কলমের খোঁচা

হুগলী জেল এবং নজরুল ইসলাম


স্বাতী শীল:চিন্তন নিউজ:২৬শে মে:- অতিমারী, মৃত্যু, লকডাউন এবং আসন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভ্রুকুটি স্বত্তেও হুগলি জেল জেগে উঠেছে নতুন আনন্দে। কলকন্ঠে মুখরিত হুগলি জেলখানা। এই জেলের একটি বিশেষ কুঠুরিতে ফুলের মালায় সেজে উঠেছে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের আবক্ষ মূর্তি। কারণ, এই বিশেষ কুঠুরিতেই কিছু সময়ের জন্য থেকেছেন বিদ্রোহী কবি। হুগলি জেল পরম যত্নে এখনও তাঁর স্মৃতি আগলে রেখেছে।

বিদ্রোহ ছিল তাঁর রক্তে। তাঁর জীবনের নানা অংশ জুড়ে ছিল বিদ্রোহ, বঞ্চনার বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আর এই অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে শোষিত মানুষদের হয়ে কথা বলতে গিয়ে ব্রিটিশদের রোষানলে বার বার পড়তে হয়েছে তাঁকে। নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে তাঁর লেখার ওপর। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে তাঁর অন্যতম পাঁচটি শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ যা সমসাময়িক অন্য কোন কবির ক্ষেত্রে হয়নি।

১৯২২ সালের ২৬ শে সেপ্টেম্বর নিজের পত্রিকা ‘ধূমকেতু’র দ্বাদশ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় তাঁর লেখা কবিতা ‘আনন্দময়ীর আগমন’। আপাতদৃষ্টিতে নিরীহ এই কবিতা তৎকালিন সর্বশক্তিমান ইংরেজ শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছিল। আর এই কবিতার কারণেই ৮ই নভেম্বর রাজদ্রোহের অপরাধে নজরুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল। ১৯২২ সালের ২৩শে নভেম্বর কুমিল্লা থেকে গ্রেপ্তার করে কলকাতায় নিয়ে আসা হয় তাঁকে, হাজির করা হয় আলিপুর চিফ মেট্রোপলিটান ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে। ১৯২৩ সালের ১০ই জানুয়ারি কোর্টের রায়ে তাঁকে এক বছরের জন্য সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করে সেন্ট্রাল জেলে পাঠানো হয়। এই ঘটনার প্রতিবাদে বিদ্রোহের আগুণ জ্বলে ওঠে সারা দেশে। এমনকি কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নিজের ‘বসন্ত’ নাটকটি কবিকে উৎসর্গ করেন, ১৯২৩ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি।

নজরুলের প্রতি সাধারণ মানুষের এই আবেগ ও শ্রদ্ধা চিন্তায় ফেলে ইংরেজ শাসকদের। তাঁর জনপ্রিয়তায় ভীত হয়ে তাঁকে হুগলি জেলে স্থানান্তরিত করা হয়। আলিপুরে নজরুল রাজবন্দীর মর্যাদা পেলেও হুগলি জেলে তাঁকে সাধারণ শ্রেণির কয়েদীর অবস্থায় নামিয়ে আনা হয়। জেলখানার তৎকালিন সুপার আর্সটন রাজবন্দীদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতেন। বন্দীদের পায়ে থাকতো ডান্ডাবেড়ি, ভাতের পরিবর্তে খেতে দেওয়া হত মাড়, এই বৈষম্য ও নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৯২৩ সালের ১৪ই এপ্রিল অনির্দিষ্ট কালের জন্য অনশনে বসেন নজরুল ইসলাম। তাঁর কালজয়ী কবিতা ‘শিকল পরার গান’ তিনি এই সময়ে রচনা করেন।

হুগলি জেলে কবি নজরুলের সঙ্গে মৌলভী সিরাজুদ্দিন এবং বাবু গোপাল চন্দ্র সেনও অনশনে অংশ নিয়েছিলেন। ৩৯ দিন ব্যাপি এই অনশন অব্যাহত ছিল। কবির শরীরের কথা ভেবে তাঁর শুভাকাঙ্খীরা চিন্তিত হয়ে পড়লেও তিনি নিজে ছিলেন সংকল্পে অটল। এই সময় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলং থেকে নজরুলকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানিয়ে টেলিগ্রাম করেন, যাতে তিনি লিখেছিলেন, ‘গিভ আপ হাঙ্গার স্ট্রাইক, আওয়ার লিটারেচার ক্লেইমস ইউ’। কিন্তু জেল কর্তৃপক্ষ সেই টেলিগ্রাম ‘অ্যাড্রেস ইজ নট ফাউন্ড’ লিখে রবীন্দ্রনাথের কাছে ফেরত পাঠিয়ে দেন নজরুলকে না পড়িয়েই। নজরুলের এই অনশনকে সমর্থন জানিয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশও। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও নজরুলের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৯২৩ সালের ১৭ই মে তিনি হুগলি জেলে আসেন কবির সাক্ষাৎপ্রার্থী হয়ে কিন্তু তাঁকে কবির সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এমনকি নজরুলের মা জাহেদা খাতুনকেও দেখা করতে দেওয়া হয়নি তাঁর সঙ্গে। এই খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে থাকে এবং দেশবাসীর উদ্বেগ বাড়তে থাকে। অবশেষে ২৯ দিন পর কুমিল্লার মাতৃসমা বিরজাসুন্দরী দেবীর অনুরোধে তাঁরই হাতে লেবুর রস পান করে অনশন ভঙ্গ করেন কবি।

নজরুল শুধু কবি ছিলেন না, ব্রিটিশদের কাছে ছিলেন প্রতিবাদী কন্ঠস্বর যাকে বার বার রোধ করার চেষ্টা করা হয়েছে। নির্যাতিত হয়েছেন, অত্যাচারিত হয়েছেন তার পরেও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি, সরে আসেননি, লড়াই চালিয়ে গেছেন তিনি সারাটা জীবন।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।