রাজ্য

গঙ্গার ভাঙনে উদাসীন ফারাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ


মল্লিকা গাঙ্গুলী: চিন্তন নিউজ:২২শে আগস্ট:- ভারতবর্ষ যদি নদীমাতৃক দেশ হয় তবে সবথেকে নদী লালিত রাজ্য হল পশ্চিমবঙ্গ। পশ্চিমবঙ্গের সব থেকে বড় নদী গঙ্গা। নদী যেমন শস্য শ্যামলা বাংলার কাছে আশীর্বাদ তেমনি আবার সময়ে সময়ে এই নদীই হয়ে ওঠে সর্বগ্রাসী। বর্ষার ভরা নদীর ভয়ঙ্কর ভাঙন খেলা নদী তীরবর্তী জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে তোলে। নদীকে কাজে লাগানোর জন্য গ্রহণ করা হয় বহুমুখী নদী পরিকল্পনা।গঙ্গা নদীর বহুমুখীতার একটি বিশেষ দিক পরিবহন, নদীবক্ষে জলপথ আর নদীর উপর নির্মিত সেতু যেমন যোগাযোগের মাধ্যম, তেমনিই নদী ব্যারাজের জল বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়।

পশ্চিমবঙ্গের গঙ্গার উপর নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ ও সেতু ফারাক্কা সংলগ্ন বসতি ও জনজীবনের মূল আশ্রয়। এই সেতু তৈরি ও রক্ষা করার যাবতীয় দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের। ফারাক্কা সেতু তৈরির পর সরকারের সিদ্ধান্ত ছিল গঙ্গার ভাঙন দেখা দিলে সেতুর ডাউন ইমে ৮ কি মি পর্যন্ত ভাঙন প্রতিরোধের সমস্ত দায় দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সংস্থা ফারাক্কা ব্যারেজ প্রজেক্টের। প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় ২০০৪ সালে জঙ্গিপুরের সাংসদ হিসেবে এলাকার মানুষের দাবি অনুযায়ী গঙ্গা- পদ্মার ভাঙনকে “জাতীয় বিপর্যয়” তালিকা ভুক্ত করান। মাননীয় সাংসদের সদিচ্ছা ও প্রচেষ্টায় ২০১৪ সাল পর্যন্ত জলঙ্গি অব্দি গঙ্গার ভাঙন রোধের কাজ করে আসছিল ফারাক্কা প্রজেক্ট। কিন্তু এরপরই শুরু হয় নানান বাধা বিপত্তি টালবাহানা। কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আসার পর থেকেই ফারাক্কা ব্যারেজ মেরামতের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেতুর তলদেশে জলঙ্গি তো দূর ১০/১২কিমি কাজও হয় নি, বলে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ। ভাঙন রোধের অভিযোগ নিয়ে গেলে ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ জানিয়ে দেয় তারা ৫ কিমি পর্যন্ত কাজ করবে কিন্তু এই মৌখিক প্রতিশ্রুতিই সার ঐ পাঁচ কিমির মধ্যে অবস্থিত কুলদিয়ার হোসেনপুর গ্রামের ভাঙনের কাজ ও কর্তৃপক্ষ করেনি।

ফারাক্কার কংগ্রেস বিধায়ক মইনুল হকের মতে ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ তুঘলকি আচরণ করছে, তিনি বলেন, অবিলম্বে কাজ না করলে ব্যারেজ অফিস ঘেরাও কর্মসূচি নেওয়া হবে। রাজ্যের মন্ত্রী জাকির হোসেন বলেন, কেন্দ্রের সাম্প্রদায়িক বিজেপি সরকার সংখ্যালঘু এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতে চায় না। সিপিএম নেতা আবুল হাসনাত খান মানুষের জন্য প্রশ্ন তুলেছেন, এতদিন ব্যারেজ কর্তৃপক্ষ কাজ করতো তবে এখন কেন তারা কাজ করছে না তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। গঙ্গার ভাঙনের মূল কারণ সেতু, সেতুর রক্ষনাবেক্ষন হয়না বলেই স্থানীয় মানুষের এমন বিপর্যস্ত অবস্থা।

ফারাক্কা প্রোজেক্টের জেনারেল ম্যানেজার শৈবাল ঘোষ অভিযোগকারীদের সঙ্গে কথা বলা তো দূর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করেন নি। এখানেই প্রশ্ন ওঠে, তিনি কোন সাহসে ভর করে নেতা, মন্ত্রী, জনগন, এমনকি মিডিয়াকেও বুড়ো আঙুল দেখাতে পারেন! এদিকে ফারাক্কার স্থানে স্থানে ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। গ্রামের ভিতর ১২০০ মিটার ভাঙন প্রবণ চিহ্নিত যার ৭০০ মিটার ভাঙনের কবলে, রাস্তা ঘাট, বাড়ি ঘর, চাষের জমি জলের তলায় চলে গেছে। কয়েক বছর আগে নদী পাড় স্পার দিয়ে বাঁধানো হয়েছিল কিন্তু বছর বছর ভয়াবহ প্লাবনে ঐ স্পার ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। স্থানীয় মানুষ এবং জেলা প্রশাসন বালির বস্তা ও বাঁশ দিয়ে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করছে, যা আক্ষরিক অর্থেই “বালির বাঁধ”। একটানা বর্ষণে যে হারে জলের বিপদসীমা অতিক্রম করছে তাতে বাঁধ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ছে। গত বৃহস্পতিবার থেকে এক নাগাড়ে বৃষ্টির ফলে বন্যার জল সামসেরগঞ্জ এলাকার ধানঘড়া গ্রামে ঢুকে পড়েছে। দু’ এক দিনেই আশপাশের এলাকা ও জলমগ্ন হওয়ার আশঙ্কা। কিন্তু কিভাবে ঐ সব গ্রামের অসহায় মানুষ গুলি প্রাণে বাঁচবে সে বিষয়ে কারো ভ্রুক্ষেপ নাই।

ফারাক্কা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় সর্ব স্তরের মানুষ ক্ষুব্ধ, একদিকে করোনা অতিমারির দাপট তার উপর বানভাসি দরিদ্র মানুষ গুলির জীবন জীবিকা জলের তলায় যেতে বসেছে আর কেন্দ্র রাজ্য দুই সরকার ই নিজেদের রাজনৈতিক আখের গোছাতে ব্যস্ত। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের ডিজিটাল ইন্ডিয়ার গর্বে বিদেশ তোষণ আর রাজ্য সরকারের কেন্দ্রের সঙ্গে আঁতাত সাধারণ মানুষকে দিশেহারা করে তুলেছে। ফারাক্কা বাঁধ মেরামতে স্থানীয় নেতৃত্ব এগিয়ে এলেও রাজ্য সরকারের তরফে কেন্দ্রকে চাপ না দিলে সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। ফারাক্কা ব্যারেজ সংলগ্ন মানুষদের রক্ষা করতে কেন্দ্রীয় সরকার তথা ব্যারেজ কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে সোচ্চার আন্দোলন প্রয়োজন। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের কেন্দ্র তোষণ এবং ভোট রাজনীতি দূরে রেখে ফারাক্কা ব্যারেজ সমস্যা মোকাবিলায় দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করা একান্ত প্রয়োজন।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।