বিদেশ

আলেক্সেই ম্যাক্সিমোভভিচ পেশকভ ওরফে ম্যাক্সিম গোর্কি নয়তো মৃত্যুতে নির্বাপন।


মিতা দত্ত: চিন্তন নিউজ:১৮ই জুন:- গোর্কি লেখক হিসেবে যখন রাশিয়ার সমাজে আলোড়ন তুলে দিয়েছেন , তখন আন্তন চেখভকে এক চিঠিতে লিখেছিলেন,”দশ বছর থেকে নিজের রাস্তা বেছে নিয়ে চলতে হয়েছে।লেখাপড়া যে শিখবো তার জন্য পয়সাকড়ি ছিলো না। আমি কেবল জীবন আর কাজ গলাধঃকরণ করেছি। এর বাইরে আর কিছুই করতে পারি নি। আর জীবন তার কিল, ঘুষি, চড় মেরে আমাকে তাতিয়ে রেখেছে।” তাঁর এই উক্তি থেকে সহজেই অনুমেয় তার বাল্যকাল, সাধারণত বাল্যকাল বলতে যে চিত্র আমাদের সামনে ফুটে ওঠে সেরকমটা ছিলো না।

মধ্যরাশিয়ায় ভলগা নদীর তীরবর্তী নিজনি নোভগরদ শহরে ১৮৬৮ সালে ১৬ই মার্চ পেশকভ দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। নয় বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে মামার বাড়িতে মা আসতে বাধ্য হন। তারা ছিলো দুই ভাই। স্টিমারে আসার পথে তার ভাই মারা যায়। সে ও তার মা মামার বাড়িতে অযাচিতভাবেই প্রবেশ করে। তার মায়ের বিকল্প কোনো পথ ছিলো না। স্কুলে ভর্তি তো দূরস্ত মামার বাড়ির পরিবেশগত কারণে দিনযাপনই অসম্ভব হয়ে পড়ে। অবশ্য তার মধ্যে প্রদীপের ক্ষীণ আলোর মতো ছিলো তাঁর দিদা। সারাদিন আকাশের নীচে বনেবাদারে সময় কাটানোর মতো তাঁর মতোই সমাজে সংসারে অপাংক্তয় কিছু সাথী জুটেছিল।সন্ধ্যায় দিদার কাছে ছিলো তার খানিক নিশ্চিন্ত আশ্রয়।দিদার কাছে শুনতেন নানা লোকগাথা , লোককাহিনী রূপকথার গল্প যা তার শিশুমনে স্বপ্নবুননের কাজ করতো। পরবর্তীকালে সাহিত্যসৃষ্টিতে এই লোককাহিনীর প্রভাব পাওয়া যায়।

এই শৈশবকালও সে বেশীদিন যাপন করতে পারেননি। রোজগারের উদ্দেশ্যে তাঁকে নানাবিধ কাজ করতে হয়। অল্পবয়সে শ্রমিকের কাজ মানে মজুরী কম, কাজের সময়কাল বেশী। সেইসময় কাল কখনো ভোর ছটা থেকে রাত্র নটাও হতো । তাঁর জীবন দিয়ে রাশিয়ার মেহনতী জনগণের জীবনসংগ্রামের চিত্র প্রকাশিত হয়। অদ্ভুত ব্যাপার এতো পরিশ্রমের মধ্যেও তার জ্ঞানতৃষ্ণা অটুট ছিলো। কাজের ফাঁকে বিভিন্ন ধরনের বই পড়তেন ।পড়াশোনাটুকু হয়তো ছিলো তাঁর বেঁচে থাকার রসদ।

কাজের সূত্রে ১৮৮৪ সালে কাজান শহরে চার বছর অবস্থান করেন।এই শহরেই তিনি লেখাপড়ার অনুকূল। পরিবেশ পান। এইসময়ে সাহিত্যের নানা ভান্ডারের দরজা তাঁর কাছে উন্মুক্ত হয়।সঙ্গে মার্কস এঙ্গেলসের কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো পাঠ করার সুযোগ পান। তিনি পাঠের আনন্দে ডুবে ছিলেন ও নতুন করে নিজেকে গড়ে তুলছিলেন ।সম্পূর্ণ স্বশিক্ষিত অন্য পেশকভ।

১৮৮৮-১৮৯২ সাল পর্যন্ত। পায়ে হেঁটে রাশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ঘুরে সমাজ, আর্থসামাজিক অবস্থা, আচরণ ও অভ্যাস সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন যা তাঁকে উপলব্ধির জগতকে অন্য মাত্রা দেয়।

১৮৯২ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর লেখনী ।এই লেখনী তাঁকে বিশ্বের দরবারে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। জর্জিয়ার রাজধানী তিবলিসের দৈনিক কাফকাজ( ককেশাস) পত্রিকায় ছাপা হলো” মাকার চুদ্রা’ নামে একটি গম্প।লেখক মার্ক্সিম গোর্কি। গোর্কি শব্দের অর্থ তিক্ত বা কটু স্বাদ। পত্রিকার দপ্তরে বসেই তিনি উদ্ভাবন করেছিলেন এই ছদ্মনাম। পেশকভ হলেন গোর্কি। জীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাকে হয়তো এই নাম পছন্দে সহায়ক ভূমিকা পালন করেছিল।প্রথম লেখার অনুপ্রেরণাকারী হিসেবে তিনি জর্জিয়ার এক গৃহবন্দীর নাম উল্লেখ করেছেন।

তার লেখনীর ক্ষুরধারে রচিত হতে থাকে তৎকালীন রাশিয়ার জার শাসনের অত্যাচার ও তার বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে প্রতিবাদের কথা। ১৮৯৫ শিকারী পাখির গান নামে একটি কাব্যিক গদ্য লেখেন ।জার শাসনে বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ছাত্রদের হাতার প্রতিবাদে তিনি লেখেন ” ঝোড়ো পাখির গান” যা সেইসময় হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছিলো। লিখেছেন “পেটিবুর্জোয়া নামে নাটক যা প্রথম অভিনীত হওয়ায় দর্শকে হৃদয় জয় করেছিলো। এইভাবে চলতে থাকে তাঁর সৃষ্টিকর্ম।

রুশ সমাজের নীচের তলা থেকে উঠে আসা এক ভবঘুরে সমাজের অসমান দেওয়ালে ধাক্কা খেতে খেতে লেখক হয়ে উঠছিলেন, ঠিক সেই সময় আন্তন চেকভের হাত ধরে বিদেশে লেনিনের সান্নিধ্যে আসেন যা তাঁর জীবনের গতিপথকে সঠিক দিশা দেয়। লেনিন তাঁকে দেখেই বলেন,আপনার গল্পগুলি আমি পড়েছি, প্রতিটি গল্প বিপুল সম্ভাবনাময় ।” গোর্কি স্বভাবতই হতবাক। বিদেশে থেকে উনি যে কথা শোনালেন তাতে তিনি অনুপ্রাণিত হলেন।কিন্তু সম্ভাবনাতয় শব্দটি তাঁর মাথায় অনুরণিত হলো। লেনিনকে বলনেন তাঁর নতুন লেখার বিষয়ে ভাবনায় কথা,বলনেন বিষয়বস্তু। লেনিন লেখাটির জন্য তারা দিলেন। গোর্কির মুখে শুনে মনে হয়েছিলো রাশিয়ার যে বিপ্লবের পরিবেশ চলছে তাতে এই লেখা মানুষকে আরো সংগঠিত করবে। বিপ্লবের পথ ত্বরান্বিত হবে।

গোর্কি দেশে ফিরলেন। জার সরকার তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারী করলো যদিও তিনি যেভাবে জনজাগরণের কাজ করছেন তাতে এটা স্বাভাবিক ছিলে। তিনি দেশ ছাড়লেন। নানাদেশ ঘুরে আমেরিকায় এলেন। এখানেই সৃ‌ষ্টি করলেন সেই কালজয়ী উপন্যাস” মা’ ।লেনিনের কথা রাখলেন। কিন্তু একটু দেরী হলো। এই উপন্যাসটি বিশ্ববন্দিত। পিতৃতান্ত্রিক নিগড়ে আবদ্ধ মাকে তিনি মুক্ত মায়ে রূপ দিলেন। বিপ্লবী মা যে একসাথে ছেলেদের আগলায় ও দেশের মুক্তির স্বপ্ন দেখে ও নিজেকে সেই কাজে নিয়োজিত করে।

শোষিত, বঞ্চিত মানুষের মুক্তির লড়াই এর অন্যতম হাতিয়ার তাঁর লেখনী ।তিনি সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য সৃ‌ষ্টির সংগঠন – সোভিয়েত লেখক সংঘ গড়ে তোলেন। আজীবন তিনি মুক্তিকামী মানুষের একজন হয়ে ছিলেন। সোভিয়েত রাশিয়া গঠনের পরে তাঁর কার্যক্রম অব্যাহত থাকে।

আজকের দিনে তার জীবনদীপ নির্বাপিত হয় কিন্তু শিখা আজও জাজ্বল্যমান। আসুন আমরা সেই শিখায় তাপিত হই ।


মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।