কলমের খোঁচা

ভয় – ভক্তি – ভক্ত আর ভন্ডামি


শ্যামল চ্যাটার্জি: চিন্তন নিউজ:২৩শে জুন:– কোভিড-১৯ ভাইরাসকে কেন্দ্র করে বিশ্ব জুড়ে লক ডাউন আর সোশ্যাল ডিসট্যান্স অলৌকিক শক্তিধর ঈশ্বরকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এর ব্যাখার আগে একটু ইতিহাসের পাতা ওলটানো যাক। সমাজ বিকাশের দিকে চোখ রাখা যাক।

ধর্মের উৎপত্তি অজ্ঞানতা থেকে এবং ভয় থেকে। থুড়ি একটা ভুল হয়ে গেল। ধর্ম নয় ঈশ্বর চিন্তা হবে। ধর্ম চিন্তা মানুষের মনে অনেক পরে আসে। আদিমকালে মানুষ প্রাকৃতিক ব্যাপারে সম্পূর্ণ অজ্ঞ ছিল। তাদের ধারণা ছিল সমস্ত প্রাকৃতিক কার্য ঘটে কোন এক আধিভৌতিক কারণে। নিয়ানডারথাল কাল থেকেই মানুষ চিন্তা করতে শুরু করে বা মস্তিষ্কের ব্যবহার করা শুরু করে। ফলে একদল মানুষের চিন্তায় আসে পৃথিবীর এই সমস্ত কাজের পিছনে অবশ্যই কোন কার্য-কারন-সম্পর্ক আছে। ফলে আমরা বলতেই পারি অ-বিজ্ঞান আর বিজ্ঞানের যাত্রা শুরু একই সময় থেকে। সেই সময়ের ধর্মকে আমরা বলতেই পারি আদিম ধর্ম। এই ধর্মে এখনকার মতো কোন আচারবিধি ছিল না।

নিয়ানডারথ্যাল, যাদের আবির্ভাব আজ থেকে দেড় লক্ষ বছর আগে। নিয়ানডারথ্যালরাই প্রথম চিন্তা ভাবনা শুরু করে এবং তাকে সুসংহত করার চেষ্টা করে। মনে রাখতে এইটা একেবারে প্রাথমিক স্তর। এই চিন্তা ভাবনা আরো সমৃদ্ধ হয় বা একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে আসে ক্রোম্যাগন মানুষের আমলে। তা আজ থেকে মাত্র ৪০ হাজার বছর আগে। নিয়ানডারথ্যালের আগের প্রজাতিদের সর্বদা ব্যস্ত থাকতে হত অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে (Struggle for existence)। এই লড়াই ছিল যেমন প্রকৃতির সঙ্গে (যেমন বন্যা, ভূমিকম্প, দাবানল ইত্যাদি) আবার অন্য কোন হিংস্র পশু বা গোষ্ঠীর সাথে। প্রাকৃতিক কারনগুলি নিয়ে তাদের কোন ভাবনাই ছিল না। কিন্তু এই ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়েই তারা কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে। আর তার প্রাথমিক সুসংহত রূপ পায় নিয়ানডারথ্যালদের আমলে। তখন থেকে এই প্রাকৃতিক কারণগুলি নিয়ে ভাবনা চিন্তা শুরু হয়। তাদের ধারণা ছিল যে প্রাকৃতিক ঘটনাগুলো কোন এক অলৌকিক শক্তিধরের ইচ্ছায় ঘটছে।

এর কিছু পরে সেই সময়কার মানুষের মধ্যে আসে ওই বিশেষ অলৌকিক শক্তিধর কোন কারণে অসন্তুষ্ট হয়ে এই বন্যা, ভূমিকম্প, দাবানল ইত্যাদি ঘটনা ঘটছে। সেই সময় অজানা অলৌকিক শক্তিধরকে সন্তুষ্ট করার জন্য নানা ধরণের কাজ করতেন। এই অলৌকিক শক্তিধরকে যে চিন্তা আর তাকে ঘিরে সমস্ত কার্যকলাপকে ঘিরে মানুষের যা ধারণা ছিল তাকে আমরা বলতে পারি আদিম ধর্ম। এরপর সমাজ পরিবর্তনের হাত ধরে মানুষের চিন্তার পরিবর্তন ঘটে। সেই সময়ের নিরিখে চিন্তার উন্নতি ঘটে। সামাজিক পরিবর্তনের সাথে ধর্মের পরিবর্তন ঘটে। বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে আসে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম। এখানে একটা কথা জানানো প্রয়োজন যে পৃথিবীর সর্বত্র একভাবে এই পরিবর্তন আসেনি। এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে যা আসে তা হলো, প্রশ্নহীন আনুগত্য। ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর’-এর অঙ্কুর। যা আজো বিদ্যমান। এই নিয়ে পরে আসছি।

প্রাথমিক পর্বে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষার্থে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের শুরু। পরবর্তীকালে রাজার আনুগত্যতে আনতে এই প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মকে ব্যবহার করা হয়। আমাদের জীবনের সমস্ত কিছু ঈশ্বরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। জন্ম-মৃত্যু, ভালোমন্দ ইত্যাদি ইশ্বরের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। আজকের এই বিজ্ঞানের যুগে আমরা এই ধারণায় বিশ্বাসী। আর একদলকে এই ধারণায় বিশ্বাসী করানো হয়েছে।
একদল মানুষ মানুষের মধ্যে ভ্রান্ত ধারণা দূর করে সংগ্রাম করে আসছেন। ধর্মের দোহাই দিয়ে বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আজও সেই ধারা অব্যাহত।
ঈশ্বর সম্পর্কে আমাদের মূল ধারণা উনিই সব কিছু করেন। প্রাকৃতিক ঘটনা থেকে আমাদের জীবনের সব কিছু তার ইচ্ছায়। তাই গানে উঠে এসেছে, সকলি তোমার ইচ্ছা মা, ইচ্ছাময়ী মা তুমি। / তোমার কর্ম তুমি করো মা, লোকে বলে করি আমি। তার মানে আমরা খারাপ বা ভালো যাই করি, সবি তারই ইচ্ছা। উনি আমাদের রক্ষা করেন। উনি অসন্তুষ্ট হলে আমাদের ক্ষতি করেন। আমাদের সকল কাজের নিয়ন্ত্রক যদি উনি হন, তাহলে কেন মানুষের প্রতি অসন্তুষ্ট হন। এই প্রশ্নের কোন উত্তর নেই।

এবার করোনা প্রবাহে নানা প্রশ্নের মুখে সারা পৃথিবীর এই ঈশ্বরকুল। লক ডাউনের শুরু থেকেই সমস্ত কিছু বন্ধ ও গৃহবন্দীর সাথে সমস্ত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দরজা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে এই করোনাতঙ্কে ঈশ্বরভক্তের জন্য তার দুয়ার বন্ধ। উনি জগৎপিতা বা মাতা। আচ্ছা এইরকম কোথাও শুনেছেন যে কোন সন্তান কোন বিপদে পড়েছে আর তার পিতা-মাতা তাকে দূরে সরিয়ে দিতে চাইছেন। করোনা কারণে সব কিছু বন্ধ করা হলেও আবার সব কিছু খুলতেই হতো। তাই কিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কিছু ধীরে ধিরে শুরু হচ্ছে। সব কলকারখানা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলার উদ্যোগ না নেওয়া হয়নি। সরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রগুলিকে স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনার কোন চেষ্টাই নেই। কিন্তু বেশ কিছু বিধিনিষেধ মেনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান খোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে। ঈশ্বর ভক্ত মানুষ দূরত্ব থেকে তাকে ভক্তি জানতে পারার সুযোগ দিচ্ছে। অর্থ প্রণামী ছাড়া অন্য কিছু পুজার্ঘ্য নেওয়া যাবে না। চরণামৃত বন্ধ (যা সব সময় স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর)। আগে ভক্তদের বিশুদ্ধ করা হতো গঙ্গাজল দিয়ে এখন স্যানিটাইজেশনের মাধ্যমে। এইরকম আরো কিছু আছে। জানি না এই প্রশ্ন ভক্তদের মাথায় আসছে কিনা? যে গঙ্গাজল না স্যানিটাইজার কোনটা বেশি শুদ্ধ?

যে করেই হোক মানুষের মগজে ঈশ্বর নিয়ে কোন সন্দেহকে বাসা বাঁধতে দেওয়া যাবে না। সেই উদ্দেশ্যে আমাদের আপোষহীন লড়াই চালাতে হবে। এরমানে ধর্মীয় প্রতিষ্টান ভাঙ্গচুর নয়। খুবই স্পষ্টভাবে বলতেই হবে। কারো বিশ্বাসে আঘাত দিতে নেই, এই ভ্রান্ত ধারণা থেকে আমাদের বেরোতেই হবে।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।