জেলা

বাঁকুড়া জেলার সর্বত্র পালিত হলো খাদ‍্য আন্দোলনের শহীদ দিবস।


কি়ংশুক ভট্টাচার্য:- চিন্তন নিউজ:বাঁকুড়া ৩১আগষ্ট২০২০সোমবার:-আজকের দিনটি ভারতের গণআন্দোলনের ইতিহাসে শাসকের বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই এর এক ঐতিহাসিক ভাবে চিরস্মরণীয় দিন। ঊনিশশ ঊনষাট সালের আজকের দিনেই শুধুমাত্র খেতে চাওয়ার অপরাধে আশিজন নিরন্ন মানুষের বুক ঝাঁঝড়া করে দিয়েছিল রাষ্ট্র অনুমোদিত নিষ্পেষক বাহিনী পুলিশের বুলেট।

স্বাধীনতার পরেই ঊনিশশ তিপান্ন/চুয়ান্ন সাল থেকে শুরু হয় রাজ‍্য জুড়ে প্রবল খাদ‍্য সঙ্কট। সরকারের উদাসীনতা মজুতদারদের অতি মুনাফার লোভে সৃষ্টি হয় এই কৃত্রিম খাদ‍্যাভাব। রাজপথে অবিভক্ত কমিউনিষ্ট পার্টি অন‍্যান‍্য বাম ও বিরোধী দলের সাথে মানুষকে সংগঠিত করে দাবী জানাতে থাকে ঐ দুর্বিষহ অবস্থার অবসানে সরকারের সদর্থক ভূমিকা গ্রহনের। বিধান সভায় তৎকালীন বিরোধী দল নেতা জ‍্যোতি বসুর নেতৃত্বে বহুবার দাবী তোলা হয় সরকারছর হস্তক্ষেপের। কিন্তু সরকারের দিক থেকে কোন সদর্থক পদক্ষেপ নেওয়া হয়না।

সঙ্কট যতো গভীর হতে থাকে আন্দোলনের তীব্রতা তত বৃদ্ধি পায়। ঊনিশ শ ঊনষাটের আগষ্ট মাস তীব্র অনাহার মানুষকে অধৈর্য করে তোলে। পথের খোঁজে মানুষ তখন মরিয়া। কমিউনিষ্ট পার্টির ডাকে লাগাতার আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আজকের দিনে কোলকাতার রাজপথ ও শহীদ মিনারের দখল নিলো কয়েক লক্ষ মানুষ। শান্তিপূর্ণ সভা শেষে সুশৃঙ্খল মানুষের মিছিল রওয়ানা হলো রাজভবন অভিমুখে, নিজেদের অনাহারের কথা রাজ‍্যপালের কাছে তুলে ধরে সমাধানে তাঁর হস্তক্ষেপের দাবী জানাতে। সেই সময় বিনা প্ররোচনায় কোনো সতর্কতা জারি না করে অতর্কিতে রাষ্ট্রের বেতনভুক পুলিশ বাহিনী লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ‍্যাসের শেল ও গুলি বর্ষন করতে শুরু করে ঐ অভূক্ত মানুষের সুশৃঙ্খল দাবী মিছিলের উপর। মৃত‍্যুর কোলে ঢলে পরেন আশিজন। নিখোঁজ হন শতাধিক আহত হন তিন শতাধিক, গ্রেপ্তার হন কয়েক হাজার। সস্তা দরে খাদ্য চাই – খেয়ে পরে বাঁচতে চাই’ শ্রমজীবী মানুষের এই দাবীর বিনিময়ে জুটেছিল তপ্ত সীসার প্রাণঘাতি টুকরো। দাবী উঠেছিল খাদ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের পদত্যাগের। তখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ডাঃ বিধান চন্দ্র রায়, পুলিশমন্ত্রী কালীপদ মুখোপাধ্যায় – না খাবার মেলেনি তাঁদের উপর লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল চৌদ্দ হাজারলাঠিধারী, বন্দুকধারী ও ঘোড়সোয়ার পুলিশ। পরের দিন পয়লা সেপ্টেম্বর প্রতিবাদী ছাত্ররা জমায়েতে হন কোলকাতার রাজপথে। আবারো গুলি চলে। আবারো নিহত কয়েকজন সদ‍্য প্রস্ফুটিত যৌবন। প্রতিবাদে তিন সেপ্টম্বর সারা বাংলা হরতাল।একত্রিশ আগষ্ট সেই ঐতিহাসিক দিন।

অদ্ভুতভাবে আজ আবার মানুষ নিরন্ন। কর্মহীন দেশের প্রায় চৌদ্দ কোটি যুবক। সরকারি সহায়তা না পেয়ে অনাহারে কোটি মানুষ। অতিসংক্রমণ জনিত পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে কর্পোরেট দুনিয়া। একদিকে কর্মচ‍্যুতি ঘটাচ্ছে মানুষের অপরদিকে স্বাস্থ‍্য ব‍্যাবস্থা কে মানুষের অধিকারের বদলে সরাসরি অর্থ উপার্জনের মাধ‍্যমে পরিনত করছে। সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে চিকিৎসা র সুযোগ। উপার্জনহীন মানুষের খাদ‍্যের জোগান সরকার দিতে বাধ‍্য। সমস্ত বাম রাজনৈতিক দল ও গণ সংগঠন, শ্রমিক কৃষকদের সংগঠনগুলি লাগাতার দাবী করে চলেছে রেশনের মাধ‍্যমে আগামী ছয়মাস মাথাপিছু দশকেজি খাদ‍্যশস‍্য বিনামূল্যে সরবরাহের। অথচ সরকার ক‍র্ণপাত করছেনা। রাজ‍্য সরকারের প্রধান ক্রমাগত মিথ‍্যে প্রচারে ব‍্যাস্ত।

এইধরনের পরিস্থিতিতে এবছরের শহীদ দিবস বিশেষ মাত্রা ও গুরুত্বের দাবি নিয়ে বাম আন্দোলনের সামনে উপস্থিত। ইতিমধ্যে ভারতের গণতান্ত্রিক যুব ফেডারেশনের রাজ‍্য কমিটি উচ্চ আদালতে রাজ‍্য সরকারের রেশন সংক্রান্ত ভূমিকা তে আপত্তি জানিয়ে মামলা দায়ের করেন ও গত ঊনত্রিশ আগষ্ট আদালত নির্দেশ দিয়েছে রাজ‍্য সরকারকে সবার কাজে রেশন পৌছানর ব‍্যাবস্থা করতেই হবে। প্রয়োজনে সব পঞ্চায়েত ও পুর এলাকায় নোডাল অফিসার নিয়োগ করে যাঁরা রেশন কার্ড পান নি প্রত‍্যেককে স্লিপ দিয়ে রেশন পাওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।

এই বছর এই দিনের গুরুত্ব মাথায় রেখেই সিপিআইএম এবং তার শ্রমিক কৃষক সংগঠন দুটি যথাক্রমে সিআইটিইউ ও কৃষক সভার উদ‍্যোগে বাঁকুড়া জেলার পুর এলাকা গুলির প্রতিটি এরিয়া কমিটি ও শাখা কমিটির এলাকায় এবং গ্রামাঞ্চলের সব অঞ্চল, শাখা ও গ্রাম এলাকায় মানুষের জমায়েত সভা ও মিছিলে র মধ‍্য দিয়ে এই কর্মসূচী পালন করা হয়। বাঁকুড়া শহরের কুড়িটি শাখা এলাকায় ও এরিয়া কমিটির দুটি দপ্তরে পার্টি সদস‍্যদের জমায়েত ও পতাকা ঊত্তোলন এবং শহীদ বেদীতে পুস্পার্ঘ দেবার মধ‍্যদিয়ে এই দিনের গুরুত্ব উপলব্ধির প্রচেষ্টা গ্রহন করা হয়। বাঁকুড়ার এক নম্বর ব্লকের
প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েতে সিপিআই(এম) ও অন্যান্য বামপন্থী দলগুলোর পক্ষ থেকে এবং সিআইটিইউ’র পক্ষ থেকে রক্ত পতাকা উত্তোলন ও শহীদ বেদীতে মাল্যদানের মাধ্যমে সেই শহীদদের প্রতি আজ শ্রদ্ধা জানানো হলো। এলাকার হেলনা শুশুনিয়া, কালপাথর, শুনুকপাহাড়ী, নূতনগ্রাম, পুরুন্ডি, ধলডাঙা, সানাবাঁধ ও মাঝকানালি গ্রামে কর্মসূচীগুলিতে উপস্থিত হয়েছিলেন কয়েকশত মানুষ – যাঁদের মধ্যে ক্ষেতমজুর ও পরিযায়ী শ্রমিকদের সংখ্যা ছিলো বিশেষভাবে উল্খেযোগ্য। এই সভাগুলিতে পতাকা উত্তোলন করেন এবং বক্তব্য রাখেন বিনোদ বাস্কে, সুনীল ঘোষ, মোহন ধবল, ফটিক গোস্বামী, বাবলু ব্যানার্জী, এনায়েতুল্লা, শ্যামল দাস, গণেশ দে, উজ্জ্বল সরকার প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।
সিআইটিইউ’র পক্ষ থেকে দিনটি উদযাপন করা হয় কেরাণীবাঁধ-শ্যামদাসপুরে নন্দী মিলে, কমরার মাঠে মুটিয়া ভবনে ও গোবিন্দনগর বাসস্ট্যান্ডে। উপস্থিত ছিলেন কিংকর পোষাক, প্রতীপ মুখার্জী, নারান গরাই, ভৃগুরাম কর্মকার, তপন দাস, উজ্জ্বল সরকার প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। বক্তারা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে মোদী ও মমতা সরকারের মানুষ মারা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ঘোষনা করেন। শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতাও পালন করা হয়। – এই কর্মসূচীগুলিতে মুটিয়া শ্রমিকদের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্খেযোগ্য।

আসলে নির্দিষ্ট কয়েকটি এলাকা নয়। উত্তর বাঁকুড়ার মেজিয়া থেকে শুরু করে দক্ষিণে বারিকুল রাণীবাঁধ বা রাইপুর অথবা পূর্বের কোতুলপুর থেকে পশ্চিমের শালতোড়া কিংবা জঙ্গলমহল সংলগ্ন এলাকা সারেঙ্গা কিংবা যদি যান দূর্গাপুর সংলগ্ন বড়জোড়া ব্লক বা অমরকানন প্রতিটি জায়গায় চোয়াল শক্ত করে গভীর শ্রদ্ধার সাথে এই দিনটি পালনের মধ‍্যদিয়ে আগামীর গুরুত্বপূর্ণ কঠিন লড়াইয়ে র শপথ নেবার ছবি দেখা গেলো গোটা জেলা জুড়ে।
আর সেই দৃঢ়তায় উদ্ভাসিত সিপিআইএম এর জেলা দপ্তর শহীদ স্মৃতি ভবনের সামনের পতাকা উত্তোলন ও সংক্ষিপ্ত সভার কর্মসূচী। পতাকা উত্তোলন করেন ও বক্তব‍্য পেশ করেন সিপিআইএম রাজ‍্য কমিটির সদস‍্য অভয় মুখার্জি।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।