়ির পুত্রবধূর বাইরে বেড়িয়ে কাজ করা খুব সহজ নয়। রমেন্দ্রনাথের সহযোগিতায় তিনি সেই অসাধ্য সাধন করলেন। প্রথমে গ্রামের স্কুলে বালিকা বিদ্যালয়ে পড়ানো দিয়ে তাঁর শ্বশুরবাড়ির শৃঙ্খল ভেঙে সমগ্র জনতার সঙ্গে মিলনের পর্ব শুরু হয়। নিজ স্বভাব গুনেই সকলের মনের মণিকোঠায় স্থান করে নিলেন। হয়ে উঠলেন সকলের “রাণীমা’।

শুরু হলো তেভাগা আন্দোলন। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কুফলে কৃষকের ওষ্ঠাগত প্রাণ। কারণ ব্রিটিশ শাসক ও জমিদারদের মধ্যে এসে গেছে জোতদার সহ অনেক মধ্যসত্ত্বভোগী । এদিকে পঞ্চাশের মন্বন্তরে দুঃসহ অবস্থা ,তারপর এদের অত্যাচারে কৃষকদের দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে। আন্দোলন ভিন্ন পথ নেই। আন্দোলন ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ে। ইলা মিত্র এই বঞ্চিত কৃষকদের সঙ্গে লড়াইএ সামিল হন। রাজশাহী অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৫০ সালে পুলিশের জালে ধরা পড়েন। চলতে থাকে শারীরিক নির্যাতন, যা তিনি নিজেই পরবর্তীতে বর্ণনা করেন। যা পড়লে শিউরে উঠতে হয়। শুধু পুলিশী হেফাজতে নয় রাজশাহী জেলেও চলে একই নির্যাতন ।পরবর্তীকালে জেল থেকে বেরিয়ে তিনি রাজনীতিতেই মনোনিবেশ করেন ও পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদের সদস্য হন।

শুধু তাই নয় , ১৯৪৬ – ৪৭ নোয়াখালির হিন্দু মুসলিম দাঙ্গার সময় পার্টি তাঁকে দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় দাঙ্গায় পীড়িত জনগণের রক্ষার জন্য পাঠায় ।অসমসাহসী ইলা মিত্র এই এলাকায় যান এবং যোগ্যতার সঙ্গে কাজ করেন। সেই সময় মহাত্মা গান্ধীও এই এলাকায় ছিলেন।

তিনি লেখিকা ছিলেন। “হিরোশিমার মেয়ে ‘ বইটির জন্য পুরষ্কৃত হন। তিনি তাঁর জীবনের কর্ম দিয়ে শিখিয়ে গেছেন, একজন কমিউনিস্টের করণীয় কাজ। তিনি পেরেছিলেন নিজেকে শ্রেণীচ্যুতি ঘটাতে যা আজও অনেকেই নিজের জীবনে প্রয়োগ করে উঠতে পারেন না। তাই আজ তাঁর জন্মদিনে তার জীবন থেকেই কমিউনিস্ট হওয়ার পাঠ নিতে হবে । তবেই আমরা পথের দিশা খুঁজে পাবো।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।