কলমের খোঁচা রাজনৈতিক

রাজনীতির অবক্ষয় অবক্ষয়ের রাজনীতি ——————————   


শান্তনু বোস:নিজস্ব প্রতিবেদন: চিন্তন নিউজ:২৪শে জুলাই:–      তখন আমি কোলকাতায় সিটি কলেজে ভর্তি হয়েছি। ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হলে একটা সেমিনার হয়েছিল এসএফআই- এর উদ্যোগে। সালটা ১৯৯৫ অথবা ১৯৯৬ হবে। বিষয় ছিল, “সমাজতন্ত্রই ভবিষ্যৎ এবং ভবিষ্যৎ আমাদের। ” সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন   তখনকার সিপিআই(এম) দলের স্টার বক্তা মানব মুখার্জি,  নকশালপন্থী আজিজুল হক এবং  তৎকালীন কংগ্রেস দলের নেতা সুবক্তা সৌগত রায়। তখন সৌগত রায়ের ইমেজটা আজকের মতো ছিল না। নারদা স্টিং অপারেশনের কলঙ্ক তখনও গায়ে লাগেনি। অধ্যাপক মানুষ, বেশ একটা সর্বজন শ্রদ্ধেয়  ইমেজ ছিল। প্রথম বক্তা হিসেবে বক্তৃতা করতে উঠে শুরুটা করলেন এই ভাবে
” পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের বিরোধী রাজনীতি করতে গিয়ে কখন যে আমরা সমাজতন্ত্র বিরোধী হয়ে গেছি, সেটা বুঝতেই পারিনি”। গোটা ইউনিভার্সিটি ইন্সটিটিউট হল হাততালিতে ফেটে পড়ে ছিল। একজন বিরোধী দলের নেতার ভাষনে এসএফআইয়ের এমন উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখে খুব ভালো লেগেছিল। রাজনীতি তো এমনটাই হওয়া উচিৎ। আমরা যারা আজ মধ্য চল্লিশের, তাদের কৈশোর আর যৌবন যখন কেটেছে, সেই সময়ে বামফ্রন্টের সূর্য ছিল মধ্য গগনে। প্রশাসন এবং সংগঠন দুই দিক থেকেই সাফল্যের চুড়ান্ত পর্যায়ে। তবুও ওই সময়ে বিরুদ্ধতার হাওয়া বইতো। বহু পৌরসভা এবং পঞ্চায়েত বামফ্রন্টের হাতছাড়া হয়ে ছিল। কোলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনে সোমেন মিত্রের প্রদেশ কংগ্রেস পদ্মা খাস্তগীরকে সামনে রেখে দারুণ লড়াই দিয়েছিল। জোড়া পাতা চিহ্নে কালীঘাট মনোনীত গোঁজ প্রার্থী গুলো না থাকলে, সে বছরই কোলকাতা কর্পোরেশনে বামফ্রন্টকে বিরোধী আসনে বসতে হতো। সেই সময়ে আমাদের অনেক বন্ধুবান্ধব যৌবনের স্বাভাবিক স্বভাব অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান বিরোধী ছিল। যেহেতু তখন বামফ্রন্ট সরকার ছিল প্রতিষ্ঠান, তাই যাবতীয় না পাওয়ার ক্ষোভ গিয়ে পড়তো বামফ্রন্ট সরকারের ওপর। সরকারের বিরুদ্ধতা করার জন্যে বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইস্যুর অভাব ছিল না। শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রাথমিক থেকে ইংরেজি তুলে দেওয়া নিয়ে কলেজ স্কোয়ারের ধাপি চাপড়ে জ্বালাময়ী বক্তব্য দিতো তারা। পাল্টা হিসেবে বামপন্থীরা দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষাকে অবৈতনিক করা, শিক্ষা ক্ষেত্রে পঠনপাঠনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা, শিক্ষক সমাজকে সম্মানজনক সরকারি বেতন কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা, এসব দিয়ে বাজিমাত করতো। একবার কংগ্রেসের বাগ্মী নেতা প্রিয় রঞ্জন দাসমুন্সি বামফ্রন্ট সরকারের শিল্পে পিছিয়ে যাওয়াকে অস্ত্র করে সভা মঞ্চ থেকে বন্ধ কারখানার চাবি দেখিয়ে প্রচার তুঙ্গে তোলেন। বামফ্রন্ট সরকার শিল্পায়নে ব্যর্থ। পাল্টা তোপ দাগে বাম নেতৃত্ব। তথ্য সহ মাশুল সমীকরণের ফলে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষতির পরিমান তুলে ধরে। পশ্চিমবঙ্গের কয়লা, লোহা মাশুল সমীকরণের ফলে ভিন রাজ্যে চলে গেলো। অথচ তুলোর ক্ষেত্রে মাশুল সমীকরণ হল না। রাজ্যের বস্ত্রবয়ন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হল। পাট শিল্পের কারখানা গুলো আধুনিকীকরণ হল না। কেন্দ্রীয় সরকারের লাইসেন্স রাজ এবং বিমাতৃসুলভ আচরণ পশ্চিমবঙ্গে ভারি শিল্পের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করলো। সেই সাথে পশ্চিমবঙ্গকে বহন করতে হয়েছে দেশ ভাগের জন্য তৈরি হওয়া উদ্বাস্তুদের চাপ।
                 রাজনৈতিক নীতির কাউন্টার এ্যটাক চলতো তথ্য এবং তত্ত্ব সহ। রাজনৈতিক ইস্যু নিয়ে জমজমাট তরজায় সমৃদ্ধ হতে হতে বেড়ে উঠেছিলাম আমরা। আজকে যারা তরুণ,  তারা রাজনীতি বিষয়ে ঠিক কেমন ধারণা নিয়ে বেড়ে উঠছে একবার ভাবুন তো। একদম পাড়া ঘরের রাজনৈতিক পরিবেশ বলতে যেটা বুঝি সেই পঞ্চায়েত পৌরসভার স্তর থেকে ওপর মহল পর্যন্ত আপাদমস্তক দুর্নীতি। সমাজের প্রত্যেকটা স্তরে রাজনীতি মানেই করেকম্মে খাওয়া শুধু নয়, রীতিমতো টাকার পাহাড় তৈরি করা। বিধানসভা, লোকসভায় যারা প্রার্থী হিসেবে তাদের আয়ের হলফনামা জমা দিচ্ছে তাতে দেখা যাচ্ছে দু’শো থেকে পাঁচশো গুণ সম্পদের বৃদ্ধি এবং সেই হলফনামা পেশ করতে বিন্দু মাত্র লজ্জা বোধ নেই। কোথা থেকে হয়? কিভাবেই বা হয়? ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ায় তারাই বুক ফুলিয়ে ইন্টারভিউ দেয়।
             আসলে দোষটা তাদের নয়। দোষটা তো সাধারণ মানুষের। সাধারণ মানুষ সব জেনে বুঝে তাদেরই ভোট দিচ্ছে লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে। নিজের অজান্তেই বৈধতা দিয়ে ফেলছে যাবতীয় অবৈধতাকে। তৃণমূল কংগ্রেস নামক দলটার সব থেকে বড় অপরাধ হল, সমাজের সমস্ত রকমের অবৈধতাকে বৈধতা দেওয়া। দুর্নীতি আজ আর কোনো ইস্যু নয়। এই দুর্নীতিকে বৈধতা দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। সামাজিক, আর্থিক এবং রাজনৈতিক সব রকমের দুর্বৃত্তায়নজে রাজনীতির  স্বাভাবিক প্রক্রিয়া হিসেবেই মানুষকে মেনে নিতে শিখিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। আমরাও আমাদের মধ্যবিত্ত সুলভ সহনশীলতা দিয়ে প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছি এই চুড়ান্ত অবক্ষয়কে। রাজনীতির অবক্ষয় হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। ইতিহাসের বিভিন্ন বাঁকে এসে রাজনীতির অবক্ষয় হতেই পারে। সে অবক্ষয় ইতিহাসই শুধরে নেয়। কিন্তু অবক্ষয়ের রাজনীতি সমাজের ক্রমবির্তনে এক ভয়ঙ্কর সময়ের সামনে দাঁড় করাবে এই সমাজটাকে। ভয় হয়, আতঙ্ক হয়, অদূর ভবিষ্যতের সেই ভয়াবহ সময়ের ছায়াটাকে দেখে। এ বিশ্বকে আগামী শিশুর বাসযোগ্য করার কথা গুলোকি তাহলে কেবল মাত্র কেতাবী কথা হিসেবেই থেকে যাবে, না-কি মুষ্টি বদ্ধ হাত গুলো আবার আকাশের দিকে উঠে বলবে—-
“ও আলোর পথযাত্রী, এ যে রাত্রী
এখানে থেমোনা
এ বালুচরে আশার তরণী তোমার
যেন বেঁধোনা
আমি শ্রান্ত যে, তবু হাল ধর
আমি রিক্ত যে, সেই সান্তনা,
তব ছিন্ন পালে জয় পতাকা তুলে,
সূর্য তোরণ দাও হানা।।”



মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।